


সুকান্ত বেরা, চেন্নাই: আদিয়ারের কারাপাদাম গার্ডেন্সের ২ নম্বর ফার্স্ট ক্রস স্ট্রিটের বাসিন্দার নাম শুনে চিনতেই পারলেন না বছর ছাব্বিশের তরুণ। অথচ এই বাড়িতেই থাকেন ভারতের প্রথম টেস্ট জয়ী দলের একমাত্র জীবিত সদস্য সিডি গোপীনাথ।
চেন্নাইয়ের এই জায়গাটা অনেকটা সল্টলেকের মতো। গাছগাছালিতে ভরা। বড় রাস্তা থেকে ছোটো ছোটো গলি চলে গিয়েছে ভিতরে। প্রথম গলিটায় ঢুকে ডানদিকের বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই বেরিয়ে এলেন সিকিউরিটি গার্ড। ভিজিটিং কার্ড দেওয়ার পর ভিতরে গেলেন তিনি। সঙ্গে নিয়ে এলেন মাঝ বয়সী এক মহিলাকে। বললেন, ‘স্যার তো অসুস্থ। দেখা করতে পারবেন না।’
কলকাতা থেকে এসেছি...
শুনে মনে হয় দয়া হল। গার্ডকে সদর দরজা খুলে দিতে বললেন। প্রাসাদোপম বাড়ির একতলার ড্রয়িংরুমে মেডিকেল বেডে অর্ধশায়িত ভারতীয় ক্রিকেটের ‘আদিপুরুষ’। হাত তুলে নমস্কার করলেন। ভাঙা গলায় বললেন, ‘এখন হাঁটতে পারি না। পা অকেজো হয়ে গিয়েছে। শুয়েই দিন কাটছে।’ বয়স ৯৫। ভগ্ন শরীর। তবুও ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে যেভাবে উইকেট কামড়ে পড়ে থাকতেন, সেভাবেই ব্যাট করে যাচ্ছেন জীবনের পিচে। বাউন্সার, ইয়র্কার, গুগলি (পড়ুন ইঞ্জেকশন, ফিজিওথেরাপি, ডায়েট) সব সামলে লক্ষ্যে অবিচল, সেঞ্চুরি করতেই হবে! বিছানায় বসেই খাওয়া-দাওয়া। অবসরের সঙ্গী বই ও খবরের কাগজ। গান শুনতে ভালোবাসেন। টি-২০ বিশ্বকাপ দেখছেন?
প্রশ্নটা শুনেই ঘাড় ঘোরালেন গোপীনাথ। ‘ওটা ক্রিকেট নাকি? ক্রিকেটের নামে ব্যবসা।’ বোঝাই যাচ্ছিল, ক্রিকেটের এই ফরম্যাট মানতে পারছেন না তিনি। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ, তাঁদের সময় ক্রিকেট মানে তো শুধুই টেস্ট। দেশের হয়ে খেলে কত টাকাই বা পেতেন। পাকিস্তানে খেলতে যেতে হত ট্রেনে চেপে। আজ ভারতীয় ক্রিকেটের যে বৈভব, চুন-সুরকি দিয়ে তার ভিত্তিপ্রস্তর গড়ার অন্যতম কারিগর গোপীনাথও।
পাশে রাখা রুমালে মুখটা মুছে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘ওয়ান ডে ক্রিকেট তবুও দেখতাম। কিন্তু টি-২০ একেবারেই চলে না। কিন্তু সেই ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেটে সবাই গা ভাসাচ্ছে। জানি না, টেস্ট ক্রিকেট বেঁচে থাকবে কিনা।’ ভারতীয় ক্রিকেটের জীবিত ‘গ্রন্থাগারের’ সামনে সোফায় বসে গল্প শুনতে শুনতে কখন যে বেঁধে দেওয়া সময় অতিক্রান্ত, টের পাওয়া গেল না। হঠাৎ হঠাৎ স্মৃতির মহাসাগরে ডুব দিচ্ছিলেন গোপীনাথ। প্রথম টেস্ট জয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই বললেন, ‘ইংল্যান্ড তখন খুবই শাক্তিশালী দল। ওরা আমাদের সেভাবে ধর্তব্যের মধ্যে রাখেনি। ভেবেছিল, চিপকে নেমে ভারতকে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু টার্নিং পিচে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল ইংল্যান্ড। আমরা প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছিলাম ইনিংস ও ৮ রানে। পঙ্কজ রায়ের ব্যাটিং আজও চোখের সামনে ভাসে। কী অসাধারণ টেকনিক! সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিল প্রথম ইনিংসে। আর পলি উমরিগড়ের ব্যাটিং শৌর্যে ছারখার হয়ে গিয়েছিল ইংরেজ বোলাররা।’
কলকাতার সঙ্গেও আত্মার টান ভারতের প্রথম টেস্ট জয়ী দলের সদস্যের। ইডেনের দর্শকদের প্রতি তাঁর আলাদা সম্মান, ‘অনেক মাঠে খেলেছি, তবে কলকাতার দর্শকদের কথা আলাদাভাবে বলতেই হবে। খেলা এবং খেলোয়াড়ের প্রতি ওই আবেগ তুলনাহীন।’