নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: প্রথমে গোটা রাত, তারপর দিনভর বৃষ্টি। আর মঙ্গলবার সকাল হতেই শুরু নাগরিক দুর্ভোগ। অফিস যেতে, বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দিতে কালঘাম ছুটেছে গোটা শহরের। দক্ষিণ থেকে উত্তর, কলকাতা ও শহরতলি জলে থইথই। একাধিক রাস্তায় কোথাও গোড়ালি সমান, কোথাও হাঁটুর উপরে জল। রাস্তায় বাস, অটো, ট্যাক্সির সংখ্যা হাতেগোনা। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর যাত্রীবাহী পরিবহণ মিলেছে বটে তবে জমা জল ঠেলে এগতে গতি ছিল অতিমাত্রায় শ্লথ। স্কুল থেকে অফিস-কারখানা সকলেরই পৌঁছতে ‘লেট’ হল।
অফিসে না হয় যা হোক করে গিয়েছেন বড়রা। কিন্তু বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যেতে কার্যত কালঘাম ছুটেছে অভিভাবকদের। গলিগুলিতে হাঁটু সমান জল। ফলে বাড়ি থেকে বেরনোর পর শিশুদের স্কুল বাসে তুলতে মাথার ঘাম পায়ে অভিভাবকদের। স্কুল পোশাক বাঁচাতে শিশুকে কোলে নিয়ে জল ঠেঙিয়ে পেরতে হয়েছে পথ। বড় রাস্তায় জল থাকার কারণে স্কুলে গাড়ির গতি কম। ফলে পৌঁছতে দেরি হয়েছে প্রায় সব পড়ুয়ার। দক্ষিণ কলকাতার বাঘাযতীনের বাসিন্দা সুচন্দ্রা ঘোষ বললেন, ‘মেয়েকে স্কুল বাসে তুলতে গিয়ে জল ডিঙিয়েই যেতে হল। ওকে কোলে তুলে নিয়ে গেলাম। সক্কাল সক্কাল বাড়ি থেকে বেরিয়েই এমন নোংরা জল ডিঙিয়ে যেতে ইচ্ছে করে কারও? কি মুশকিল বলুন তো?’ এদিকে স্কুল শুরু শুধু নয়, ছুটির পরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। দুপুরের দিকে বৃষ্টির মুখেও পড়তে হয়েছে। এমজি রোড, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে জল জমার কারণে দিনভরই ছিল ব্যাপক যানজট। জ্যামে দীর্ঘক্ষণ আটকে পড়তে দেখা যায় স্কুল পড়ুয়াদের। বৃষ্টির ফলে আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত শীতল হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যেও ঠায় দাঁড়িয়ে অনেকের কপালে দেখা দিয়েছে ঘাম।
গড়িয়া থেকে রিপন স্ট্রিট যাচ্ছিলেন বেসরকারি সংস্থার কর্মী দেবাশিস সরকার। ২১৮ নম্বর বাসে ওঠার কথা। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানোর পর এল বাস। কিন্তু ততক্ষণে যা দেরি হওয়ার হয়ে গিয়েছে। নামার পর বললেন, ‘আজকে অফিসে অনেক লেট হয়ে গেল। বাস তো দেখি চলেই না। যাদবপুর এইট বি’তে দেখলাম, রাস্তার একপাশে ভালোই জল দাঁড়িয়েছে।’ বাচ্চাকে বাসে তুলতে জল ডিঙিয়েই আসতে হয়েছে সাঁফুইপাড়া, যোধপুর পার্ক, গল্ফগ্রিন এলাকার বাসিন্দাদের। মঙ্গলবার সকাল থেকে একনাগাড়ে বৃষ্টির জন্য কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় ট্রাফিকের গতি শ্লথ হয়ে যায়। একই ছবি শহরতলির। বারাকপুর, রাজারহাটের চিনারপার্কে জল জমার কারণে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। এয়ারপোর্ট আড়াই নম্বর থেকে এক নম্বর, সামান্য দূরত্ব পৌঁছতে অনেকের এক ঘণ্টা সময় লেগেছে বলে অভিযোগ। কলকাতা পুলিসের অধীনে থাকা এলাকায় ১৯টি রাস্তায় হাঁটু সমান জল জমেছে এদিন। বেশিরভাগ জায়গায় পাম্প করে নামাতে হয়েছে জল। হাঁটু সমান জল জমেছিল ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি, মুক্তারামবাবু স্ট্রিট, আমহার্স্ট স্ট্রিট, ফলপট্টি, কলেজ স্ট্রিট বাটা, কনভেন্ট রোড, দমদম আন্ডারপাস, ঢাকুরিয়া আন্ডারপাস, আরজি কর রোড, বি টি রোডের একাংশ, রাজা মণীন্দ্র রোড, কাশীপুর রোড, তারাশঙ্কর সরণি, সিআইটি রোডের একাংশ, রাধানাথ চৌধুরী রোড, পার্ক সার্কাস ময়দান অঞ্চল, সিজিআর রোড, ডিএইচ রোডের একাংশ, কোল বার্থ রোডের একাংশ, রামনগর মোড় থেকে সিজিআর রোড। ফলে দিনভর দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে মানুষকে।
ভোগান্তি চলেছে একেবারে রাত পর্যন্ত। রাজারহাটে অফিস থেকে বেরিয়ে রাজকুমার ভট্টাচার্য বললেন, ‘চিনার পার্কে হাঁটু জল। খুব ভয়ে ভয়ে বাইক চালাচ্ছিলাম।’ বিকেলের পর বৃষ্টি খানিক কমে। বেশিরভাগ রাস্তা থেকে জল নামতে শুরু করে। ফলে দিনের দুর্ভোগ কিছুটা প্রশমিত হয় সন্ধ্যার পর।