শ্যামাকালী থেকে জটাকালী, প্রায় একশো বছরের পুজোয় আজও মাতে জিয়াগঞ্জবাসী
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আনন্দ সাহা, লালবাগ: মাথাভর্তি ঘন কোঁকড়ানো চুল। উপরে বাঁধা খোঁপা, পিছনে ছড়িয়ে থাকা কেশরাশি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় দেবীর মাথায় জটা। সেই থেকেই নাম জটাকালী। প্রায় একশো বছরের প্রাচীন এই কালীপুজোকে ঘিরে আজও উৎসবে মেতে ওঠেন জিয়াগঞ্জ শহরের আট থেকে আশি। ভক্তদের বিশ্বাস, জটাকালী অত্যন্ত জাগ্রত। তাই কালীপুজোর রাতে শুধু জিয়াগঞ্জ নয়, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত এমনকি জেলার বাইরেও বহু মানুষ আসেন মানত করতে। শাক্তমতে পুজো হলেও দেবীকে আমিষ ভোগ দেওয়া হয় না। খিচুড়ি সহ নানা নিরামিষ পদে মায়ের ভোগ সাজানো হয়।

Advertisement

লালবাগ মহকুমার প্রাচীন কালীপুজোগুলির মধ্যে অন্যতম জিয়াগঞ্জের এই জটাকালী পুজো। এই পুজোর বিশেষত্ব হল, কালীপুজোর পরে মৃন্ময়ী প্রতিমাকে মন্দিরে রেখে দেওয়া হয়। সারা বছর চলে নিত্যপুজো। প্রতি অমাবস্যাতেও দেবীর বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। কালীপুজোর দু’দিন আগে পুরনো প্রতিমাকে মন্দিরের বাইরে নিয়ে আসা হয়। তার পরে ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিন একাধিক ঢাকের বাদ্যি সহযোগে এক বছর আগের প্রতিমাকে ভাগীরথীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, জিয়াগঞ্জের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির হাত ধরে এই পুজোর সূচনা। প্রথম দিকে দেবী শ্যামাকালী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কালীপুজোর পরেও কয়েক দিন ধরে চলত নাটক, যাত্রা সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জিয়াগঞ্জের পাশাপাশি নবগ্রাম, সাগরদিঘি, ভগবানগোলা ও লালগোলা থেকেও বহু মানুষ সেই অনুষ্ঠান দেখতে ভিড় করতেন। ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি বয়সের ভারে একসময় আর পুজোর দায়িত্ব সামলালে পারেনি। বন্ধ হয়ে যায় পুজো। কয়েক বছর পরে স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্যোগ নিয়ে ফের পুজো শুরু করে। জিয়াগঞ্জের সিংহবাহিনী মন্দির সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় নতুন করে পুজো শুরু হয়। পরে সেখানে তৈরি হয় পাকা মন্দির। ১৯৭৩ সাল থেকে বড় মাটির প্রতিমা গড়ে পুজো শুরু হয়। সেই সময় থেকেই শ্যামাকালীর পরিবর্তে জটাকালী রূপে পূজিত হয়ে আসছেন দেবী।
কিন্তু শ্যামাকালী থেকে জটাকালী হয়ে ওঠার পিছনেও রয়েছে কাহিনি। পুজো উদ্যোক্তাদের কথায়, একসময় মায়ের পিছনে চালি তৈরি এবং প্রতিমা সাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় সাজসজ্জা কেনার মতো অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছিল না। খরচ কমাতে দেবীকে ভৈরবী রূপে পুজো করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শোলার গয়নার বদলে জবাফুলের মালা ও রুদ্রাক্ষ দিয়ে সাজানো হয় মাকে। মাথার উপরে গোল করে বাঁধা খোঁপা, গলায় ও দুই হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। ঘন কোঁকড়ানো চুলের কারণে দেবীকে দেখে জটাধারী ভৈরবীর মতো মনে হয়। ধীরে ধীরে সেই রূপ থেকেই দেবীর নাম হয়ে যায় জটাকালী।
উদ্যোক্তা উদয় সাহা বলেন, মা এখানে ভৈরবী রূপে পূজিত হন। পুজোকে ঘিরে প্রসাদ বিতরণের আয়োজনও থাকে বড় আকারে। উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, পুজোর রাতে প্রায় এক কুইন্টাল চালের খিচুড়ি রান্না করা হয়। পরের দিন সকাল থেকে মাকে দর্শন করতে আসা ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ চলে।