নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: তাঁর কবিতা ধার করে কলকাতা বলত, ‘কোনো একদিন ফিরে এস, যে কোনো একদিন, যেদিন খুশি...’
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: তাঁর কবিতা ধার করে কলকাতা বলত, ‘কোনো একদিন ফিরে এস, যে কোনো একদিন, যেদিন খুশি...’
১৯ বছর পর তসলিমা নাসরিন শুক্রবার কলকাতায় ফিরেছিলেন লাল পাড়-সাদা শাড়িতে। বাঙালি ঘরের মেয়ের মতো আটপৌরে হয়ে। ফেরার আনন্দেই শনিবার রবীন্দ্রসদনে তিনি অনেক জমকালো নীল ময়ূরকণ্ঠী শাড়িতে। ততোধিক জমকালো তাঁর নাতিদীর্ঘ বক্তব্যও। শাণিত, কাটাকাটা কিন্তু আবেগী। এবং বরাবরের মতো প্রতিবাদী। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এসেছিলেন মঞ্চে। বললেন, ‘যতবার খুশি ততবার আসুন কলকাতায়। পশ্চিমবঙ্গে।’ পালটা কৃতজ্ঞতা ঝড়ে পড়ল তসলিমার গলাতেও। তারপর বাম আমল থেকে জমে থাকা ক্ষোভ-অভিমান উগরে দিলেন মাইকের সামনে, ‘এমন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে পুলিশ ছাড়াই চলতে পারবেন লেখক।’ তারপরই এক ইঙ্গিতবাহী মন্তব্য, ‘কৃতজ্ঞতা মানে আনুগত্য নয়। কোনো ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে আনুগত্যের প্রয়োজন নেই। আমি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে বলতে আসিনি। বাকস্বাধীনতার হয়ে বলতে এসেছি।’ তাঁকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা নতুন সরকারের প্রতি এটা কি প্রচ্ছন্ন বার্তা, জল্পনা চলল।
তিনটি নাগরিক সংগঠনের আমন্ত্রণে কলকাতায় এসেছেন তসলিমা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত, অগ্নিমিত্রা পাল, কল্যাণ চক্রবর্তী, প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়, কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। নাগরিক সমাজের ডাকা সেই অনুষ্ঠান অবশ্য রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে যেতে পারল না। তসলিমা নিজে কবি জয় গোস্বামীকে দর্শকাসনে দেখতে পেয়ে মঞ্চে আসার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ছন্দপতন। দর্শকাসন থেকে জয়কে উদ্দেশ করে উঠল স্লোগান—‘চোর, চোর।’ কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত তসলিমা। বাকরুদ্ধও। তারপর, ‘শান্ত হোন আপনারা। আমাকে কি বলবার অনুমতি দেবেন?’ এই বলে বক্তব্য শুরু করলেন। আর কিয়ৎক্ষণের মধ্যে মন্ত্রমুগ্ধ সভা। প্রায় কবিতায় বক্তব্য রাখলেন। বারবার হাততালি।
ফিরলেন তিনি ১৯ বছর বাদে। বললেন, ‘মনে হচ্ছে আমি হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটি অধ্যায়ের কাছে ফিরে এসেছি।’ জানালেন, নির্বাসনের কোনো ঘটনা আসলে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা। তাই তাঁর মতো মানুষের আজীবনের লড়াই অশুভ মতাদর্শের বিরুদ্ধে। যে ধর্মান্ধতার কারণে তাঁকে নির্বাসিত হতে হয়েছিল সেই ঘটনাকে অনেক বড়ো প্রেক্ষাপটে ফেলে বললেন, ‘রাষ্ট্রের ধর্ম থাকবে না, ন্যায় থাকবে।’ আর গোটা রবীন্দ্রসদনজুড়ে গমগম করল তাঁর কণ্ঠ— ‘কলকাতা আমি কি দোষ করেছিলাম যে চলে যেতে হয়েছিল? আজ শুধু বলছি, ফিরে এসেছি। মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ।’ -নিজস্ব চিত্র