নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর ও কলকাতা: একদা পুলিসের ‘ক্লোজ সোর্স’! লালবাজারকে তো বটেই, রাজ্য পুলিসকেও অপরাধ ও অপরাধীদের সম্পর্কে বিস্তর তথ্য জুগিয়েছিল মধুসূদন ওরফে লিটন মুখোপাধ্যায়। টানা সাত বছর খড়দহ থানার গাড়ির চুক্তিভিত্তিক চালক হিসেবে কাজও করেছিলেন। পুলিসের ‘সাতকাহন’ জানাই ছিল। এরই মাঝে ২০০৬ সালে খড়দহ থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেল যাত্রা। জেলবন্দি থাকাকালীন এহেন লিটন হুগলির গ্যাংস্টার টোটন বিশ্বাসের সংস্পর্শে আসে। ‘লাভজনক’ অস্ত্র কারবারের পাঠ নেয়। বলা যেতে পারে হাতেখড়ি! রাজ্য পুলিসের রেকর্ড অনুযায়ী, চুঁচুড়ার মতো মফস্সল এলাকায় টোটনই প্রথম গ্যাংস্টার, যারা অস্ত্রভাণ্ডারে মুঙ্গের থেকে এসে পৌঁছেছিল নাইন ও সেভেন এমএম পিস্তলের সঙ্গে কার্বাইনও। আক্ষরিক অর্থে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডিত টোটনই ছিল লিটনের ‘গুরু’।
তদন্তকারীরা বলছেন, জেল থেকে বেরিয়ে এসে সেই টোটনের নির্দেশমতো মুঙ্গেরের অস্ত্রকারবারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান লিটন। প্রথমদিকে টোটনের কথামতো মুঙ্গের থেকে কনসাইনমেন্ট এনে ক্যারিয়ার হিসেবে পৌঁছে দিতেন বিভিন্ন জায়গায়। এরপর লিটন নিজেই নেমে পড়েন আগ্নেয়াস্ত্রের কারবারে। তাঁর হাত ধরেই নাইন এমএম, সেভেন এমএম, রিভলভার, বোল্ট অ্যাকশন রাইফেলের মতো মারণাস্ত্র পৌঁছে যায় দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া-হুগলি সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। তদন্তে পুলিস জেনেছে, লিটনের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এখানে অপারেশন করে গিয়েছে বিহার সহ ভিন রাজ্যের দুষ্কৃতীরাও। নির্বিঘ্নে, লোকচক্ষু আড়ালে ‘কারবার’ চালাতেই রহড়ার অভিজাত রিজেন্ট পার্ক এলাকায় ওই আবাসনে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন লিটন। তদন্তে উঠে আসছে, গত ২২-২৩ বছর ধরে অস্ত্র কারবারে যুক্ত এই প্রৌঢ়। সোমবার রহড়ার ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ জেরাপর্বে লিটন তাঁর কারবার ও মেন্টরদের সম্পর্কে বিস্তর তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এই পর্বেই জানা গিয়েছে, ‘জুয়েল থিফ’ সুবোধ সিংয়ের গ্যাংয়ের সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল লিটনের। বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে সুবোধ গ্যাংয়ের সদস্যদেরও অস্ত্র বিক্রি করেছিলেন তিনি। মঙ্গলবার লিটনকে বারাকপুর মহকুমা আদালতে তোলা হয়। বিচারক তাঁকে ১০ দিনের পুলিস হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার রাতে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মুঙ্গেরের এক অস্ত্র ক্যারিয়ার তথা সাপ্লায়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে জেরা করেই মেলে মধুসূদন ওরফে লিটনের নাম। ওই রাতেই রহড়ার রিজেন্ট পার্ক এলাকায় লিটনের আস্তানা রেকি করে আসে পুলিস। এরপর সোমবার সকালে গ্রেপ্তারি। পুলিস জানিয়েছে, রহড়ার ওই ফ্ল্যাটে মুঙ্গের থেকে অস্ত্র নির্মাতারা আসত। আগ্নেয়াস্ত্রের বিভিন্ন অংশ অ্যাসেম্বলড করা, ডাইস তৈরি এবং মেরামতির কাজ ওই ফ্ল্যাটেই হতো। হোয়াটস অ্যাপে অস্ত্রের ছবি পাঠিয়ে অর্ডার নিতেন লিটন। এক একটি আর্মস বিক্রি হতো ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়। নাইন এমএম’এর দাম ছিল কিছুটা বেশি।