সৌম্যজিৎ সাহা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলে ঘাসে ঢাকা নদীর তীরে এক দুর্লভ পাখি হল চেস্টনাট-ক্যাপড ব্যাবলার (লাল-টুপি ছাতারে)। কিন্তু এই পাখির অস্তিত্ব এখন বিপন্ন। কারণ লাজুক প্রকৃতির এই পাখি কাশবন বা ঘন তৃণভূমির আড়ালে বাসা করে নিজেদের নিঃশব্দে লুকিয়ে থাকতে ভালোবাসে। তাদের সেই বাসস্থান এখন অরক্ষিত। অভিযোগ, কেটে ও পুড়িয়ে সাফ করে দেওয়া হচ্ছে ঘাসবন। তাতে লুপ্ত হচ্ছে এই পাখিদের শেষ আশ্রয়স্থল। গবেষণায় এমনই উদ্বেগের ছবি উঠে এসেছে। জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (জেডএসআই) দুই গবেষক কৌশিক দেউটি এবং শেখর প্রামাণিক ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে গত মার্চ পর্যন্ত হাওড়ায় রূপনারায়ণ ও দামোদরের তীরে ঘাসজমিতে গবেষণা চালান। সেখানেই ওই পাখিদের জীবন-সঙ্কটের ছবি উঠে এসেছে। গবেষণাপত্রটি ইন্ডিয়ান বার্ডস নামক পক্ষীবিদ্যা বিষয়ক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
এই পাখিটি সাধারণত পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। সুন্দরবনেও এটি পাওয়া যায় বটে, সেটা অতিবিরল। ব্রিটিশ আমলে দক্ষিণবঙ্গে এই পাখির অস্তিত্বের নিদর্শন মিললেও এতদিন পর্যন্ত এমন গভীর পর্যবেক্ষণ হয়নি। রূপনারায়ণ ও দামোদরের তীরবর্তী ঘাসজমিতে মোট ১০২ বার পর্যবেক্ষণ করেছেন জেডএসআইয়ের গবেষকরা। ২৩টি স্থানে পাখিটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা গিয়েছে। সেই স্থানগুলি কাশ ও লম্বা ঘাসে পূর্ণ এবং অরক্ষিত। প্রায় আড়াই বছরের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের সময়কালে গবেষকরা লক্ষ্য করেন যে, এলাকাগুলি বিপদাপন্ন। কারণ, গাঁদা ও জবাফুলের বাণিজ্যিক চাষের জন্য ঘাস কেটে ও পুড়িয়ে সাফ করা হচ্ছে।
গবেষক কৌশিক দেউটি বলেন, কলকাতা ও তার পারিপার্শ্বিক অঞ্চলের বিভিন্ন পুজো প্যান্ডেল ও মন্দিরে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ফুলের চাহিদা মেটাতে তৈরি হচ্ছে ফুলবাগান। এই পাখিটার জীবনের সবটুকু নির্ভর করে আছে এই ঘাসজমির উপর। সেই আশ্রয়স্থল হারালে, পাখিটিও হারিয়ে যাবে চিরতরে।
এই পাখির বিপন্নতার মধ্যেও তাদের নানা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে গবেষণায়। যেমন গবেষকরা এর তিনধরনের ডাক রেকর্ড করেছেন। একটি বিপদ সঙ্কেত, অপরটি এলাকা দখলের ঘোষণা এবং অন্যটি প্রজননকালীন আহ্বান। চারটি জায়গায় এই পাখির বাসায় প্রজননের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু সেইসব বাসা নষ্ট হয়ে যায় ঘাস জমিতে আগুন লাগানোর ফলে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, এই পরিস্থিতিতে পাখিরা বাসা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে, লাল-টুপি ছাতারের প্রজাতির স্ত্রী ও পুরুষের দৃশ্যমান পার্থক্যও উঠে এসেছে গবেষণায়। শেখরবাবু বলেন, ‘আমরা চোখের আইরিশ অংশে রঙের স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করেছি। পুরুষ পাখির চোখের আইরিশ অংশটি লাল আর স্ত্রী পাখির আইরিশ অংশটি কালো। তবে আগামী দিনে এই পাখি আদৌ দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে একটা সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ যেহেতু এসব ঘাসজমির কোনও নির্দিষ্ট সুরক্ষা নীতি নেই, তাই হয়তো এই প্রজাতির শেষ বংশধরদের এখন দেখা যাচ্ছে।