বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার বছরে ভারতের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ৪ হাজার ৫১০ কোটি মার্কিন ডলারের। বিজেপির দাবি, ‘মোদি ম্যাজিকে’ সেই অঙ্ক গত অর্থবর্ষ, অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালে পৌঁছেছে ৯ হাজার ৪৫২ কোটি মার্কিন ডলারে। এর পক্ষে প্রচার কী? দেশের শিল্প-অনুকূল পরিস্থিতির জন্যই নাকি বিগত ১২ বছরে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চিত্রটা কি সত্যিই তাই? বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু এর উলটো কথা বলছে। বাণিজ্য মন্ত্রকেরই দেওয়া পরিসংখ্যান বিচার করে দেখা যাচ্ছে, প্রচারের সঙ্গে মূল সমীকরণের মিলই নেই। অর্থনীতিতে গ্রস এবং নেট বলে দু’টি কথা আছে। গোটা প্রচারটাই হচ্ছে ‘গ্রস ইনফ্লো’ ঘিরে। অর্থাৎ, কতটা বিদেশি লগ্নি ভারতে ঢুকছে। বেমালুম চেপে যাওয়া হচ্ছে ‘বেরিয়ে যাওয়া’ অর্থের অঙ্কটা। আসা এবং যাওয়া যোগ-বিয়োগ করলে ভারতে যেটা পড়ে থাকছে, সেটাই বিনিয়োগের ‘নেট ইনফ্লো’। হিসাব বলছে, গত পাঁচ বছরে এই ‘নেট’ প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ঠেকেছে তলানিতে। ২০২০-২১ অর্থবর্ষের ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নেট এফডিআই ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে নেমে এসেছে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারে। কীভাবে?
নজর দেওয়া যাক বাণিজ্য মন্ত্রকের তথ্যে। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে এদেশে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (গ্রস এফডিআই) এসেছিল প্রায় ৭ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাংক সহ আন্তর্জাতিক স্তরে এই পরিসংখ্যান গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের বক্তব্য, ওই হিসাব থেকে বাদ দিতে হয় দু’টি বিষয়। এক, ভারতে আগে থেকে আসা বিদেশি লগ্নির কতটা ফিরে গিয়েছে। এবং দুই, এদেশের ব্যবসা থেকে পাওয়া লাভের অর্থের কত পরিমাণ নিজেদের দেশে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থা। এই দু’টি ক্ষেত্র বাদ দিলে ভারতে ২০২০-২১ অর্থবর্ষে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের অঙ্ক দাঁড়িয়েছিল ৫ হাজার ৪৯০ কোটি মার্কিন ডলারে। মোদ্দা কথা, কেন্দ্রীয় সরকার ওই আর্থিক বছরে যে ৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের গ্রস বিদেশি লগ্নি আসার হিসাব সামনে এনেছিল, বাস্তবে তা মাত্র সাড়ে ৫০০ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষেই তা নেমে এসেছে ২ হাজার ৯১০ কোটি ডলারে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকার যেখানে এফডিআই নিয়ে সাফল্যের ঢাক পেটাচ্ছে, বাস্তব ঠিক তার উলটো। তারই প্রমাণ মিলছে বাণিজ্য মন্ত্রকের রিপোর্টে। তারাই বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে (এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর) সেই বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ২ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের। এ তো গেল লগ্নি আসার হিসাব। ভারত থেকেও প্রতি বছর দেশীয় সংস্থা বিদেশের মাটিতে বিনিয়োগ করে। অর্থাৎ এদেশের মূলধন পাড়ি দেয় ভিন দেশে। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে সেই অঙ্ক ছিল প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের। ২০২৪-২৫ সালে তা বাড়তে বাড়তে ২ হাজার ৮২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, যে দেশীয় বিনিয়োগ ভারতের মাটিতেই ধরে রাখার দায় ছিল সরকারের, সেই কর্তব্য পালন হয়নি। সেই কারণে ‘মোদি ম্যাজিকে’ রাস্তা হারিয়ে সীমানা টপকেছে দেশীয় লগ্নি। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে (এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর) ভারত থেকে বিদেশে পাড়ি দেওয়া লগ্নির অঙ্ক ছিল ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।
কেন্দ্রের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে সাফ দেখা যাচ্ছে, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে এদেশে নেট এফডিআই ছিল ৪ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের (৪৪ বিলিয়ন)। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সেটাই ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে (১ বিলিয়ন) নেমে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই অঙ্ক ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ নেট এফডিআই যে তলানিতে এসে ঠেকেছে, সেটা বুঝতে গণিতজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে কেন এই হাড়ির হাল? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ যে বাড়ছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যেসব সংস্থা আগে থেকেই এখানে লগ্নি করে রেখেছিল, তাদের অনেকেই সেই বিনিয়োগ গুটিয়ে নিয়েছে বা নিচ্ছে। পাশাপাশি যে ভারতীয় সংস্থাগুলি এদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা ভাবছিল, তাদের অনেকেই বিদেশের মাটিতে লগ্নি করাকেই বেশি সুবিধাজনক বলে মনে করছে। অর্থাৎ সরকার কোনোভাবেই তাদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তার একটা বড়ো কারণ অবশ্যই ডলারের বিনিময়মূল্য লাফিয়ে বাড়তে থাকা। ফলে শিল্পক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার যে ডাক নরেন্দ্র মোদি দিয়েছেন, তা দেশীয় শিল্পপতিদের কাছেই খুব একটা দাগ কাটতে পারেনি। নিট এফডিআইয়ের হিসাব তার প্রমাণই দাখিল করছে।