Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বড় গোস্বামী বাড়িতে পূজিত হন দেবী কাত্যায়নী, আট হাতে থাকে না অস্ত্র

বড় গোস্বামী বাড়িতে পূজিত হন দেবী কাত্যায়নী, আট হাতে থাকে না অস্ত্র
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: ‘অগুনতি মশাই, অগুনতি, বুঝলেন। শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাড়িতে দুর্গাপুজোয় ব্যতিক্রম হাতে গুনে শেষ হয় না।’ অদ্বৈত আচার্যের বাড়ির খানিক দূরে এক প্রাচীন দেউড়ির সামনে বসে বলছিলেন বৃদ্ধ। স্বয়ং অদ্বৈত আচার্যের বংশধরদের বাড়ির পুজো বলে কথা। তার নিজস্বতা থাকবে বৈকি। দশভুজার অস্ত্রবিহীন আটটি হাতের মাতৃমূর্তিই যে এবাড়ির পুজোর মূলআকর্ষণ। কাত্যায়নী রূপে ঊমার আরাধনায় আজ প্রায় ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় নিয়োজিত বড় গোস্বামী পরিবারের সদস্যরা। 

Advertisement

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবদুর্গাপুজো যত বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে ততই আচার, সংস্কারমূল্য হারিয়েছে। নামীদামি পুজোকে গ্রাস করেছে কর্পোরেট কালচার। এই পরিস্থিতিতে পুজোর প্রাচীন ঐতিহ্যের একমাত্র ধারক ও বাহক হিসেবে টিকে রয়েছে কেবল অভিজাত বাড়িগুলিই। শান্তিপুরে অদ্বৈত আচার্যের উত্তরসূরিদের অন্যতম নিবাস বড় গোস্বামী বাড়ির পুজো অটুট সংস্কৃতির সেই মুষ্টিমেয় উদাহরণগুলির মধ্যে অন্যতম। সাড়ে ৩০০ বছর ধরে ন্যূনতম পরিবর্তন ছাড়াই চলছে পূজোর নিয়মকানুন, রীতি। 
অদ্বৈত আচার্যের পরিবার বৈষ্ণব। ফলে শাক্তপুজোর প্রায় বিপরীত সমস্ত আচার। বলি প্রথা কোনও কালেই ছিল না। দেবী দুর্গা এবাড়িতে পূজিত হন কাত্যায়নী রূপে। অবশ্য তার পিছনে রয়েছে পারিবারিক ইতিহাস। বর্তমান প্রজন্মের সত্যনারায়ণ গোস্বামীর কথায়, আজ থেকে প্রায় ৩৫০ বছর আগে বাড়ির বিগ্রহ রাধারমণ চুরি যান। কীভাবে ফেরত পাওয়া যায় পরিবারের ইষ্টদেবকে? উত্তর খুঁজতে বিভিন্ন পুরাণ ঘাঁটতে শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। শেষমেষ সমাধান মেলে ভাগবত পুরাণে। জানা যায়, দেবী কাত্যায়নীর ব্রত করলে বিগ্রহ পাওয়া যায়। সেইমতো বাড়ির মহিলারা ব্রত নিষ্ঠাসহকারে পালন শুরু করেন। ফলও মেলে হাতেনাতে। পরিবারের জ্যেষ্ঠ বধূ স্বপ্নাদেশ পান, রাধারমণকে খুঁজে পাওয়া যাবে নদীয়ার দিগনগরের একটি দিঘিতে। এরপর দেবী কাত্যায়নীর প্রতি আস্থা কয়েকগুণ বেড়ে যায় তাঁদের। শুরু হয় নিয়মিত দুর্গাপুজো। আজও সেদিনের সেই ঘটনাকে স্মরণ করে পুজোর আয়োজন হয় প্রতিবছর। তবে ব্যতিক্রমী নিয়ম নীতিগুলির মধ্যে এ বাড়িতে দশভুজা দেবীর আটটি হাতই অস্ত্রহীন। দু’টি মাত্র হাতে অসুর দমনের জন্য অস্ত্র ধরেন দেবী। একচালা প্রতিমায় সপরিবারেই বিরাজমান ঊমা। তবে পরিচিত মূর্তির চেয়ে কিছুটা আলাদা। এখানে কার্তিক এবং গণেশ একে অপরের বিপরীত দিকে অবস্থান করেন। যেহেতু গোস্বামী বাড়ির নিজস্ব পুঁথিতে দেবী পূজিত হন, তাই পরিবারের একমাত্র দীক্ষিত গৃহবধূরাই দেবীর ভোগ রান্না করতে পারেন। পূজোর দিনগুলিতে ৩৩ ব্যঞ্জনে ভোগ দেওয়া হয়।
আকর্ষণ কিন্তু শেষ হয় না দশমীতেও। পুজো শেষ হওয়ায় পর ঘট নাড়ানো হয়ে গেলে আর মূর্তি বাড়িতে রাখা হয় না। ঠিক যেভাবে প্রাণহীন কোনও দেহ মানুষ নিজের বাড়িতে রাখে না। ঠিক সেভাবেই দশমীতে মন্ত্রমতে বিসর্জন হয়ে যাওয়ার পর, মূর্তি ভাসান দিয়ে দেওয়া হয় সঙ্গে সঙ্গেই। তবে এই বিসর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন পারিবারিক পরিগ্রহ রাধারমণও। কারণ দেবীর বিসর্জনের পরই ভোগ নিবেদন করা যায় বিগ্রহকে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবেই বাংলার সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের অন্যতম মেলবন্ধন রয়েছে বড় গোস্বামী বাড়িতে। পুজোয় এমন একটি অভিজাত বাড়ির পুজো এনে দিতে পারে নিখাদ ‘শারদ আনন্দ’।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ