নয়াদিল্লি: ‘অ্যায় খুন কে পেয়াসে বাত সুনো...’! সোশ্যাল মিডিয়ায় কবিতা পোস্ট করেছিলেন কংগ্রেস এমপি ইমরান প্রতাপগঢ়ি। আর সেই ‘অপরাধে’ তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে গুজরাত পুলিস। শুক্রবার কংগ্রেস সাংসদের বিরুদ্ধে করা সেই এফআইআর খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। গুজরাত পুলিসের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিল, বাক স্বাধীনতা সুস্থ গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইচ্ছেমতো এতে লাগাম পরানো যায় না। দিনকয়েক আগেই স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান কুণাল কামরার ‘গদ্দার’ প্যারোডি ঘিরে রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে। প্রশ্ন উঠেছে বাক স্বাধীনতার পরিধি নিয়েও। তার মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করছে রাজনৈতিক তথ্যাভিজ্ঞ মহল।
কখনও বাক স্বাধীনতায় লাগাম। কখনও আবার বিরোধী-কণ্ঠরোধ। মোদি জমানায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিরোধী দল, সচেতন নাগরিক সমাজের পাশাপাশি এনিয়ে সরব হয়েছে আমেরিকা সহ একাধিক দেশও। কংগ্রেস সাংসদের বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হওয়ায় এবার সুপ্রিম কোর্টের রোষের মুখে পড়ল বিজেপি শাসিত গুজরাত সরকার। বিচারপতি এ এস ওকা ও বিচারপতি উজ্জ্বল ভুয়ানের বেঞ্চ এদিন জানায়, ‘বাক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার একটি সভ্য ও সুস্থ সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এটি ছাড়া সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ মোতাবেক নিশ্চিন্ত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করা সম্ভব নয়। সাহিত্যের পাশাপাশি কবিতা, নাটক, শিল্প, ব্যঙ্গচিত্র জীবনকে সমৃদ্ধ করে।’ এখানেই অবশ্য থামেনি শীর্ষ আদালত। গুজরাতের বিজেপি সরকারের পুলিসকে তুলোধোনা করে তাদের বার্তা, ‘যাঁরা সবকিছুকেই হুমকি বা সমালোচনার নজরে দেখেন, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শত্রুতা ছড়ানোর মতো অপরাধকে যাচাই করা যায় না।’ দুই বিচারপতির বেঞ্চ বলে, ‘সাধারণতন্ত্রের পর ৭৫ বছরেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। এখন আমরা আমাদের মৌলিক নীতির প্রতি এতটা দুর্বল হতে পারি না। শুধুমাত্র একটি কবিতা আবৃত্তি বা কোনও স্ট্যান্ড আপ কমেডি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা বা ঘৃণার জন্ম দেয় বলে অভিযোগ ওঠার প্রশ্নই ওঠে না।’
গোটা ঘটনার সূত্রপাত সোশ্যাল মিডিয়ায় ইমরান প্রতাপগঢ়ির করা একটি ভিডিও পোস্ট ঘিরে। গত ২৯ ডিসেম্বর সোশ্যাল মিডিয়ায় ৪৬ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি পোস্ট করেন ইমরান। তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত করছে বলে পুলিসের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন জামনগরের এক বাসিন্দা। হিংসায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে কংগ্রেস সাংসদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় এফআইআর। সেই এফআইআরকে চ্যালেঞ্জ করে গুজরাত হাইকোর্টে আবেদন জানান ইমরান। গত জানুয়ারি মাসে শুনানি চলাকালীন গুজরাত হাইকোর্ট সেই এফআইআর খারিজ করতে চায়নি। তারপরই শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। চলতি মাসের শুরুতে এই মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি ওকা সাফ বলেন, ‘এখন সৃজনশীলতার প্রতি কেউই আর শ্রদ্ধাশীল নন। যদি আপনি কবিতাটি পড়েন, বুঝতে পারবেন এখানে অন্যায়কেও ভালোবেসে সহ্য করতে বলা হয়েছে। এর সঙ্গে হিংসার কোনও সংযোগ নেই।’ সুপ্রিম কোর্টের কড়া বার্তা, ‘সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার ভার আদালত ও পুলিসের উপরে বর্তায়। আর এই অধিকারের মধ্যে বাক স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বিভিন্ন কথা বা লেখা আমাদের (বিচারপতি) পছন্দ না-ই হতে পারে। কিন্তু সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করাটা আমাদের কর্তব্য।’
এখন প্রশ্ন একটাই— সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে কি কিছুটা স্বস্তি পাবেন কুণাল কামরা? উত্তরের অপেক্ষায় বিতর্কিত স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান। দেশও।