Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

মহাকাশে খেলনা

আমাদের ছোটবেলার অজস্র পুরনো স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখে খেলনা। খেলনা শিশুদের শুধু যে আনন্দ দেয় তা নয়, তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত জরুরি।

মহাকাশে খেলনা
  • ৩ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০

আমাদের ছোটবেলার অজস্র পুরনো স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখে খেলনা। খেলনা শিশুদের শুধু যে আনন্দ দেয় তা নয়, তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত জরুরি। মজার কথা হল কোনও কোনও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বড়দেরও খেলনার প্রয়োজন হয়। যেমনটি হয়েছিল সম্প্রতি মহাকাশে অ্যাক্সিয়ম-৪ অভিযানে শুভাংশু শুক্লাদের। এই অভিযানে শুভাংশু  প্রথম ভারতীয় মহাকাশচারী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) গিয়েছিলেন। তিনি সঙ্গে করে একটি খেলনা রাজহাঁস নিয়ে গিয়েছিলেন। যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘জয়’। অ্যাক্সিয়ম-৪-এর অভিযানে পাইলটের ভূমিকায় ছিলেন শুভাংশু। আর অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন নাসার প্রাক্তন নভশ্চর পেগি হুইটসন। ছিলেন দুই বিশেষজ্ঞ পোল্যান্ডের স্লাওস উজানানস্কি উইশনিউস্কি ও হাঙ্গেরির টিবোর কাপু।

Advertisement

শুভাংশুর ছ’বছরের ছেলে কিয়াশ জন্তুদের ভালোবাসে। সেই কারণেই ‘জয়’কে মহাকাশযানে তাঁদের সঙ্গে থাকার জন্য বেছে দিয়েছিল। ‘জয়’ কিন্তু সাধারণ খেলনা নয়। এটি একটি মজার এবং বিশেষ প্রতীকী খেলনা। অ্যাক্সিয়ম-৪-এর চার মহাকাশচারী ‘জয়’কে তাঁদের সঙ্গী ‘পঞ্চম ক্রু সদস্য’ হিসাবে ভেবে নিয়েছিলেন। মহাকাশচারীদের হালকা মেজাজ রাখতে এবং দলের মনোবল বাড়ানোর উপায় হিসেবে ‘জয়’কে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয় নাসা। মহাকাশচারীরা যখন দীর্ঘ সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন থাকে, তখন এই ধরনের খেলনা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে একটি আনন্দদায়ক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। এছাড়াও খেলনা রাজহাঁসটি তাঁদের মিশনের নিরাপত্তা এবং সাফল্যের জন্য একটি শুভকামনারও প্রতীক ছিল। মোটকথা, একটি ছোট খেলনা রাজহাঁস এই বড় মহাকাশ অভিযানে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে! ভারতীয় সংস্কৃতিতে রাজহাঁস প্রজ্ঞা ও বিশুদ্ধতার প্রতীক। পোল্যান্ডে একে আনুগত্য এবং হাঙ্গেরিতে করুণার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারতীয় পুরাণে জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং শিল্পের প্রতীক দেবী সরস্বতীর বাহন হিসাবে রাজহাঁসের পবিত্র তাৎপর্য রয়েছে। রাজহাঁসকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে শুভাংশু ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মহাকাশের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত করতে পেরেছিলেন। শুভাংশু বলেছিলেন, ‘জয় হল কক্ষপথে এক টুকরো ঘর— নক্ষত্রের সন্ধানে আমাদের ঐক্য, করুণা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।’
বিজ্ঞানের দিক থেকে খেলনা রাজহাঁসটির গুরুত্বও কম নয়। এটি মহাকাশযানে জিরো-জি বা শূন্য মাধ্যাকর্ষণ সূচক হিসাবে কাজ করে। জিরো-জি সূচক হল এমন একটি বস্তু, যা মহাকাশচারীদের মহাকাশ অভিযানের ওজনহীনতার পথে চলে যাওয়ার মূহূর্তটিকে মনে করিয়ে দেয়। অর্থাৎ যে মূহূর্তে মহাকাশযানটি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের সীমারেখার বাইরে চলে যাবে, তখনই খেলনাটি মহাকাশযানের ভিতর ভেসে বেড়াতে থাকবে। বোঝা যায় মাইক্রোগ্র্যাভিটি শুরু হয়ে গিয়েছে। মানব মহাকাশযানের ইতিহাসে জিরো-জি সূচক হিসাবে একটি নরম খেলনা ব্যবহারের ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এই ধারণাটি ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিনের অভিযানের সময় থেকে শুরু। তখন একটি ছোট পুতুল ওজনহীনতা শনাক্ত করার জন্য তাঁর সঙ্গে গিয়েছিল। রীতিকে অব্যাহত রেখে মহাকাশচারীরা বেবি ইয়োডা, ডাইনোসর থেকে শুরু করে পৃথিবী-থিমযুক্ত চরিত্র পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের প্লাশি (নরম তুলতুলে খেলনা) নিয়ে এসেছে।
অ্যাক্সিয়ম-৪-এ ‘জয়’ একাই একশো। স্পেসএক্স ড্রাগন মহাকাশযান পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর ‘জয়’ তার টিথার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভেসে বেড়াতে শুরু করে, যা নীরবে নিশ্চিত করে যে, মহাকাশযান এবং মহাকাশচারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে প্রবেশ করেছেন। ‘আমরা এখানে আছি। শুধু চারজন নই, আমাদের সঙ্গে আছে জিরো-জি সূচক ‘জয়’ও। যা সঙ্গে ভাসতে শুরু করেছিল। ‘জয়’ ক্যাপসুলের উপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে, কখনও কখনও আমাদের এখানে তাকে খুঁজে বের করতে হচ্ছে,’ পোলিশ মহাকাশচারী স্লাওস উজানানস্কি উইশনিউস্কি বলেছিলেন।
মানুষ যখন মহাকাশ অভিযানের কথা ভাবে, তখন তাঁরা জটিল যন্ত্র, উপগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার কথা ভাবে। তবে পর্দার আড়ালে, মহাকাশচারীরা কখনও কখনও তাঁদের সঙ্গে খেলনা নিয়ে যান, যাতে তাঁরা তাঁদের বাড়ির কথা মনে রাখতে পারে, পৃথিবী থেকে দেখার জন্য অনুসন্ধিৎসু শিশুদের অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং কখনও কখনও বিজ্ঞানের ধারণাগুলি প্রদর্শন করতে সাহায্য করতে পারে।

সম্পর্কিত সংবাদ