সোমনাথ বসু, কলকাতা:
সোমনাথ বসু, কলকাতা:
ক্রমশ পিছচ্ছে ভারতীয় ফুটবল। না, শুধু র্যাঙ্কিংয়ে নয়। পরিচালনার ক্ষেত্রেও দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের। বিশৃঙ্খলা এমনই চরমে যে, এবার আসরে নামতে হল বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফাকে। মঙ্গলবার ভোররাতেই ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট কল্যাণ চৌবেকে পত্রবোমা পাঠিয়েছে তারা। দু’পাতার চিঠির ছত্রে ছত্রে রয়েছে ভর্ৎসনা এবং নির্বাসনের হুমকি। বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুসারে সংশোধিত সংবিধান অবিলম্বে তৈরি করতে হবে। এছাড়া ফিফা এবং এএফসি’র নিয়ম অনুযায়ী সংবিধান সংশোধিত হওয়া বাধ্যতামূলক। সবশেষে ফেডারেশনের পরবর্তী সাধারণ সভায় এই সংবিধান অনুমোদন করতে হবে। এই তিনটি কাজই করতে হবে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে। আর যদি তা না হয় তাহলে নির্বাসনের কবলে পড়তে হবে ফেডারেশনকে। সেক্ষেত্রে জাতীয় দলের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে ক্লাব ফুটবলও। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু’তে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না মোহন বাগান ও এফসি গোয়া। পাশাপাশি মেয়েদের এএফসি টুর্নামেন্টেও ইস্ট বেঙ্গলের খেলা নিয়ে দেখা দেবে অনিশ্চয়তা।
সত্যিই, ঘোর অন্ধকারে ভারতীয় ফুটবল। সৌজন্যে বিজেপির কল্যাণ চৌবে এবং তাঁর দলবল। ২০২২ সালে তিনি ফেডারেশনের সভাপতি হওয়ার পর তেমন কোনও কাজই হয়নি। ফিফার পর্যবেক্ষণ, নতুন সংবিধান তৈরির জন্য বিন্দুমাত্র উদ্যোগী হননি ফেডারেশন সভাপতি। এমনকী, নির্বাচন নিয়েও তিনি নিষ্পৃহ। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার বিশ্লেষণ, ‘ভারতীয় ফুটবলে বিপণনের কোনও জায়গা নেই। লিগ হওয়া নিয়েও ঘোর অনিশ্চয়তা। নির্বাচন নিয়ে কোনও পদক্ষেপ নেই। তার ফলে প্রশাসনিক এবং পরিচালনাগত সংকট তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে কী হবে, তা জানে না ক্লাব এবং ফুটবলাররা। আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের সংগঠন ফিফপ্রো চিঠি দিয়ে ফিফাকে জানিয়েছে যে, ভারতে ফুটবলাররা বেকার। লিগ হবে কি না, তা কেউ জানে না।
ভারতে সম্প্রতি যে স্পোর্টস বিল পাশ হয়েছে তা ফিফার অজানা নয়। তাই তাদের নির্দেশ, স্পোটর্স বিল, ফিফা ও এএফসি’র নিয়ম অনুযায়ী নতুন সংবিধান দ্রুত তৈরি করতে হবে। কল্যাণবাবু ভাবতেই পারেন, কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় তিনি কলকাঠি নাড়বেন, তাহলে সে গুড়ে বালি। কারণ, ৩০ অক্টোবরের মধ্যে সংশোধিত সংবিধান পাশ করিয়ে নির্বাচনের দিকে এগনোর ক্ষেত্রে ফিফা, এএফসি এবং স্পোর্টস বিল ছাড়া অন্য কোনও পক্ষের হস্তক্ষেপ নির্বাসনের দিকে ঠেলে দিতে পারে ফেডারেশনকে। এদিন কল্যাণ চৌবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘গোটা বিষয়টি বিচারাধীন। তাই আমার মন্তব্য করা উচিত নয়।’
তথ্যাভিজ্ঞমহলের মতে, ফিফার পত্রবোমায় শিরে সংক্রান্তি কল্যাণ চৌবের। ৩০ অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলে তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে পারবেন না। কারণ, স্পোর্টস বিল অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য একটি টার্ম সম্পূর্ণ করা বাধ্যতামূলক। মনে রাখতে হবে, কল্যাণ তিন বছর ক্ষমতায় রয়েছেন। আর টার্ম চার বছরের। তাই তিনি চাইছেন, নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করতে। গোটা ঘটনাই ফিফার নজরে রয়েছে। তাই তাঁর ক্ষেত্রে আর দীর্ঘসূত্রিতা করা সম্ভব নয়।
আজ সুপ্রিম কোর্টে শুনানি রয়েছে। আইএসএল নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ জানাতে হবে ফেডারেশনকে। প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, ২৪ অক্টোবর শুরু হতে পারে আইএসএল। অস্থায়ীভাবে চুক্তি বাড়িয়ে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ১২.৫ কোটি টাকাও দেবে এফএসডিএল। কিন্তু শুনানির আগে ফিফার চিঠিতে ফেডারেশনের বিপদ বাড়ল।
পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০২২ সালে ফিফা নির্বাসিত করে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনকে। এই শাস্তি তোলার জন্য দ্রুত নির্বাচন করে কমিটি গঠিত হয়েছিল। যার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন এই কল্যাণ চৌবেই। তখনই ঠিক হয়, সংবিধান ঠিক করে নতুন নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই নিয়েই ২০১৭ সাল থেকে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। এদিনের চিঠিতেও তা নিয়ে ফেডারেশনকে বিঁধেছে ফিফা।
ফিফার প্রতি আমি কিছুটা হতাশ। ফেডারেশনে নির্বাচন নিয়ে গড়িমসি চলছে সেটা বহু দিন ধরেই জানত তারা। তাই এই চিঠি আরও আগে দিলে ভারতীয় ফুটবল তিন বছর পিছিয়ে যেত না। বর্তমান কমিটি অকর্মণ্য লোকজনে ভর্তি। ফুটবলের কথা কেউ ভাবে না। আমার মতে অবিলম্বে ফিফার নির্দেশ মেনে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করুক ফেডারেশন।--বাইচুং ভুটিয়া
প্রাক্তন ফুটবলার
আমি বিশ্বাস করি, ভারতীয় ফুটবল বন্ধ হবে না। তবে এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে হবে। এর জন্য প্রফুল প্যাটেলের মতো ব্যক্তির এগিয়ে আসা খুবই প্রয়োজন। এই কঠিন সময়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ফেডারেশনকে অনেকটাই সাহায্য করবে। একইসঙ্গে সবপক্ষকে একত্র হয়ে কাজ করতে হবে। তাহলেই ভারতীয় ফুটবল এগবে বলেই আশা রাখি। --দেবব্রত সরকার
ইস্ট বেঙ্গল শীর্ষকর্তা
সংবিধান অ্যামেন্ডমেন্ট নিয়ে টালবাহানা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ফেডারেশন খুব হালকা ভাবে গোটা বিষয়টা নিয়েছিল। তাই চিঠিটা খুব দরকার ছিল। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানি রয়েছে। সেখানেই এই চিঠির কপি জমা দিয়ে তাড়াতাড়ি রায় দানের আবেদন করতে হবে। পাস হওয়া সংবিধান অনুসারে ফিফার নির্দেশ পালন করে ফুটবলকে সচল করতে হবে।--দেবাশিস দত্ত
মোহন বাগান সভাপতি