সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ শহর। বাংলার খনি সাম্রাজ্যের ‘রাজধানী’ও বলা হয়। সেই আসানসোল শহরের প্রাণকেন্দ্রেই রয়েছে এক টুকরো গ্রাম। ইট-পাথরের জঙ্গলের মধ্যেও গ্রাম্য পরিবেশ, গ্রাম্য সংস্কৃতি, গ্রাম্য আচার-আচরণ যুগযুগ ধরে আঁকড়ে রেখেছেন ‘গ্রামবাসী’রা। সেই কুয়োতলা। সেই বটবৃক্ষের ছায়া। সেই চণ্ডীমণ্ডপ। সর্বপরি সেই দুর্গাদালান। এটাই আদি আসানসোল। ইমারতি-বৈভব গ্রাস করলেও গ্রাম্যরীতির শিকড় ভোলেননি প্রায় সাড়ে তিনহাজার মানুষ।
আজও ‘আসানসোল গ্রাম’-এ উমা আসেন। পুজিত হন। সেই পুজো শহুরে আচার-আচরণের বাইরে। থিমের প্রতিযোগিতা নেই। প্যান্ডেলের চাকচিক্য নেই। দর্শক টানার প্রতিযোগিতা নেই। রয়েছে শুধু ভক্তি আর শ্রদ্ধা। উমা হলেন এই ‘গ্রাম’-এর ঘরের মেয়ে। তাঁর আগমনে সাজোসাজো ব্যাপার গ্রামজুড়ে ন’টি পুজোর আয়োজন। দুর্গা দালানে চলছে প্রতিমা গড়ার শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। মন্দিরের সামনে বাঁধা হচ্ছে সামিয়ানা টাঙানোর বাঁশ। সেখানে ঝুলছে কচিকাঁচারা। কেউবা ফাটাচ্ছে ক্যাপ ফটকা। শহরের ব্যস্ত সময় যেন এখানে গিয়েছে থমকে।
তিন শতাব্দীরও বেশি আগে ন’কড়ি রায় ও রামকৃষ্ণ রায় আসনগাছ কেটে দামোদর পাড়ে গড়ে তুললেন নতুন বসতি। সেই বসতির পরে নাম হল আসানসোল। কাশিপুরের রাজা তাঁদের ৬ হাজার একর নিঃশুল্ক জমি দান করেছিলেন। উদ্দেশ্য, রাজ্যের উত্তরভাগকে সুরক্ষিত রাখা। বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হয়ে উন্নত জনপদ গড়ে তোলেন দুই রায়। গ্রাম গড়ার পাশাপাশি গাজন, দুর্গাপুজোর মতো বাঙালির চিরন্তন উৎসবকে ঘটা করে পালন করা শুরু করল রায় পরিবারগুলি। ধীরে ধীরে জনপদের ব্যপ্তি বাড়তে বাড়তে লাগল। আজ আসানসোল বললে যে মানচিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেটা ওই রায়দের হাতে তৈরি জনপদ। তারপর তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জীবন-যাপনের সব উপাদানে পুষ্ট হল আসানসোল। এখন রায়বংশের অনেকেই অতি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী থেকে শিক্ষক, অধ্যাপক, চিকিৎসক আইনজীবী হয়েছেন। তাঁরাও আধুনিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তা হলেও ছাড়তে পারেননি গেঁয়ো গন্ধ। তাই শহরের বুকে আগলে এক চিলতে ‘গ্রাম আসানসোল’কে। বড় দুর্গা ঠাকুর দালানে বসেই কথা হচ্ছিল অসিতবরণ রায়ের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন ‘২৯২ বছর আগে এখানে দুর্গাপুজো শুরু হয়। রায়দের বংশবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামের পরিধি বাড়তে থাকে। একের পর এক পুজো বেড়েছে গ্রামে। ঠাকুর দালান আলাদা আলাদা হয়েছে কিন্তু আমরা আলাদা হয়নি।’
জানা গিয়েছে, বড় দুর্গা, মেজ দুর্গা, ছোট দুর্গা, সেজ দুর্গা নামের এক একটি দুর্গা ঠাকুর দালানের নাম হয়েছে। আলাদা করে পুজো হলেও নবপত্রিকা আনা থেকে নবপত্রিকা বিসর্জন—সবই হয় একসঙ্গে। বড়দুর্গা থেকে শুধু করে ন’টি দুর্গা মন্দির থেকে একসাথে লাইন করে নবপত্রিকা আনতে যান পুজো উদ্যোক্তারা। তাঁদের নিজস্ব রামসায়ের ময়দান থেকে আসে মায়ের নবপত্রিকা। একইভাবে নবপত্রিকা বিসর্জন ও মেয়েদের মধ্যে সিঁদুর খেলাও হয় যৌথভাবে।



