নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: একসময় বাদুড়িয়ার রাস্তায় অটো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রথমে কংগ্রেসের টিকিটে বাদুড়িয়া পুরসভায় কাউন্সিলার। ২০১১ সালের পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান। স্থানীয়দের দাবি, তখন থেকে বদলে যেতে শুরু করে ছবিটা। একজন সাধারণ অটোচালকের জীবন বদলে ধীরে ধীরে তৈরি হয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক চরিত্র। যার ছায়া ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। আর এখন সেই দীপঙ্কর ভট্টাচার্যই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। সোমবার রাতে গ্রেপ্তারের পর তাঁর ঘনিষ্ঠ সাগর ওরফে শামিম গাজির পাটখেতে তল্লাশি চালাতেই প্রকাশ্যে আসে ‘গুপ্তধন’। মাটির নীচ থেকে উদ্ধার হয় চারটি বস্তা ও একটি ট্রলি ব্যাগ ভরতি নগদ টাকা। শুধু নগদই নয়, মিলেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিও। পুলিশের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া নগদের পরিমাণ ২ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা।
ঘটনার পর বদলে যায় এলাকার রাজনৈতিক আবহ। রাতভর চলে টাকা গোনার কাজ—ব্যাংক ও প্রশাসনের আধিকারিকদের উপস্থিতিতে আনা হয় মানি কাউন্টিং মেশিন। একাধিক দফায় গণনার পর নিশ্চিত হয় বিপুল টাকার অঙ্ক। কিন্তু তদন্তকারীদের একাংশের বক্তব্য, এটা হয়তো পুরো ছবির মাত্র একটা অংশ। উদ্ধারের পর থেকেই সামনে আসতে শুরু করেছে দীপঙ্করের বিরুদ্ধে পুরানো অভিযোগের তালিকা। বিরোধীদের দাবি, তাঁর উত্থান ছিল না শুধু রাজনৈতিক সাফল্য—বরং তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের এক ‘সিস্টেম’। বিজেপির অভিযোগ, বাদুড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার ধারে দোকান বসানো, হকার জোন বা অস্থায়ী কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে কার্যত বসত ‘টোল’ ব্যবস্থা। অভিযোগ, সেই টোলের নামে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হত, যার কোনো হিসাব বা স্বচ্ছতা ছিল না। শুধু তাই নয়, সরকারি পরিষেবা পাইয়ে দেওয়ার নামেও নাকি চলত ‘অগ্রিম প্রণামী’র সংস্কৃতি। বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা, কাগজপত্র অনুমোদন, স্থানীয় পরিষেবার কাজ—সবক্ষেত্রে টাকা ছাড়া কিছুই এগোত না বলে দাবি বিজেপির। তাদের আরও দাবি, বাদুড়িয়া পুরসভার ১৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১১ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাস করেন দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। সেই প্রাসাদোপম বাড়ি নিয়েও উঠেছে অভিযোগের আঙুল। একসময় পুকুর ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে সেই বিশাল বাড়ি। যা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠলেও প্রশাসনিক স্তরে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে পদ্মশিবিরের নেতারা। বিজেপি নেতা রামপ্রসাদ বিশ্বাসের বক্তব্য, এটা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক উত্থান নয়। অটোচালক থেকে শুরু করে ক্ষমতার কেন্দ্রে ওঠার এই যাত্রাপথের আড়ালে একটা সংগঠিত ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। রাস্তার টোল, কাটমানি, পরিষেবার নামে টাকা—সব মিলিয়ে একটা পুরো নেটওয়ার্ক কাজ করত। এখন পাটখেতে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হওয়ার পর সেই প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হচ্ছে। এদিকে গ্রেপ্তার ও নগদ উদ্ধারের ঘটনায় বাদুড়িয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে চাঞ্চল্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে আলোচনা, কটাক্ষ, ট্রোল। রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—এই ২ কোটি ২৪ লক্ষ কি শুধুই এক জায়গার হিসাব নাকি আরো বড়ো কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারির দরজা খুলতে চলেছে তদন্তে?