প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্রাম: মন্দিরে সন্ধ্যাপ্রদীপ না জ্বালানোয় রুষ্ট হয়েছিলেন মা কালী। বেদি ছেড়ে নেমে এসেছিলেন নীচে। মন্দিরের চাতাল থেকে ভেসে এসেছিল দেবীর পায়ের নূপুরের শব্দ। এরকমই নানা কাহিনি শোনা যায় বিনপুর-২ ব্লকের শিলদার গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের দক্ষিণাকালীকে নিয়ে।
জঙ্গলমহলের প্রাচীন জনপদ শিলদা। শিলদার রাজারা ছিলেন শৈব ধর্মাবলম্বী। শিব ও শক্তির নানা মাহাত্ম্য এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে। বিনপুরের ওড়গোদায় রয়েছে জাগ্রত পাতাল ভৈরবের থান। শিলদার গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারে একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে হচ্ছে কালীপুজো। মন্দিরে আগে দুর্গাপুজো হতো। কুল পুরোহিতের নির্দেশ মেনে কালীপুজোর সূচনা হয়। পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। শোনা যায়, একবার মন্দিরে সন্ধ্যা প্রদীপ না জ্বালানোয় দেবী রুষ্ট হয়েছিলেন। সেদিন পরিবারের এক সদস্য দেবীকে ক্রুদ্ধভঙ্গিতে বেদির নীচে বসে থাকতে দেখেছিলেন। দৃশ্যটি দেখে তিনি জ্ঞান হারান। পরে জানা যায়, সেদিন মন্দিরে প্রদীপ জ্বালানো হয়নি।সেই ঘটনার পর থেকে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানোয় কোনো ছেদ পড়েনি। আড়ম্বরহীন ভাবে পুজো হলেও প্রথা ও রীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দেবী হলেন কালরাত্রিরূপী। অন্যান্য পুজোয় সংযমের বার্তা দেওয়া হয়। তন্ত্র সাধনায় রয়েছে জীবনকে আলিঙ্গন করার বার্তা। প্রবৃত্তির দমন নয়, রূপান্তরই পথ। মধ্যরাতে তন্ত্র সাধনার প্রধান উপাচারই ছিল আলো। তন্ত্র সাধনায় অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রাই লক্ষ্য। তন্ত্র সাধনার সেই ধারাই জঙ্গলমহলের বিভিন্ন দেবদেবীর পুজোয় নানা কাহিনির মধ্যে মিশে রয়েছে। পরিবারের সদস্য সুদীপকুমার গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, বাড়িতে আগে দুর্গাপুজো হতো। বাড়ির এক কুল পুরোহিত দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে, দেবী মন্দিরে কালীরূপে পূজিত হতে চান। সেই নির্দেশ মেনেই দক্ষিণাকালীর আরাধনা শুরু হয়। পারিবারিক পুজো হলেও বাইরের বহু মানুষ এখানে পুজো দিতে আসেন। দীপান্বিতা অমাবস্যায় কুমড়ো ও আখ বলি দেওয়া হয়। দেবীর ভোগে থাকে পরমান্ন। বছরের প্রতিটি দিন মন্দিরে যাতে প্রদীপ জ্বলে তা খেয়াল রাখা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা বিশ্বজিৎ পাল বলেন, শিলদার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবধারার মেলবন্ধন ঘটেছে। দেবীর বিভিন্ন রূপের আরাধনা হয়। তাঁকে নিয়ে নানা কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে। তন্ত্র সাধনার নানা ধারা জঙ্গলমহলের পুজোয় মিলেমিশে আছে।
শিলদার দক্ষিণ কালী প্রতিমা।-নিজস্ব চিত্র



