Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / বিনোদন

বাস কন্ডাক্টর, কুলি থেকে সুপারস্টার! রজনীকান্ত ৫০

জীর্ণ পোশাকের শিবাজি রাও গায়কোয়াড়ের মধ্যে সেভাবে আলাদা কোনও বিশেষত্ব ছিল না। সেই তরুণের হাত ধরেই কে বালাচন্দ্র পরিচালিত তামিল সিনেমা ‘অপূর্ব রাগাঙ্গাল’ সুপারহিট।

বাস কন্ডাক্টর, কুলি থেকে সুপারস্টার! রজনীকান্ত ৫০
  • ১৭ আগস্ট, ২০২৫ ১৮:০৮
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস, কলকাতা: জীর্ণ পোশাকের শিবাজি রাও গায়কোয়াড়ের মধ্যে সেভাবে আলাদা কোনও বিশেষত্ব ছিল না। সেই তরুণের হাত ধরেই কে বালাচন্দ্র পরিচালিত তামিল সিনেমা ‘অপূর্ব রাগাঙ্গাল’ সুপারহিট। যেখানে দুরন্ত যুবকের ভূমিকায় তাঁর আত্মপ্রকাশ। কে জানত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি জন্ম দেবে ভারতীয় সিনেমার নতুন এক তারকাকে। যিনি পাঁচ দশক পরও সমান দাপটে বক্স অফিসে ছড়ি ঘোরাবেন। সময়ের সঙ্গে শিবাজি রাও গায়কোয়াড়কে দেশবাসী চিনেছে রজনীকান্ত নামেই। ১৫ আগস্ট এই তারকার কেরিয়ারের ৫০ বছর পূর্তি। রজনীকান্তের জন্য ৫০ বছর কেবল টিকে থাকার গল্প নয়— এটা একটানা শাসনের গল্প, যেখানে সিনেমা হল রূপ নিয়েছে মন্দিরে, আর দর্শকরা পরিণত হয়েছে ভক্তে। তার বেশিরভাগ কাজ হয়েছে তামিল ভাষার চলচ্চিত্র শিল্পে, যেখানে তাঁর সিনেমা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সংজ্ঞায়িত করেছে। এ সপ্তাহেই মুক্তি পেয়েছে তাঁর নতুন সিনেমা ‘কুলি’।

Advertisement

আজকের রজনীকান্ত মানেই সিগারেট ঘোরানো, সানগ্লাস উল্টে ফেলা, অনন্য ভঙ্গিতে হাঁটা আর ঠোঁটে বিদ্রূপাত্মক হাসি। কিন্তু কেরিয়ারের শুরুতে এমন নায়কোচিত ভূমিকায় হাজির হতেন না। বরং একের পর এক খল চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। আভারগল, ১৬ ভায়াথিনিলে, আড়ু পুলি আট্টাম থেকে গায়ত্রী— তিনি ছিলেন ভীতি জাগানো এক খলনায়ক। ১৯৭৭ সালে এরাঙ্কি শর্মার তেলেগু ছবি ‘চিলাকাম্মা চেপ্পিন্দি’তে প্রথম নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন রজনীকান্ত। একই বছরে এসপি মুথুরামানের ‘ভুবনা ওরু কেলভি কুরি’তে শোকার্ত প্রেমিকের চরিত্র এনে দেয় সমালোচকদের প্রশংসা। কিন্তু ১৯৮০ সালের ‘বিলা’ অর্থাৎ অমিতাভ বচ্চনের ‘ডন’-এর তামিল সংস্করণ তাঁকে দিল এক নতুন পরিচয়। এখানে তিনি ধূসর চরিত্রকে এমনভাবে জীবন্ত করলেন, যা তাঁকে অন্য সকলের থেকে আলাদা করে দিল।

রজনীকান্তের গল্প এক বহিরাগত থেকে ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে প্রিয় অন্তর্দেশীয় তারকা হয়ে ওঠার গল্প। এক শ্রমজীবী নায়ক, যার আবেদন ভাষা, শ্রেণি ও ভূগোলের সীমানা অতিক্রম করেছে।

আশির দশক তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করল শুধু অভিনেতা নয়, সুপারস্টার হিসেবেও। হিন্দি সিনেমায় পা রাখা, এমনকি হলিউডে চেষ্টা— সব মিলিয়ে উত্থান-পতন একসঙ্গে চলেছে। ‘থালাপতি, ‘আন্নামালাই’, ‘মুথু’, ‘পদয়াপ্পা’, ‘চন্দ্রমুখী’—এসব ছবিতে তিনি হয়ে উঠেছেন কখনও ত্রাতা, কখনও আবার অব্যর্থ সুপারহিরো। তবু মাঝেমধ্যে ফিরেছেন ধূসর দুনিয়ায়। যেমন বলা যায় ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শিবাজি’র কথা। ২০১৬ সালের ‘কাবলি’তে রজনীকান্ত শুধু চরিত্রের ধূসরতা নয়, নিজের চুল-দাঁড়ির ধূসর রংও পর্দায় এনেছিলেন। মালয়েশিয়ার এক গ্যাংস্টারের ভূমিকায় তিনি ছিলেন প্রতিশোধ ও মুক্তির তৃষ্ণায় কাতর। ২০১৮ সালের ‘কালা’য় দেখা গেল এক ‘অসম্পূর্ণ’ গডফাদারকে, যিনি ভুল করতেও পিছপা নন। ‘পেট্টা’ (২০১৯)-তে তিনি হলেন এমন এক হোস্টেলের ওয়ার্ডেন, অন্ধকার অতীত যাকে তাড়া করে ফেরে।

এ সময়ের রজনীকান্ত যদিও ‘ত্রাতা’র চরিত্রে থেকেছেন, তবু তিনি দেখিয়েছেন— নায়কও ভুল করতে পারে, দুর্বল হতে পারে। ‘দরবার’ (২০২০)-এ তিনি শোকের বশে হিংস্র হয়ে ওঠা এক পুলিস অফিসার, ‘ভেট্টাইয়ান’ (২০২৪)-এ তিনি এক ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’, যাকে নিজের ভুলের মুখোমুখি হতে হয়। আর ‘জেলার’ (২০২৩)-এ তিনি এক অবসরপ্রাপ্ত জেলারের ভূমিকায়, যিনি ছেলেকে বাঁচাতে মিথ্যা বলেন, এমনকি উন্মোচন করেন নিজের ভয়ংকর দিকও। ২০১৪ সালে যখন রজনীকান্ত টুইটারে (বর্তমানে এক্স) যোগ দেন, এক রাতেই ২ লাখ ১০ হাজার ভক্ত তাঁর অনুসারী হয়েছিল, যা ছিল তখনকার দিনে ভারতের সব তারকার মধ্যে দ্রুততম। ২০২৩ সালে তামিল ছবি ‘জেলার’ বক্স অফিসে ৬০০ কোটির বেশি আয় করে। রজনী হয়ে ওঠেন একমাত্র ভারতীয় অভিনেতা, যাঁর দু’টি ছবি ৫০০ কোটির গণ্ডি পেরিয়েছে। আজও ছবি মুক্তির আগে তাঁর ভক্তরা সিনেমা হলের পোস্টার ও বিশাল কাটআউটে দুধ ঢালেন।

১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর শিবাজি রাও গায়কোয়াড় নামে জন্ম। চার ভাই–বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন কনিষ্ঠ। বাবা ছিলেন পুলিস কনস্টেবল। বাবার অবসরের পর পরিবার চলে যায় হনুমন্থ নগরে। মাত্র ৯ বছর বয়সে হারান মাকে। গাভিপুরম গভর্নমেন্ট কন্নড় মডেল প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করেন রজনীকান্ত। ছিলেন যেমন পড়াশোনায় মনোযোগী, তেমনই দুষ্টামিতেও পটু। ক্রিকেট, ফুটবলের মতো খেলায়ও ছিল তাঁর আগ্রহ। পরে ভাই তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেন রামকৃষ্ণ মিশনে। সেখানেই আধ্যাত্মচর্চার প্রতি অনুরাগ তৈরি হয় তাঁর, আর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ জাগে। মঞ্চনাটকে অভিনয় করে শিক্ষক-সহপাঠীদের প্রশংসা কুড়ান। জীবনে বিচিত্র সব কাজ করেছেন। কখনও অফিস বয়, কুলি, কাঠমিস্ত্রি, বাস কন্ডাক্টর। বাসে টিকিট দেওয়া আর খুচরা ফেরানোর ভঙ্গি এতই জনপ্রিয় ছিল যে যাত্রীরা তাঁর বাসের জন্য অপেক্ষা করতেন। কাজ যা–ই করুন অভিনয়ের স্বপ্ন ছাড়েননি। পরিবার প্রথমে আপত্তি জানালেও বন্ধুর সাহায্যে ভর্তি হন মাদ্রাজ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। পরে অল্প কিছু তামিল শব্দ জেনেই মাদ্রাজ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। সেখানেই পরিচালক কে বালাচন্দ্র তাঁর নতুন নাম দেন—রজনীকান্ত। ‘রজনী’ অর্থাৎ রাতের রঙ। কে বালাচন্দ্র বলেছিলেন, রজনীকান্ত তাঁর সংলাপ বলার ধারা দিয়ে প্রচলিত নিয়ম ভেঙেছেন। ছোট সংলাপ, তীক্ষ্ণ ভঙ্গি আর ক্যামেরার কাছে এসে বলা কথা— সবই দর্শকের কাছে তাঁকে নতুনভাবে ধরেছে।

নিজের অতীত আড়াল করেন না। কিছুদিন আগেই ‘কুলি’ ছবির ট্রেলার প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘কুলি হয়ে কাজ করার সময় অনেকবার অপমান সহ্য করেছি। একদিন এক ভদ্রলোক আমাকে দু’টাকা দিয়ে বলল, ওর লাগেজ টেম্পোতে তুলে দিতে। কণ্ঠটা কেমন যেন চেনা লাগছিল। পরে বুঝি, সে আমার কলেজের বন্ধু! আমি একসময় ওকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি করতাম। সেদিন জীবনে প্রথমবার আমি কেঁদে ফেলেছিলাম।’ এটাই ছিল ৭৪ বছরের এক অভিনেতার স্মৃতিচারণ। 

ছোটখাটো গড়ন। মাথায় টাক। সব মিলিয়ে মোটেও নায়কোচিত চেহারা নয়। কিন্তু নামটা যে রজনীকান্ত। তাঁর নামটাই যথেষ্ট। আজও তিনি অপ্রতিরোধ্য। অর্জন করেছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ও পদ্ম বিভূষণ। ভক্তদের কাছে তিনি অর্ধদেবতা, যাঁর পূজা পৌরাণিক মাত্রা পেয়েছে। যেমন— একনিষ্ঠ ভক্ত এ রাজেন্দ্রন বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরের কারও না কারও রূপ নিতে হয়। রজনীকান্ত ঈশ্বরেরই এক রূপ...।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ