Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এসআইআর থেকে রাজ্যপাল বদল, অঙ্কটা কী?

রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার ‘টুলকিট’। ভোটার হয়রানিরও। এছাড়া আর কোনো বিশেষণেই পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না

এসআইআর থেকে রাজ্যপাল বদল, অঙ্কটা কী?
  • ১০ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার ‘টুলকিট’। ভোটার হয়রানিরও। এছাড়া আর কোনো বিশেষণেই পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। চার মাস ধরে এ রাজ্যে নির্বাচন কমিশন নামক ‘ভাগ্যবিধাতা’ কোটি কোটি ভোটারের প্রাণ ওষ্ঠাগত করে রেখেছে। কারণ কী? ভোটার তালিকার শুদ্ধকরণ? আম জনতা অন্তত আর তেমন মনে করছে না। নাম বাদ যাওয়ার মেগা সিরিয়াল যেন কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। প্রথমে ছিল মৃত ও পাকাপাকিভাবে স্থানান্তরিত। তারপর জন্ম নিল লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি নামে এক ভোট কাটার অঙ্ক। এই জাঁতাকলে এই মুহূর্তে পিষছে বাংলার ৬০ লক্ষ ভোটার। সবটাই ভোটের লক্ষ্যে। নিখুঁত এক ষড়যন্ত্র। দিল্লির দরবারের ঠান্ডা ঘরে বসে যার সুতো বোনা হয়েছে। এবং এখন পরিস্থিতি যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাতে দু’টি ছাড়া উপায় নেই। প্রথমত, ‘বিচারাধীন’ তালিকায় যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের বাদ রেখেই ভোট করানো। দ্বিতীয়ত, যত সময় লাগুক, এই ৬০ লক্ষের নিষ্পত্তির পর নির্বাচন করা।

Advertisement

এই দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা রয়েছে। রাজ্য সরকারের সমস্যা। আম আদমির সমস্যা। কারণ, যাচাইয়ের গতি অত্যন্ত ধীর। ১৫ দিনে আদালত নিযুক্ত জুডিশিয়াল অফিসার বা বিচারকরা সাত লক্ষের মতো ভোটারের আবেদন নিষ্পত্তি করতে পেরেছেন। আরও ৫৩ লক্ষ যাচাই দিন দশেকের মধ্যে হয়ে যাবে, তেমনটাও নয়। তাহলে ভোট কীভাবে সময়ে হবে? নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ এসে গিয়েছে। সব দেখাশোনা সেরে তারা ফিরে যাবে দিল্লি। তারপর অপেক্ষা করবে ১৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের। তিনি অসমে যাবেন, তারপর বাংলা। ব্রিগেডে জনসভা তাঁর। মনে করা হচ্ছে, নতুন কিছু প্রতিশ্রুতি ঝুলি থেকে বের করবেন তিনি। তাহলে ততদিন তো কমিশন বাংলায় ভোট ঘোষণা করতে পারবে না! ১৬ মার্চ রাজ্যসভার ভোট। সেক্ষেত্রে ১৭ তারিখ এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার কথা। অঙ্ক একেবারে পরিষ্কার। এবার প্রশ্ন হল, অ্যাডজুডিকেশন তালিকায় পড়ে থাকা ৫৩ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে কি এই ভোট হবে? নাকি তাঁদের বাদ রেখে? তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম—এই তিন রাজনৈতিক দলই চাইছে, এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের আবেদন নিষ্পত্তির পরই ভোটটা হোক। এবং সময়ে। বিজেপি ব্যতিক্রম। কারণ, আড়ালে থাকা আর একটি সমীকরণ। প্রথমে ১ কোটি নাম বাদের টার্গেট নিয়ে এসআইআর ঘোষণা হয়েছিল। এই ঘোষণা করেছিলেন গেরুয়া ব্রিগেডের নেতারাই। কিন্তু খসড়া তালিকায় দেখা গেল, টার্গেট পর্যন্ত পৌঁছানো যায়নি। মৃত, স্থানান্তরিত ও অনুপস্থিত ভোটারদের মিলিয়ে ৫৮ লক্ষ। তাহলে লক্ষ্যপূরণ হবে কীভাবে? ওই যে লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি নামক সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছিল! সে কাজে আসবে কবে? ঝুড়ি ঝুড়ি নোটিস পৌঁছে গেল বাছাই করা কেন্দ্রের নির্দিষ্ট বুথগুলিতে। মালদহের এক বিএলওর বলছিলেন, হুড়হুড় করে নাম ফেরত আসছিল। এরা নাকি সবাই সন্দেহজনক। অথচ তাঁর বুথের বাসিন্দাদের অধিকাংশই সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়ায় তিনি নিজে প্রত্যেকের ফর্ম যাচাই করে ছেড়েছিলেন। প্রয়োজনীয় নথিও জমা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর বুথেরই ৪০০ জন ভোটারকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে ‘বিচারাধীন’ তালিকায়। তাঁদের সব নথি দেওয়া সত্ত্বেও। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, প্রত্যেকে সংখ্যালঘু। হিন্দু, তফসিলি ভোটাররা কিন্তু অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে যাননি। কোন অঙ্কে? জানেন না তিনি। জানে না গোটা বাংলার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো নাগরিক। এটাই সমীকরণের অন্ধকার দিক। টার্গেটে পৌঁছানো। ১ কোটির টার্গেট। তৃণমূল এই অভিসন্ধিই পৌঁছে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের দরবারে। তারপরই এসেছে জুডিশিয়াল অফিসার নিয়োগের নির্দেশ। বিচারকরাই এবার নির্ধারণ করছেন, কারা ভোট দেওয়ার যোগ্য, আর কারা নয়। কিন্তু বিপুল নথির পাহাড়। কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব? সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, প্রয়োজনে ভিন রাজ্য থেকে বিচারক নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু তাঁরা এসেই যে কাজ শুরু করে দেবেন, সেটাও হবে না। সেই বিচারকদের প্রশিক্ষণ নিতেই দু’-তিনদিন সময় লাগবে। তাঁদের আলাদা লগ-ইন আইডি তৈরি হবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, বাইরের রাজ্য থেকে আসা সেই বিচারকরা বাংলা বুঝবেন না। অথচ, ‘ডিসক্রিপেন্সি’ নামক ৯৯ শতাংশ সমস্যাই নামের। এবং সিংহভাগ মুসলিম সম্প্রদায়ের। কারও নামের সঙ্গে আগে শেখ ছিল, এখন নেই। ভোটার তালিকায় আবুল হয়ে গিয়েছেন আব্দুল। শুধুমাত্র মাঝে একটি ইংরেজি অক্ষর ‘ডি’ পড়ে যাওয়ায়। এর দায় কার? কমিশনের তো অবশ্যই। কিন্তু ভার নিতে হচ্ছে ভোটারকেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। নিজের নাগরিকত্ব নিজেকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে। তারপরও চূড়ান্ত তালিকায় নিজের নামের উপর লেখা থাকছে ‘অ্যাডজুডিকেশন’। চার শতাধিক বিচারক রোজ ১০০টি করে আবেদনের নিষ্পত্তি করলেও মাস তিনেক সময় লাগবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেটাও কি সম্ভব? কারণ, অ্যাপে আপলোড হওয়া নথি এই পর্যায়ের যাচাইয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। তিনটি নথি ইআরওরা আপলোড করতে পেরেছেন—১) শুনানির নোটিস, ২) ২০০২ সালের তালিকা এবং ৩) সংশ্লিষ্ট ভোটারের সঙ্গে বিএলওর ছবি। অর্থাৎ, যে নথির মাধ্যমে একজন ভোটার নিজের বৈধতা প্রমাণ করবেন, সেটা সার্ভারে নেই। তার জন্য হার্ড কপি দেখতে হবে। সেটাই সময়সাপেক্ষ হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের মতো জমে থাকা নথির ফোটোকপির স্তূপে তাঁরা হাতড়ে চলেছেন। বিরক্ত হচ্ছেন। এবং বহু ক্ষেত্রে জায়গা মতো নথি পাওয়া যাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে মাইক্রো অবজার্ভারদের ‘নোটে’র উপর ভরসা করতে হচ্ছে। তাঁরা সেক্ষেত্রে সব সিদ্ধান্ত সঠিক নিতে পারছেন, সেই গ্যারান্টি নেই। তাহলে কিন্তু এই ৬০ লক্ষের মধ্যে ২০-২৫ লক্ষ বাদ গেলেও আশ্চর্যের কিছু থাকবে না। তারপরও ধরে নেওয়া যাক, সব রাজনৈতিক দল এই যাচাই এবং নিষ্পত্তি মেনে নিল। এবং তিন মাসে এই ৫৩ লক্ষ ভোটারের নথি যাচাই সম্পূর্ণ হল। তখন ভোট করানোর অর্থ, ৭ মে পেরিয়ে যাওয়া। অথচ, ওই ৭ মে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে নির্বাচনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। সেক্ষেত্রে কেন্দ্র এবং কমিশনের আস্তিন থেকে বেরোবে দ্বিতীয় উপায়—রাষ্ট্রপতি শাসনে ভোট। 
নজর করে দেখুন, দু’টি ক্ষেত্রেই লাভ বিজেপির। অর্থাৎ সময়ে ভোট হল, কিন্তু ৫৩ লক্ষ ভোটার ভোট দিতে পারলেন না। তাঁদের তো ‘বাছাই’ করেই বাদ দেওয়া হয়েছে। শ’খানেকের বেশি আসনে ২০২১ সালে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছাপিয়ে গিয়েছে বাদ যাওয়া ভোটার এবং বিচারাধীন ভোটারের যোগফল। একই অঙ্কে বিজেপিও ধাক্কা খেয়েছে বেশ কিছু আসনে। কিন্তু তৃণমূলের তুলনায় কিছুই নয়। আর দ্বিতীয় উপায়, অর্থাৎ তাঁদের আবেদনের মীমাংসা হয়ে যাওয়ার পরও যদি ভোট হয়, সেটা হবে রাষ্ট্রপতি শাসনে... তাতেও পোয়া বারো। তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কেয়ারটেকার হিসাবে থাকলেও রাশ চলে যাবে কেন্দ্রের হাতে। তখন ভোটে আধাসেনা নামবে না সেনা, সেটাও ঠিক করবে দিল্লি। তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের গ্যারেজ করে দেওয়া যাবে। রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের আচমকা পদত্যাগ কিন্তু সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্তও তিনি ‘জানতেন না’ যে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। অন্তত তাঁর সূচি সেই কথাই বলছে। আনন্দ বোসের স্ত্রীও ছিলেন দিল্লিতে। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ফেরেন কলকাতায়। তারপর দুপুরেই ফের স্বামী আনন্দ বোসের সঙ্গে রাজধানী যাত্রা। দিল্লির বঙ্গ ভবনে বসে ইমেল করে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বোস। কারণ কী? ভোটের মুখে এভাবে রাজ্যপাল বদল কিন্তু নজিরবিহীন। কেন্দ্র বলবে, রুটিন বদলি। অন্য রাজ্যেও হয়েছে। কিন্তু বাংলায় রাজ্যপাল হিসাবে নিযুক্ত নতুন নামটির দিকে খেয়াল রাখতে হবে—আর এন রবি। তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল ছিলেন এতদিন এবং বিস্তর বেগ দিয়েছেন অবিজেপি স্ট্যালিনের সরকারকে। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব আনন্দ বোসকে দিয়ে যে ‘কাজ’ করিয়ে নিতে পারছিল না, এবার কি সেটাই হবে? লক্ষ করার বিষয় হল, মহিলা ঘটিত কেচ্ছা এবং অভিযোগের পর কিন্তু আনন্দ বোস খানিক দমেই গিয়েছিলেন। রাজ্য সরকারের আবেদন-নিবেদন খুব একটা ফেরাচ্ছিলেন না। রবিবাবু সেই ধাতে গড়া নন। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোয় ছিলেন। অজিত দোভালের ডেপুটিও। কেন্দ্রের অনুগত এবং গায়ে দাগ নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা, আইনের প্যাঁচ বোসের থেকে বেশি বোঝেন। এসআইআরের অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ নানাবিধ কলকাঠি নেড়ে পিছিয়ে দেওয়া গেলে রাষ্ট্রপতি শাসনে ভোট করানোর আবেদন করবেন রবিবাবু। সেটা থ্রু করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। পরপর এই ধাপগুলো সাজালেই বোঝা যাবে, ছক প্রস্তুত। মরিয়া ধাক্কা একটা মারতে চাইছে বিজেপি। এবারও না হলে ‘নিরঙ্কুশ জনপ্রিয়তা’য় বড়োসড়ো ক্ষতকে সঙ্গী করেই বিদায় নিতে হবে নরেন্দ্র মোদিকে। আরও একবার প্রমাণ হবে, বাংলা বিভেদ এবং ধর্মের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। এর মধ্যেও অবশ্য গেরুয়া বাহিনী আরও একটা অঙ্ক ভুলে যাচ্ছে। গ্রাম বাংলা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যারা সুখে-দুঃখে বছরের পর বছর পাশে পায়। শুধুমাত্র ভোটার কেটে কয়েকটি আসন জেতা যেতে পারে, বাংলা দখল হবে না। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ