প্রদীপ্ত চৌধুরী, ঝাড়গ্ৰাম: নিশুতি রাতে বাঘের পিঠে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান দেবী দুর্গা! বরাভয় দেন গ্ৰামবাসীদের। মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি ছিল না। ছিল একটা বেদি। সেখানে রাখা থাকত তাঁর একমাত্র অস্ত্র তরোয়াল। সেটাই ছিল রাজাদের পাইক যোদ্ধা দিগার পরিবারের ‘দুর্গতিনাশিনী’। চারশো বছরের প্রাচীন এই মিথ আঁকড়ে আজও গোপীবল্লভপুরের ভোল গ্রামে পুজো হয়। ব্রাহ্মণ নয়, বংশ পরম্পরা মায়ের পুজো করে আসছেন দিগার পরিবারের লোকেরা। পুজোর ক’টা দিন ‘ব্যাঘ্রবাহিনী’কে নিয়ে উন্মাদনায় কাটিয়ে দেন গ্রামবাসীরা।
ঝাড়গ্রামে দুর্গাপুজোর সঙ্গে লোকায়ত সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার। দেবী কোথাও অস্ত্ররূপে, কোথাও পটে, কোথাও আবার মাটির হাতি-ঘোড়ার ‘ছলনে’ পূজিত হন। জেলার বাগদি, শবর সহ অন্যান্য অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ নিজেদের লৌকিক প্রথায় দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। বৈভব, জৌলুস না থাকলেও তাঁদের পুজো মানে ভক্তিবাদ সর্বস্ব। রয়েছে দেবীর প্রতি নির্ভেজাল বিশ্বাস। হৃদয়ের অন্তরস্থল থেকে নিখাদ আকুতি। তার থেকে জন্ম নিয়েছে নানা মিথ, নানা কিংবদন্তি। গোপীবল্লভপুর-২ ব্লকের পেটবিন্ধি গ্ৰাম পঞ্চায়েতের ভোলগ্ৰাম অন্ত্যজ শ্রেণির উমা আরাধনার উজ্জ্বল উদাহরণ। গ্রামটি বাগদি সম্প্রদায় অধ্যুষিত। দিগার পরিবারও তাই। বেদির উপর তরোয়াল রেখে লৌকিক প্রথায় মা দুর্গার পুজো করেন তাঁরা। দিগার পরিবারের প্রবীণ সদস্য প্রশান্ত দিগার বংশের প্রথা মেনে পুজো করেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই পরিবারের পূর্বপুরুষরা একসময় স্থানীয় সামন্ত রাজাদের পাইক যোদ্ধা ছিলেন। কথিত, পাঠানদের হয়েও একসময় তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন। তরোয়ালকে তাঁরা দেবী শক্তির প্রতীক বলে মনে করতেন। তাঁদের ব্যবহৃত অস্ত্রকে দেবী হিসেবে পুজো করতে শুরু করেন। চারবছর আগে দুর্গার প্রতিমা গড়ে পুজো শুরু হয়েছে। তবে, তরোয়াল পুজোর প্রাচীন প্রথা ও রীতিতে কোনও ছেদ পড়েনি। পুজোয় বলি প্রথারও প্রচলন রয়েছে।
প্রশান্তবাবু বলছিলেন, ‘পূজোর চারদিন তরোয়ালকে দেবী দুর্গা রূপে পুজো করা হয়। পরিবারের রীতি মেনেই এই পুজো হয়ে আসছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা পাইক যোদ্ধা ছিলেন। বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের কোন একজন পুজোর সূচনা করেছিলেন। আমরা আজও তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছি। তরোয়ালের পাশাপাশি দুর্গার প্রতিমার পুজোও শুরু হয়েছে।’ প্রশান্তবাবুর বড় ছেলে জগনেন্দ্র দিগার বলছিলেন, ‘একসময় এই এলাকা গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। বন্য পশুদের অবাধ বিচরণ ছিল। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, নিশুতি রাতে বাঘের পিঠে দেবী ঘুরে বেড়ান। গ্ৰামবাসীদের রক্ষা করেন। পারিবারিক প্রথা মেনে বাবা পুজোপাঠ করেন। বাবার সঙ্গে আমিও থাকি। আমাদের এই পুজো এখন এলাকার সকল মানুষের।’
ব্লকের পিটবিন্ধি গ্ৰাম পঞ্চায়েতের প্রধান শঙ্কর প্রসাদ দে বলেন, ‘ভোল গ্ৰামে বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। গ্ৰামে লৌকিক প্রথা মেনে তরোয়ালকে দেবী রুপে পুজো করা হয়। পুজোর ক’টা দিন উৎসবে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম। আশপাশের গ্ৰামের বহু মানুষ পুজো দেখতে আসেন। পর্যটক টানতে গ্ৰামটির সৌন্দর্যায়ন করার পরিকল্পনা চলছে। পর্যটনস্থল হিসেবে গড়ে উঠলে এলাকার আর্থিক বিকাশ ঘটবে।’ নিজস্ব চিত্র