


রাহুল চক্রবর্তী, কলকাতা: লোকের মুখে মুখে একটা কথা ঘোরাফেরা করছে, মানিকতলার বড়ো ঘড়িও অনেকসময় ঝড়ে থমকে গিয়েছে। কিছুদিনের জন্য ঘোরেনি ঘড়ির কাঁটা। কিন্তু সময়ের দলিলে সাধন পান্ডে কিংবা তাঁর উত্তরসূরির জয়যাত্রা বন্ধ হয়নি ৪২ বছরে...। এটাই কি তাহলে মিথ বা গড়! ঠিক এই প্রশ্নটাই ছড়িয়ে রয়েছে মানিকতলার অলিতেগলিতে। সময়ের সঙ্গে রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা সকলেই জানেন। উত্থান-পতনের চক্রব্যূহে তাবড় রাজনীতিবিদদের জীবনপঞ্জিতে সময়ের তারতম্যে অনেক বদল ঘটে গিয়েছে। কিন্তু আগের বড়তলা এখনকার সাবেক মানিকতলার সঙ্গে রাজনীতির যদি মিল খুঁজতে হয়, তাহলে সেটা গিয়ে মিলবে পান্ডে পরিবারে।
১৯৮৪। তখনকার বড়তলা বিধানসভা কেন্দ্র। সেবার উপনির্বাচনে জিতে প্রথমবার বিধায়ক হন সাধন পান্ডে। তখন অবশ্য কংগ্রেসের জমানা। সেই সময় থেকেই কংগ্রেসের দাপুটে নেতা হিসেবে সাধন পান্ডের আত্মপ্রকাশ। নিজের সংগঠনিক দক্ষতা, এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সদা মুখের হাসি সাধনবাবুকে আর কোনোদিনও পিছনে ফিরে তাঁকাতে হয়নি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে জয়যাত্রা সময়ের সঙ্গেই এগিয়ে চলেছে। ১৯৮৭, ১৯৯১, ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসের টিকিটেই তৎকালীন বড়তলা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে টানা জয়লাভ করেন সাধন পান্ডে। পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর ২০০১ এবং ২০০৬ সালে এই কেন্দ্র থেকেই জোড়াফুলের টিকিটে নির্বাচিত হন সাধনবাবু।
পরে বড়তলা বিধানসভা কেন্দ্রটি অবলুপ্ত হয়ে যায়। এলাকা বিন্যাসের ফলে ওই অংশটি মানিকতলার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়, এবং তা মানিকতলা বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত হয়। এতসবের পরেও সাধন পান্ডের কিন্তু জয়ের পতাকা কেউ নামাতে পারেনি। ২০১১, ২০১৬, ২০২১ সালে মানিকতলা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে বিধায়ক নির্বাচিত হন সাধন পান্ডে। অর্থাৎ বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের ক্যারিয়ারে সাধন পান্ডের এই সুদীর্ঘ সময়ের জয়যাত্রা স্মরণীয় বটে। ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হন তিনি। তারপর সাধন পান্ডের উত্তরসূরি সহধর্মিণী সুপ্তি পান্ডেকে ২০২৪ সালের উপনির্বাচনের মধ্যে দিয়ে বিধানসভা পাঠান এলাকার মানুষ। তাহলে সব মিলিয়ে ১০ বার একটানা বিধায়ক পান্ডে পরিবার থেকে। এবার ১১তম লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মানিকতলায় জয়ের স্ট্রাটেজি সাজিয়েছেন সাধনকন্যা শ্রেয়া।
ঘটনাচক্রে প্রচারে বেরিয়েও শ্রেয়াকে শুনতে হয়েছে বাবা কীভাবে পাশে থেকেছেন সেই সুখস্মৃতি। গণেন্দ্র মিত্র লেনে এক মহিলা এগিয়ে এসে দেখালেন, ১৯৯৫ সালে পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য সাধনবাবু একটি ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন। সেটা আজও অক্ষত রয়েছে।
আসলে ঘড়িটি একটি ঘটনা হলেও মানিকতলায় বাঁধা আছে ‘সাধন-সময়’। শ্রেয়ার কথায়, বাবার সঙ্গে এলাকার মানুষের যোগাযোগ মানিকতলার প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায়। এই কারণে প্রচারে বেরিয়ে বাবার কথা বলতেই কেঁদে ফেলেছেন সত্তরোর্ধ্ব কাকু-জ্যেঠুরা। আর আমি যখন তাঁদেরকে গিয়ে প্রণাম করছি, তখন আশীর্বাদের হাত আমার মাথায় রেখে গুরুজনরা বলেছেন, সাধন পান্ডের সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তুমি এগিয়ে চল। আমরা তোমার পাশে আছি। আর মানুষের ভালোবাসা কেমন হতে পারে তার উদাহরণ হল দই-চন্দনের ফোঁটা দিয়ে আশীর্বাদ করে দিচ্ছেন।
রাজনীতিতে সাধনবাবুর একদা সতীর্থ তাপস রায় এবার মানিকতলায় বিজেপি প্রার্থী। তাপসবাবু মনে করেন, রাজনীতিতে গড় বা মিথ বলে কিছু হয় না। তাঁর বরং প্রশ্ন, পান্ডে পরিবারের বাইরে কেন প্রার্থী দিতে পারল না তৃণমূল? প্রায় একই সুরে কংগ্রেস প্রার্থী সুমন রায়চৌধুরীর দাবি, মানিকতলা এবার ফিরছে কংগ্রেসের হাতে। অন্যদিকে, সিপিএম প্রার্থী মৌসুমি ঘোষের হাত ধরে মানিকতলা আবার ফিরে পেতে চায় বামেরা।