Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ফ্লপ শো

ফ্লপ শো
  • ৩১ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তাঁর প্রায় বারো বছরের রাজত্বে গোটা দেশে সরকারি চাকরি তলানিতে ঠেকেছে। নিজের জমানায় বেকার ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো কাজ দিতে পারছিলেন না বলে কৌশল বদলে প্রথমে ব্যবসা করার পরামর্শ দিতে শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই উৎসাহ প্রকল্পে তাঁর সরকারের পাশে থাকার বার্তা দিতে ২০১৬ সালে ঘোষণা করেন ‘স্টার্ট আপ ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি। সোজা কথায়, কেউ ব্যবসা করতে চাইলে সরকার পুঁজির বন্দোবস্ত করতে ঋণ দেবে। এ জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিলও গঠন করা হয়। তারপর দশ বছরে এই প্রকল্পে নথিভুক্ত স্টার্ট আপ-এর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লক্ষের কিছু বেশি, যা গোটা দেশের নিরিখে খুবই কম। এখানেই শেষ নয়। এই সময়ে প্রায় ৭ হাজার স্টার্ট আপ সংস্থা বন্ধও হয়ে গিয়েছে। তালিকায় তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত ৮৭৫টি, শিক্ষা সংক্রান্ত ৪৯১টি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত ১৫৬টি, কৃষি সংক্রান্ত ৩০১টি স্টার্ট আপ রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, অ্যানিমেশন, স্থাপত্য, কম্পিউটার, নির্মাণ, ফ্যাশন, রোবোটিক, প্রযুক্তি, পরিবহণ সহ ৫৫ ধরনের স্টার্ট আপ-এর অধিকাংশে তালা পড়েছে। সরকারের দাবি ছিল, মোট স্টার্ট আপ-এর ৪৮ শতাংশ মহিলা পরিচালিত অথবা অংশীদারিত্বে রয়েছে। স্টার্ট আপ-এ নাকি মহিলাদের ক্ষমতায়নের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। অথচ মহিলাদের প্রায় ৩ হাজার স্টার্ট আপ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সামগ্রিকভাবেও মোদি জমানায় মহিলা মালিকানাধীন ব্যবসা কমেছে ৬৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে অন্তত একজন মহিলা মালিক পরিচালিত ব্যবসার সংখ্যা ছিল ১০.৫৮ শতাংশ। ২০২২-এ তা নেমে হয়েছে ৩.৮৮ শতাংশ। বড়ো সংস্থা পরিচালনায় মহিলাদের অংশগ্রহণ কমেছে ২৩ শতাংশ। 

Advertisement

দশ বছরে ‘স্টার্ট আপ’ মিশন মোটামুটি ‘ফ্লপ’ করায় ২০২৪-এ মোদি সরকারের দ্বিতীয় জুমলা ছিল ইন্টার্নশিপ প্রকল্প। কী হল তাতে? বলা হল, পাঁচ বছরে দেশের ৫০০টি কোম্পানি ১ কোটি বেকারকে ইন্টার্নশিপ দেবে। গড়ে বছরে ২০ লক্ষ। এক বছরের ইন্টার্নশিপ বা প্রশিক্ষণ শেষে সেই কোম্পানিতেই মিলবে স্থায়ী চাকরি। এ হল মোদির ‘গ্যারান্টি’। কিন্তু কোথায় কী? কেন্দ্রীয় কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক জানিয়েছে, প্রথম দফায় ৮২ হাজার ইন্টার্নশিপের বিজ্ঞাপন দেওয়া হলেও শেষপর্যন্ত এক বছরের প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ করেন মাত্র ৮ হাজার ৭০০ জন। এদের মধ্যে ১৭টি কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন মাত্র ৯৫ জন! দ্বিতীয় দফাতেও প্রশিক্ষণ নেন হাজার পাঁচেক বেকার। কিন্তু এই দফায় কত জনের চাকরি হয়েছে বা আদৌ কারও হয়েছে কি না— তা স্পষ্ট নয়। আসলে এ ক্ষেত্রেও ছবিটা আশাব্যঞ্জক নয়। 
প্রশ্ন উঠতে পারে, যে কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান করতে মোদিজির এত মাথাব্যথা, নানা প্রকল্প—বর্তমানে তার হাল কী? সরকারি তথ্য বলছে, এই মুহূর্তে ভারতে ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৫ শতাংশ। অঙ্কের হিসাবে যা কয়েক কোটি। শহরাঞ্চলে বেকারত্বের হার বেশি। উলটো দিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে কর্মী সংখ্যা ছিল ১৭.৩ লক্ষ। ২০২২-এ তা কমে হয়েছে ১৪.৬৬ লক্ষ। আবার কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও দপ্তরে ২০১৪-১৫ সালে মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা ছিল ৪০ লক্ষের কিছু বেশি। এখন শূন্যপদের সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ। প্রতি চারটি পদে একটি খালি! কর্মসংস্থানের আরেক বড়ো প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্র ছিল ক্ষুদ্র-ছোটো-মাঝারি শিল্প, সংক্ষেপে এমএসএমই। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৬ বছরে দেশে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার এমএসএমই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার সংস্থা ব্যবসার জন্য নাম নথিভুক্ত করেও কাজ শুরু করেনি। ফলে সব মিলিয়ে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজারের কাছাকাছি। এই বিপুল সংখ্যক সংস্থা বন্ধ হওয়ায় কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৮ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী। দেখা যাচ্ছে, শিল্প বন্ধের অর্ধেক হয়েছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে। নিজের সরকারের এই ব্যর্থতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির মুখে কোনও কথা নেই! যাঁর রক্তে নাকি ‘বিজনেস’ রয়েছে তাঁর আমলেই একের পর এক স্টার্ট আপ-এমএসএমই বন্ধ হয়েছে। ফলে মোদির দেওয়া ‘নিজের পথ নিজে খুঁজে’ নেওয়ার কৌশলটিও ব্যর্থ হতে বসেছে। ধস নেমেছে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পে। কর্মসংস্থানের ব্যাপারে তাঁর প্রচারের ফানুস ফুটো হয়ে গেলেও তিনিই আবার অভিযোগের আঙুল তুলছেন অন্যের দিকে! ভোটমুখী বাংলায় এসে কর্মসংস্থানের অভাব, বেকারত্ব ইত্যাদি নিয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্যের খামতি নেই। কিন্তু গোটা দেশের ছবিটা যে বেশ করুণ তা কি আড়াল করা যাবে ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’ প্রচারে? তিনি কি ভুলে যাচ্ছেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ