সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: প্রজন্ম পাল্টায়, কিন্তু, ঐতিহ্যের শিকড় আজও দৃঢ়ভাবে গাঁথা রয়েছে কৃষ্ণনগরের বুকে। ঐতিহ্য, ভক্তি আর আস্থার মিলনে আজও আলোকিত কৃষ্ণনগরের সিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা মন্দির। চারশো বছরেরও বেশি প্রাচীন এই মন্দিরে সেই প্রাচীন মাটির কালীমূর্তিই আজও পুজো করা হয়। ভক্তির পরশে ওই মাটির মূর্তি আজও অক্ষত রয়েছে। সিদ্ধেশ্বরী মা এখানকার মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক।
পুজোর দিনগুলিতে মন্দির চত্বরে ভক্তদের ঢল নামে। কেউ আসে মানত পূরণে, কেউবা আসে শুধু একবার মাকে দর্শন করতে। ঘণ্টা, শঙ্খ ও ধূপের গন্ধে ভরে ওঠে গোটা এলাকা। আজও প্রাচীন নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট বিধি ও মন্ত্রোচ্চারণে সম্পন্ন হয় পুজো।
মন্দির কর্তৃপক্ষ বলে, চারশো বছরের বেশি আগে দীনবন্ধু চট্টোপাধ্যায় নামে একজন ব্রাহ্মণ জলঙ্গি নদীর ওপারে মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু, পরবর্তীতে নদীর ভাঙন শুরু হলে তিনি মায়ের মূর্তি নদীর এপারে এনে বর্তমান এই জায়গায় নতুন মন্দির করে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই মৃন্ময়ী মূর্তি আজও অবিকল রয়েছে। প্রতি বছর কালীপুজার আগে মায়ের শুধু অঙ্গরাগ করানো হয়।
স্বাধীনতার পর পঞ্চাশের দশকে একবার ঠিক করা হয়েছিল, নতুনভাবে মন্দির গড়া হবে এবং মায়ের পুরাতন মূর্তি বিসর্জন দিয়ে পাথরের মূর্তি করা হবে। সেই মূর্তি গড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তৎকালীন ঘূর্ণির প্রখ্যাত মৃৎশিল্পী কার্তিক পালকে। কিন্তু, মূর্তির কাজ শুরু করলেই শুরু হয় বিপত্তি। পাথরের মূর্তি তৈরি করতে বিভিন্ন বাধা পড়তে শুরু করে। তৎকালীন যিনি মন্দিরের সেক্রেটারি ছিলেন, তার জামাই পথ দুর্ঘটনায় মারা যায়। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মায়ের প্রাচীন মাটির মূর্তিতেই পুজো করা হবে। মন্দিরের সেক্রেটারি সঞ্জিতকুমার চৌধুরী বলেন, সিদ্ধেশ্বরী মা কৃষ্ণনগরবাসীর আবেগ। এই মন্দিরে সারাবছরই ভক্তদের ভিড় হয়। বিশেষ তিথিগুলিতে চাপ আরও বাড়ে। কালীপুজোয় সারদিনই মায়ের পুজো হয়। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই অঞ্জলি দিতে আসেন। অন্ন মহোৎসবের আয়োজন করা হয়। এই মন্দির ব্যক্তিগত না হওয়ায় এর দায়িত্ব থাকে ট্রাস্টের উপর। এই ট্রাস্টের প্রেসিডেন্ট হলেন জেলা জজ। আর এসডিও থাকেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও স্বমহিমায় বিরাজ করছেন মা সিদ্ধেশ্বরী। মাটির বিগ্রহ বদলায়নি, বদলায়নি পুজোর প্রতি মানুষের নিষ্ঠাও। চারশো বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য আজও ভক্তি ও বিশ্বাসের সুতোয় বেঁধে রেখেছে কৃষ্ণনগরবাসীকে।
• নিজস্ব চিত্র



