রাজ্যের মতুয়া ভোট নিয়ে রীতিমতো ল্যাজেগোবরে অবস্থা বিজেপির। গত এক দশকে মতুয়াগড়ে যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল গেরুয়া বাহিনী, নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির চোরাবালিতে আটকে এখন সেই সাম্রাজ্যে চওড়া ফাটল দেখা দিয়েছে। বিস্ময়ের কথা হল, তবু আজও মতুয়া সমাজকে আশার ছলনায় ভুলিয়ে রাখতে চাইছে পদ্মশিবির। এই নিয়ে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ নেই যে, মতুয়ারা নাগরিকত্বের শংসাপত্র হাতে পেলেও চলতি বিধানসভা নির্বাচনে এই সম্প্রদায়ের কয়েক লক্ষ মানুষ ভোট দিতে পারবেন না। মূলত বাংলাদেশ থেকে বাংলায় আগত মতুয়া সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা আড়াই থেকে পৌনে তিন কোটি। ভোটার ১ কোটি ৮০ লক্ষের আশপাশে। রাজনীতির কারবারিদের মতে, উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদীয়া সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১০০টি বিধানসভা আসনে মতুয়াদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি আসনে মতুয়া ভোটই সংখ্যাগরিষ্ঠ। একটা সময় পর্যন্ত এই মতুয়াগড় ছিল তৃণমূলের নির্ভরযোগ্য ভোট ব্যাংক। কিন্তু মূলত ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার গাজর ঝুলিয়ে সেখানে গত এক দশকে রাজ্যের শাসক দলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে বিজেপি। মতুয়া ভোট নিয়ে এবারও তাই লড়াই তীব্র, টানাটানি তুঙ্গে।
কিন্তু আবারও একটি ভোট সামনে চলে এলেও মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়ার দেখা নেই! নরেন্দ্র মোদির সরকার দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ২০১৯ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ এনেছিল। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মতো মুসলিম রাষ্ট্র থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা উৎপীড়নের কারণে এদেশে আশ্রয় নিলে তাদের নাগরিকত্ব দেবে ভারত। তারপর থেকে ভোট এলেই এই ‘শরণার্থী’ হিন্দুদের সামনে নাগরিকত্বের আশ্বাস ঝুলিয়ে কাজ হাসিল করতে চেয়েছে বিজেপি। কিন্তু এবার ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনে মতুয়া ভোটারদের একটা বড়ো অংশের নাম কাটা গিয়েছে। অনেকের নাম ওঠেনি তথ্যগত অসংগতির কারণে। এই দুইয়ে মিলিয়ে সংখ্যাটা কয়েক লক্ষ। এসআইআর-এর দৌলতে এমনও দেখা যাচ্ছে যে, ২০২১-এর ভোটে কোথাও কোথাও বিজেপির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি এসআইআর-এ ‘বিবেচনাধীন’-এর সংখ্যা। এমন পরিস্থিতি যে তৈরি হবে, তা মোটামুটি জানাই ছিল। তবু এতদিন বিজেপি নেতারা তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এখন অবশ্য ঢোঁক গিলছেন!
তা বলে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেমে নেই। গত কয়েক বছরে এই নিয়ে অগ্রগতি সামান্য হলেও এবার গুরুত্ব বোঝাতে মাত্র বারো দিনে চারটি কমিটি গঠন করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। তড়িঘড়ি নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্যই এই অতি তৎপরতা। মতুয়া সমাজকে ‘পাশে থাকার’ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু এই লোকদেখানো অতিসক্রিয়তা নিয়ে মতুয়া সমাজের মধ্যে থেকেই একাধিক সংগত প্রশ্ন উঠেছে। এক, শোনা যাচ্ছে, এখনও পর্যন্ত নাকি নাগরিকত্ব পেতে ৯০ হাজার আবেদনপত্র জমা পড়েছে। এর মধ্যে মাত্র কয়েকশো জন শংসাপত্র পেয়েছেন। প্রতিটি আবেদনপত্রের খুঁটিনাটি পরীক্ষা করে বাকিদের শংসাপত্র দিতে কত সময় লাগতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। দুই, বহু সংখ্যক মতুয়া ভোটার আছেন, যাঁরা এখনও নাগরিকত্বের জন্য আবেদনই করেননি। এঁরা আবেদনকারীদের পরিণতিটা দেখে নিতে চান। কারণ আবেদন করার অর্থ হল, নিজেকে ‘বিদেশি’ বলে ঘোষণা করে দেওয়া। এর ফলে কোনো কারণে নাগরিকত্বের শংসাপত্র না পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে বলে ধারণা অনেকেরই। তিন, ধরা যাক, চারটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় প্রতিটি আবেদনপত্র খতিয়ে দেখে শংসাপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করল। কিন্তু যাঁদের নাম এসআইআর-এ বাদ গিয়েছে অথবা বিচারাধীন অর্থাৎ বিবেচনাধীন রয়েছে—তাঁরা সেই শংসাপত্র দেখিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলার সুযোগ পাবেন কি? মনে হয় পাবেন না। কারণ শংসাপত্র থাকা মানে ভোটার হওয়া নয়। অর্থাৎ বৈধ হয়েও তাঁরা গণতান্ত্রিক অধিকার অর্থাৎ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। অমিত শাহ বাহিনীকেই এর খেসারত দিতে হবে। অতএব মতুয়াগড়ে এসআইআর বিজেপির কাছে ব্যুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই মতুয়াগড়ে এবার বেজায় অস্বস্তিতে পদ্মশিবির।