সংবাদদাতা, রামপুরহাট: বর্ষার মেঘ আকাশে জমতেই বীরভূম ও লাগোয়া ঝাড়খণ্ড সীমানায় ‘অন্যরকম’ এক মরশুমি ব্যবসার রমরমা বাড়তে শুরু করেছে। উপলক্ষ্য শ্রাবণ মাস। এই সময়ে একদল মানুষের মধ্যে শিবের উপাসনার নামে গাঁজা সেবনের প্রবণতা বাড়ে। আর এই ধর্মীয় আবেগের আড়ালে তৈরি হওয়া বিপুল চাহিদাকে হাতিয়ার করে কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসা চলে প্রতিবছর। যার নেপথ্যে রয়েছে আন্তঃরাজ্য পাচার চক্র।
প্রশাসন সূত্রে খবর, শ্রাবণের এই ‘পিক সিজন’-এ বাজার ধরতে মে মাস থেকেই কোমর বেঁধে নেমেছে পাচারকারীরা। লক্ষ্য একটাই, চাহিদার সুযোগ নিয়ে চড়া দামে বীরভূম ও লাগোয়া ঝাড়খণ্ডের বাজারে গাঁজা সরবরাহ করা। সূত্রে জানা গিয়েছে, আষাঢ় মাস থেকেই ‘অপারেশন শ্রাবণ’-এর প্রস্তুতি শুরু গিয়েছে।
সাধারণত শ্রাবণ মাসে গাঁজার দাম স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ পর্যন্ত হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই পোয়া বারো মাদক মাফিয়াদের। পুলিশের একটা সূত্রে জানা গেছে, ওড়িশা বা অসম সীমান্ত হয়ে যে গাঁজা উত্তরবঙ্গে ঢোকে, তাই বিভিন্ন হাত ঘুরে চলে আসছে দক্ষিণবঙ্গের এই প্রান্তে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে বীরভূমে গাঁজা আনার একটি অলিখিত ‘সাপ্লাই চেন’ তৈরি করে ফেলেছে পাচারকারীরা।
বীরভূমের রামপুরহাট মহকুমা ঝাড়খণ্ড যাতায়াতের অন্যতম করিডর। পাচারকারীরা এই রুটকেই তাদের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে বেছে নিয়েছে। উত্তরবঙ্গ থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে আসা গাঁজার একটি অংশ রামপুরহাট, নলহাটি, মুরারই, মল্লারপুর সহ বীরভূমের বিভিন্ন পকেটে মজুত করা হচ্ছে স্থানীয় ক্রেতাদের জন্য। আবার বিপুল পরিমাণ গাঁজা রামপুরহাট, মুরারই ও নলহাটি রুট ব্যবহার করে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ঝাড়খণ্ডের দুমকা, পাকুড় বা সাহেবগঞ্জের মতো এলাকায়, যেখানে শ্রাবণী মেলার কারণে এই সময়ে গাঁজার চাহিদা থাকে তুঙ্গে। পুলিশের চোখে ধুলো দিতে পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে। কখনও ছাত্র সেজে, কখনও আবার নিতান্তই সাধারণ পথচারীর বেশে হেঁটে যাওয়ার আড়ালে চলছে মাদক পাচার। এর আগে দেবদেবীর ছবির আড়ালে, সবজি বা ফলের গাড়ি, ভুয়ো অ্যাম্বুলেন্সের গোপন চেম্বারে গাঁজা পাচারের ঘটনা সামনে এসেছে। নজরদারি এড়াতে দূরপাল্লার বাস বা ট্রেনে মহিলারা ব্যাগের করে গাঁজা পাচার করতে গিয়েও ধরা পড়েছে। গত শনিবারই মুরারই, পাইকর ও মাড়গ্রামে বিভিন্ন কৌশলে গাঁজা পাচারের চেষ্টা চলছিল। কিন্তু পুলিশের তৎপরতায় হাতেনাতে উদ্ধার হয় ১৩ কেজি গাঁজা এবং গ্রেপ্তার করা হয় চার পাচারকারীকে। এখানেই শেষ নয়, রবিবার রাতেও মল্লারপুর থানার পুলিশের হাতে প্রায় দু’ কেজি গাঁজা সহ ধরা পড়ে বাবলু শেখ নামে এক পাচারকারী। ধৃতের বাড়ি মল্লারপুর থানার মাঝারিপাড়া গ্রামে। পুলিশ জানিয়েছে, বাবলু মুর্শিদাবাদ থেকে গাঁজা এনে বিক্রি করছিল। শ্রাবণ মাস শুরুর মুখে মাদকের কারবার রুখতে বীরভূম, মুর্শিদাবাদ ও ঝাড়খণ্ড সীমানার নাকা চেক পয়েন্টগুলোতে নজরদারি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জেলা পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন। তবে পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক এতটাই বিস্তৃত যে, কেবল পুলিশি তৎপরতায় এর জাল ছিন্ন করা সম্পূর্ণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ধর্মীয় আচারের নামে মাদকের এই নোংরা ব্যবসার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলাও সমান জরুরি।