আমাদের এই পৃথিবী সত্যিই এক বিচিত্র জায়গা। এখানে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যার ব্যাখ্যা মেলা কঠিন। তেমনই কিছু জায়গার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করাচ্ছেন কমলিনী চক্রবর্তী।
আমাদের এই পৃথিবী সত্যিই এক বিচিত্র জায়গা। এখানে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যার ব্যাখ্যা মেলা কঠিন। তেমনই কিছু জায়গার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করাচ্ছেন কমলিনী চক্রবর্তী।
পাহাড়ের গা বেয়ে দুরন্ত গতিতে নেমে আসছে জলরাশি। পাহাড়ে ধাক্কা খাচ্ছে জলকণা। ফেনায় সাদা হয়ে উঠছে চারপাশ। আর তারই মাঝে নিঝুম নিস্তরঙ্গ একটা নিভৃত খাঁজ বেছে নিয়ে জ্বলছে আগুনের শিখা। জলের মধ্যে আগুন? তাও আবার হয় নাকি? এমন কথাই ভাবছ তো? কিন্তু গল্প নয়, একশো ভাগ সত্য। এমন জায়গা রয়েছে। হাজার বছর ধরে জলের তোড়ের তোয়াক্কা না করেই মার্কিন শহর নিউ ইয়র্কের পশ্চিম প্রান্তে শেল ক্রিক-এ দেখা মেলে অনন্ত এই অগ্নিশিখার। মোটামুটি আট ইঞ্চি তার দৈর্ঘ্য। অবাক কাণ্ড, জলের বিপুল তোড়ের মাঝেও তা কিন্তু নিভে যায় না। প্রকৃতির লীলা ছাড়া এমন ঘটনার কী-ই বা ব্যাখ্যা
হতে পারে?
কিন্তু এমন ঘটনা ঘটল কেমন করে? ওই অঞ্চলের লোকজনের বহু বছরের বিশ্বাস, পাহাড়ি পাথর থেকে এমন কোনও গ্যাস বেরয়, যা হাজার বছর ধরে এই আগুনকে জ্বালিয়ে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এই যুক্তি বাতিল করে দেন। তাঁদের মতে গ্যাস যদি কিছু থেকেও থাকে তবু তার পক্ষে এত বছর ধরে সমান জোরালো আগুন জ্বলিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া পাহাড়ের গায়ে অনবরত জলের ধারা ওই এলাকাটিকে স্যাঁতস্যাঁতে করে তুলেছে। এমন আবহাওয়ায় কোনও গ্যাসের মাধ্যমে আগুন জ্বলে থাকা কঠিন। তবু আগুন জ্বলছে! আর কী করে জ্বলছে তা কিন্তু এখনও অজানাই রয়ে গিয়েছে। আগুন জ্বলার কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
তবে প্রকৃতির এই আপার্থিব লীলার মাঝেও অঘটন ঘটে। হঠাৎ কোনও দমকা হাওয়ার ঝাপটা লেগে আগুনের শিখা নিভে যায়। কিন্তু তা আবারও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কে জ্বালায়? এখানেও খানিক ধাঁধা ছিল বহুকাল। এও তাঁর অপার করুণা ভেবেই ঈশ্বরকে সাধুবাদ দিতেন এলাকার লোকজন থেকে পর্যটক সকলেই। তবে সম্প্রতি এই রহস্য ফাঁস হয়েছে। পাহাড়ি এই ঝর্ণা দেখতে অনেকে ট্রেক করে পাহাড় বেয়ে নামেন। তাঁরাই কখনও যদি আগুন নেভা অবস্থায় পান, তাহলে জ্বালিয়ে দিয়ে যান। পাহাড়ের নির্দিষ্ট খাঁজে দেশলাই বা লাইটার ধরলেই আগুন দপ করে জ্বলে ওঠে!
কিন্তু আগুনের এই হঠাৎ জ্বলা আবার নিভে যাওয়ার কারণ কী? দমকা হাওয়ায় কেঁপে ওঠে ঝর্ণার জল। গতিপথ বদল করে তা তখন পাহাড়ের অন্দরে কন্দরে হানা বসায়। সেই জলের ঝাপটা যখন আগুনের গায়ে লাগে তখনই তা নিভে যায়। আর এই আগুন জ্বলার রহস্য? তাও নেহাত অসম্ভব নয়, আসলে পাহাড়ি পাথরগুলো একের উপর অন্যটি এমন এলোমেলোভাবে সাজানো যে তারই মাঝে রয়েছে বিভিন্ন ফাঁক। তেমনই একটি ফাঁকে কোনও দাহ্য বায়বীয় পদার্থ রয়েছে নিশ্চয়ই, যার ফলে আগুন জ্বলে। কিন্তু সেটা যে কী এখনও সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেনি। আর সেই কারণেই আজও পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময় হয়েই রয়ে গিয়েছে নিউ ইয়র্কের এই ইটারনাল ফ্লেম ফলস। অর্থাৎ চিরন্তন শিখা জলপ্রপাত।