সৌম্য নিয়োগী: বিনি দিদির হাত ধরে যখন প্রথমবার থিয়েটারের মঞ্চে পা রাখেন, বয়স তখন মাত্র সাত বছর। বিনি দিদি, বিনোদিনী দাসী। বাঙালি অবশ্য তাঁকে চেনে নটী বিনোদিনী নামে। আর সেই সাত বছরের কিশোরীর পরিচয় তারা... তারাসুন্দরী। ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে বাংলা রঙ্গমঞ্চে একসঙ্গে উচ্চারিত হতো চারটি নাম— নটী বিনোদিনী, তিনকড়ি দাসী, প্রভাদেবী এবং তারাসুন্দরী। ইতিহাস বলছে, শেষজন ছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে দাপুটে অভিনেত্রী। কিন্তু ইতিহাসে সেই বিনি দিদির কিংবদন্তিসম ছায়ায় তিনি হারিয়ে গিয়েছেন কবেই! এক শতাব্দী পর প্রচারের আলোর বাইরে থাকা সেই নটী আবারও রঙ্গমঞ্চে, স্বমহিমায়। কখনও তিনি রিজিয়া, কখনও জনা, কখনও সিরাজদ্দৌলা নাটকের জহরাবিবি। মুহূর্তেই আবার সংলাপ বদলে চন্দ্রশেখর নাটকের শৈবলিনী, মুখস্থ করা চোখা চোখা ইংরেজি সংলাপে ডেসডিমোনা... অসম্ভব সে কাজকে সম্ভব করলেন এক অভিনেত্রীই, গার্গী রায়চৌধুরী। সাত বছর পর আবারও তিনি মঞ্চে, একক অভিনয়ে। তবে এবার রীতিমতো কোম্পানি বানিয়ে, ‘থিয়েটার প্লাস’। সেই সংস্থার প্রথম নাটক খ্যাতনামা নাট্যকার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের ‘তারাসুন্দরী’।
এই নাটক ভূমিষ্ঠ হওয়ার পিছনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নাট্যকার ব্রাত্য বসুর। তাঁর পরামর্শ শুনে তারাসুন্দরী হয়ে উঠতে আর দ্বিতীয়বার ভাবেননি গার্গী। নামভূমিকায় তিনি অনন্য। শুধু এটুকু লিখলে অবশ্য তাঁর সঙ্গে অবিচার করা হয়। তিনি এই নাটকের সবকিছু। অন্তরালে থাকা নটীর জীবনে তিনি পর্দা তুলেছেন এক এক করে। এগিয়ে পিছিয়ে, হেসে কেঁদে, উল্লাসে যন্ত্রণায় এমনকী দাপটেও।
সৌমিক-পিয়ালির মঞ্চসজ্জা দুর্দান্ত। আলাদা করে উল্লেখ করতে হয়ে সৌমেন চক্রবর্তীর আলোর কাজ। তবে এ নাটকে প্রাণ দিয়েছেন অন্য দু’জন। পোশাক পরিকল্পনায় ফ্যাশন ডিজাইনার অভিষেক রায় এবং সংগীত পরিচালক প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়। জমকালো পোশাক থেকে সামান্য টুপি কিংবা চাদর... মুহূর্তে বদলে দিয়েছে প্রতিটি চরিত্রকে। প্রবুদ্ধর পরিচালনায় গানের তালিম নিয়েছেন গার্গী। ‘চাতক থাকে মেঘের আশে...’র মতো লালনগীতির পাশাপাশি পুরনো নাটকের গানে সাবলীল তাঁর কণ্ঠ।
পর্দায় নটীর ছায়া ভেদ করে মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন গার্গী, গুটি কেটে বেরনো প্রজাপতির মতো দু’হাত তুলে ফেটে পড়লেন প্রবল অট্টহাসিতে। সে দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। তারপর ১ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ধরে গোটা প্রেক্ষাগৃহ থম মেরে দেখল সেকালের পুরুষশাসিত রঙ্গমঞ্চের অন্দরের বর্ণনা, ঝকমকে রঙিন দুনিয়ায় এক নারীর উত্থান, পতন, বঞ্চনার অব্যক্ত কাহিনি। ঝলকে ঝলকে রং পরিবর্তনের মতো তারাসুন্দরীর জীবনে আসা বিভিন্ন চরিত্র হয়ে উঠলেন নিমেষে। শুধু তারাসুন্দরী কিংবা তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি নয়, গিরিশচন্দ্র ঘোষ থেকে কাপ্তান অমরেন্দ্র দত্ত, অপরেশ মুখুজ্জ্যে, মা নেত্যকালী সবাই গার্গীর অভিনয় গুণে জীবন্ত। জীবনের শেষপ্রান্তে তারার কাছে ফের আসেন বিনি দিদি। এবার সারদা মায়ের আশ্রমে যাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে। সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন তাঁরা। গার্গীর কণ্ঠে তখন নারী চেতনার উন্মেষ, ‘জাগো নারী জাগো...’! প্রবল হাততালি ততক্ষণে অবশ্য ছাপিয়ে যায় সেই সুর।