অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: বদলে যাচ্ছে বোমা-বারুদের স্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা মঙ্গলকোট। বদলে যাচ্ছে মহিলাদের হাত ধরে সামাজিক জীবনযাত্রা। একদা মঙ্গলকোটের পরিচয় ছিল রাজনৈতিক সন্ত্রাস কবলিত এলাকা বলে। এখন সেই জায়গায় সূচ-সুতোয় জীবন বদলের স্বপ্ন বুনছেন প্রতিটি গ্রামের বধূরা। তাঁদের তৈরি কাঁথাস্টিচ ‘গাছি তসর’ কদর পাচ্ছে অন্যান্য রাজ্যেও। হাতে টাকা আসছে। চার হাতে আয়। হাল বদলে যাচ্ছে সংসারের।
ওঁদের স্বামীরা পরিযায়ী শ্রমিক। কেউ কেরলে রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। কেউ আবার চেন্নাইয়ে। পাড়ায় পরচর্চা, পরনিন্দায় নেই। বরং সবাই ব্যস্ত সূচ-সূতো নিয়ে। একের পর এক তৈরি করে চলেন ‘গাছি তসর’। তাতে সুক্ষ্ম কারুকাজ। কাঁথাস্টিচের শাড়ি। মঙ্গলকোটের লক্ষ্মীপুর, শ্যামবাজার, পিণ্ডিরা গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে এখন সৃষ্টি-সুখে উল্লসিত বধূরা। তাঁদের তৈরি কাঁথাস্টিচের শাড়িতে মজেছে চণ্ডীগড়, দিল্লি, কলকাতা শহরের অভিজাত মহিলারা। বিক্রি হচ্ছে ভালোই। স্বনির্ভর হওয়ার দিশা পেয়ে সবার মুখে চওড়া হাসি। আরও ভালো কাজ করতে চান। তাই, প্রশিক্ষণের জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান সকলেই।
মঙ্গলকোটের পিণ্ডিরা, লক্ষীপুর গ্রামগুলিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। কথায় কথায় বোমা-বারুদের ঝলকানি। গত এগারো বছরে ছবিটা বদলে গিয়েছে একেবারেই। এখন উৎসব মরশুম। ওইসব গ্রামের মহিলারা খাওয়ার ফুরসত পাচ্ছেন। সবার হাতে শাড়ি সহ মেয়েদের নানা পোশাকে কাঁথাস্টিচের নকশা ফুটিয়ে তোলার প্রচুর কাজ। দিনের পর দিন তাঁদের শিল্পসৃষ্টি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিক্রিও বাড়ছে। কষ্টের সংসারে এখন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য।
শিল্পীরা বলছিলেন, বোলপুর থেকে শাড়ির থান কিনে এনে তাতে কাঁথাস্টিচের নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। গাছি তসর থেকে বেঙ্গালুরু সিল্ক সবই তাঁরা তৈরি করেন৷ লক্ষ্মীপুর গ্রামের শিল্পী পারুল খাতুনের কথায়, ‘গাছি তসর আমরা দশ থেকে ১২ হাজার টাকা দাম পাই। আর বেঙ্গালুরু সিল্ক ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা দাম পাই। আমাদের হাতের তৈরি শাড়ি চণ্ডীগড়, দিল্লি, কলকাতায় পাড়ি দিচ্ছে।’ আর এক শিল্পী সেরিনা বিবি বলছিলেন, ‘আমাদের স্বামীরা ভিনরাজ্যে পরিয়ায়ী শ্রমিকের কাজ করে। আজকের দিনে একার আয়ে সংসার চালানো বেশ কঠিন। তাই কাঁথাস্টিচের কাজ করছি। বাড়তি উপার্জন হচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের বায়না মেটাচ্ছি। এভাবে স্বনির্ভর হওয়ার আনন্দটাই আলাদা।’ সেরিনার কথায় থাবা বসিয়ে টুম্পা বিবি, টুলি বিবিরা বলছিলেন, ‘আমরা যদি সরকারি প্রশিক্ষণ পেতাম। তা হলে বিদেশেও আমাদের সৃষ্টিকর্ম সমাদৃত হতো। আমাদের কাঁথাস্টিচের কাজ নিয়ে অনেকেই এখন বিদেশ যাচ্ছেন। আমরা এখানে শুধু মেলাগুলিতে যাই৷ ঠাকুরমারদের কাছে শেখা কাঁথা বোনা এমন ভাবে কাজে লাগবে ভাবতে পারিনি।’
মঙ্গলকোটের এই সব গ্রামে এখন ঘরে ঘরে ব্যস্ততা। এবার পুজোয় ভালো চাহিদা। মহিলারা রান্নাবান্নার কাজ সেরেই বসে পড়ে কাঁথাস্টিচের কাজ নেই। শাড়ি থেকে শুরু করে মেয়েদের চুড়িদার, ছেলেদের পাঞ্জাবি-প্রায় সব পোশাকেই নকশা ফুটিয়ে তুলছেন। কেউ নিজের বাড়িতে বসে বোনেন। কোথাও আবার একসঙ্গে বসে গল্প করতে করতে শিল্পসৃষ্টিতে মজে। কারও মধ্যে কোনও হিংসা নেই, ঈর্ষা নেই, অশান্তি নেই। বদলে গিয়েছে অশান্ত মঙ্গলকোট।-নিজস্ব চিত্র