বলির রক্তে নয়, রক্তদানেই মাতৃ আরাধনা! রাজনগরের বেলেড়ায় প্রাচীন পুঁথির মন্ত্রে পুজো দেবী দুর্গার
  • ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: বীরভূমের রুক্ষ্ম লালমাটির কোলে লুকিয়ে থাকা শান্ত গ্রাম বেলেড়া। একসময় পুজোর ক’দিন বলির রক্তে ভাসত মন্দির চত্বর। কিন্তু কালের বদলের সঙ্গে সঙ্গে ৪০০বছরের সেই প্রাচীন প্রথায় বড়সড় রদবদল এনেছেন পুজো কমিটির সদস্যরা। প্রাচীন সাবেকিয়ানা আর শতাব্দীপ্রাচীন পুঁথির মন্ত্রপাঠ অটুট রেখেই, বিপুল পশুবলির বদলে এখন রক্তদানেই আরাধনা হচ্ছে দেবী দুর্গার।

Advertisement

পারিবারিক ইতিহাস বলছে, রাজনগর ব্লকের ভবানীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিদাইপুর গ্রামে পূর্বপুরুষ গোপালচন্দ্র দেব শর্মনের হাত ধরে ১০০১ বঙ্গাব্দে এই পুজোর সূচনা হয়। পরে জঙ্গলঘেরা বেলেড়ায় পুজো উঠে আসে ১০১০ সালে। বর্তমানে চারশো বছরেরও বেশি প্রাচীন এই পুজোর সেবাইত সিকদারের দু’টি পরিবার এবং দৌহিত্র চক্রবর্তী ও বন্দ্যোপাধ্যায়দের দু’টি মিলিয়ে চারটি পরিবার। মূলত তাঁদের হাত ধরেই আজও অমলিন এই সাবেকিয়ানা।
পুজো কমিটির সদস্য অপরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এখানকার পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, আরাধনার মন্ত্রোচ্চারণ হয় শত শত বছরের পুরনো পুঁথি দেখে। সংস্কৃত ভাষায় দেবনাগরী হরফে লেখা সেই মন্ত্র একসময় তালপাতায় এবং পরে ভুর্জপত্রে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু কালের দাপটে সেই অমূল্য দলিল প্রায় নষ্ট হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। রীতিমতো ঝুঁকি নিয়ে তা ল্যামিনেশন করিয়ে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে কয়েক বছর আগেই। ষষ্ঠীর দিন সেই পুঁথি বের করেই শুরু হয় মন্ত্রপাঠ। প্রাচীন পুঁথির ওই মন্ত্রেই দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। এই বিশেষ মন্ত্রপাঠ শুনতে এবং সাবেকিয়ানার টানেই দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ গ্রামে আসেন।
ঐতিহ্য ও প্রথার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেলেড়া গ্রামের এই পুজোয় বদল এসেছে চিন্তাধারায়। সবচেয়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপটি হল বলি প্রথার সংস্কার। শরিক পরিবারের আর এক সদস্য দেবাশিস চক্রবর্তী বলেন, একসময় এই পুজোতে নবমীর দিন তিন শতাধিক ছাগ বলি হত। কিন্তু বছর তিনেক আগে এই বিপুল বলিদান নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। শেষমেশ সর্বসম্মতিক্রমে ব্যাপক হারে পশুবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে পরিবারের প্রবীণদের আপত্তিতে, শুধুমাত্র প্রাচীন নিয়ম রক্ষার্থে গত তিন বছর ধরে নামমাত্র দু’টি ছাগ বলি দেওয়া হয়।
বলির বদলে এখন মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঠিক হয়েছে, পুজোর পর অষ্টমঙ্গলার দিন রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা হবে। শরিক পরিবারের সদস্যদের দাবি, পশুরাও তো মায়েরই সন্তান। পশুবলির বদলে মানুষের দেওয়া রক্ত মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে কাজে লাগুক, এটাই আমাদের লক্ষ্য। একদিকে চার শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্য ও পুঁথি সংরক্ষণ, অন্যদিকে যুগোপযোগী মানবিক পদক্ষেপ, বেলেড়া গ্রামের দুর্গাপুজো এখন সত্যিই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।