সাকার ঈশ্বরের ক্ষেত্রে, তিনি মানবাকৃতিবিশিষ্ট অথবা মানবাকৃতিবিহীন—এই দুই ধারণায় প্রভেদ দেখা যায়। ইসলামধর্মে ঈশ্বর সাকার তবে মানবাকৃতিবিহীন। একজন লেখক বলেছেন যে, ইসলাম ও ইহুদি ধর্মে মানব-মন-বিশিষ্ট অর্থাৎ মানবের সম্বন্ধে মানবাকৃতিবিশিষ্ট ও মানবাকৃতিবিহীন দুই রকম ধারণাই প্রচলিত। সাধারণ হিন্দুরা বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসনা করে থাকেন। এর অর্থ নয় যে, হিন্দুধর্ম বহু-ঈশ্বরবাদী। বহু-ঈশ্বরবাদ প্রসঙ্গে বলা যায় যে, অন্যান্য ধর্মের মতো হিন্দুধর্মও একেশ্বরবাদী, তবে পার্থক্য এই, অন্যান্য ধর্মে যেমন নিজ নিজ একমাত্র ঈশ্বরকে পরমেশ্বরের (যেমন ইহুদিদের জিহোবা) পদে তুলে ধরা হয়েছে, হিন্দুধর্মে বিভিন্ন উপাসকগণ তাঁদের উপাস্য দেবদেবীকে পরমেশ্বর-বলেই মনে করেন। বিষ্ণুর উপাসক মনে করেন যে নারায়ণই পরমেশ্বর এবং অন্যান্য দেবদেবী তাঁর অধীন। শিবের উপাসক মনে করেন শিবই পরমেশ্বর এবং অন্যসকল দেবদেবী নিম্ন স্তরের। মাক্সমুলারের মতে এ ধারণার মূল হলো প্রধান এক ঈশ্বরে বিশ্বাস বা Henotheism, এর ফলে হিন্দুধর্মে বিবিধ আধ্যাত্মিক ভাব ও আদর্শের একীকরণ ঘটেছিল।
সকল দেবতার ঊর্ধ্বে এক পরম ঈশ্বরের ধারণা হিন্দুর ধর্মীয় চেতনায় একটি স্থায়ীভাবে অধিষ্ঠিত। তবে যেমন আগে বলা হয়েছে দেবতাদের নামের ক্ষেত্রে এক বিরাট বিপ্লব ঘটেছে। বৈদিক যুগে বিষ্ণু ও শিবের মতো নামগুলির বিশেষ গুরুত্ব না থাকলেও পরবর্তী কালে এরা প্রাধান্য লাভ করল, আর ইন্দ্র, বরুণ ও মিত্রের মতো নামগুলি বিস্মৃতপ্রায় হয়ে পড়ল। এছাড়া, রাম ও কৃষ্ণের ন্যায় অবতার-পুরুষের উপাসনা সর্বত্র প্রসার লাভ করল। ক্রমে বেশি বেশি স্বীকৃত হতে লাগল যে, নিরাকার বা নৈর্ব্যক্তিকের পটভূমিকাতেই রয়েছে সব ঐশ্বরিক ব্যক্তিত্ব, যা সেই অব্যয় অব্যক্ত তত্ত্বের অভিব্যক্তি মাত্র। সাম্প্রদায়িকভাবাপন্ন কিছু লোক তাদের দেবতা, অবতার ও মহাপুরুষগণের শ্রেষ্ঠত্বের কথা প্রচার করে থাকেন, কিন্তু পূর্ণ প্রসারিত দৃষ্টির অধিকারী জ্ঞানীরা—দেবতা বা অবতারগণ—সকল ব্যক্তিত্বকেই নিরাকার ঈশ্বরের বিবিধ প্রকাশ বলেই জানেন। অসংখ্য ঢেউ উঠলেও মহাসাগর যেমন চিরকাল অসীম ও অতলই থাকে, তেমনি চরম সত্য থেকে বিভিন্ন দেবদেবী অভিব্যক্ত হলেও তিনি বিকারহীনই থাকেন। অবশ্যই উচ্চ আধ্যাত্মিক চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপলব্ধি করেছেন যে, সাধনার শুরু যে কোন পবিত্র সাকার রূপ অবলম্বন করেই হোক না কেন অধ্যাত্ম-জীবনের লক্ষ্য হলো সেই নিরাকার তত্ত্বের—একমেবাদ্বিতীয়মের অপরোক্ষানুভূতি, যে অবস্থায় সাধক ও সাধ্য বা ঈশ্বর, জীবাত্মাসকল ও বিশ্ব একীভূত হয়ে একটুও অবিভাজ্য হয়ে যায়।
নিরাকারের উপাসনা ভক্তের নাগালের বাইরে, এদিকে সাকারে তার তত্ত্বান্বেষী মনের সন্তুষ্টি হয় না। তাই উন্নত ধরনের আধ্যাত্মিক উপাসনায় সাকার-নিরাকার উভয় ভাবের অবলম্বন বেশি জনপ্রিয়। কৃষ্ণ বা রাম, শিব বা বিষ্ণু, দুর্গা বা কালীর উপাসকগণের ক্ষেত্রেও একই কথা।
স্বামী যতীশ্বরানন্দের ‘ধ্যান ও আনন্দময় জীবন’ থেকে