মাছে ভাতে
বাংলার প্রায় সব বাড়িতেই পুজোর সময় নানা লোভনীয় রান্না হয়। এবার পুজোয় এমন দুই পদ আমরা হাজির করছি, যা ভাত দিয়ে খাওয়ার জন্য অনবদ্য। মাছপ্রিয় বাঙালির জন্য এই পদ সাজিয়ে দিলেন হোটেল হলিডে ইন-এর শেফ রণজয় বন্দ্যোপাধ্যায়।
কমলা কাতলা
পুজোর সময় অনেকেই নানা এক্সপেরিমেন্টাল রান্না করতে ভালোবাসেন। বাঙালির পরিচিত কাতলা মাছের পদে একটু অন্যরকম স্বাদ আনতে তাই এতে দিন কমলালেবু! কমলার রসের হালকা মিষ্টি-টক স্বাদ আর মশলার সুগন্ধে তৈরি হয় এই অভিনব পদ।
উপকরণ: কাতলা মাছের টুকরো ১ কেজি, তাজা কমলার রস ৪০০ মিলিলিটার, ২টি কমলার খোসার রঙিন অংশ কোরানো, পেঁয়াজ বাটা ২৫০ গ্রাম, আদা বাটা ৫০ গ্রাম, সরষের তেল ১২০ মিলিলিটার, টক দই ১৫০ গ্রাম, হলুদ গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো ও লংকা গুঁড়ো পরিমাণ মতো, গরমমশলা গুঁড়ো ১০ গ্রাম, নুন ও চিনি স্বাদমতো।
প্রণালী: প্রথমে কাতলা মাছের টুকরোগুলিতে নুন ও হলুদ মাখিয়ে সরষের তেলে হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন। ওই তেলেই পেঁয়াজ বাটা দিয়ে ভালো করে কষিয়ে নিন। এরপর আদা বাটা, জিরে গুঁড়ো ও লংকা গুঁড়ো দিয়ে আরও কিছুক্ষণ কষাতে হবে। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে আঁচ কমিয়ে ফেটানো দই মেশান এবং নাড়তে থাকুন, খেয়াল রাখবেন যেন দই ফেটে না যায়। এরপর কমলার রস, স্বাদমতো নুন ও সামান্য চিনি দিয়ে মিশিয়ে নিন। ঝোল ফুটে এলে ভাজা মাছের টুকরোগুলি দিয়ে অল্প আঁচে রান্না করুন। খুব বেশি ফোটানো যাবে না, তাতে মাছ ভেঙে যেতে পারে এবং কমলার স্বাদও বদলে যেতে পারে। মাছ সেদ্ধ হয়ে ঝোল মাখা মাখা হলেই গরমমশলা গুঁড়ো ও কোরানো কমলার খোসা ছড়িয়ে নামিয়ে নিতে হবে। তৈরি সুগন্ধি ও স্বাদে অভিনব কমলা কাতলা।
চিংড়ি মালাইকারি
বাঙালির ভোজে চিংড়ি মালাইকারির কদর বরাবরই আলাদা। নারকেলের দুধের মৃদু মিষ্টি ভাব, সরষের তেলের ঝাঁজ আর গরমমশলার সুগন্ধে বড়ো চিংড়ির এই পদ জমিয়ে দেয় যে কোনো বিশেষ দিনের খাওয়াদাওয়া।
উপকরণ: বড়ো চিংড়ি ১ কেজি, নারকেলের দুধ ১.২ লিটার, পেঁয়াজ বাটা ২৫০ গ্রাম, আদা বাটা ৫০ গ্রাম, সরষের তেল ১২০ মিলিলিটার, হলুদ গুঁড়ো ও লংকা গুঁড়ো পরিমাণ মতো, কাঁচালংকা ১০টি, গরমমশলা গুঁড়ো ১০ গ্রাম, নুন ও চিনি স্বাদমতো।
প্রণালী: প্রথমে চিংড়ি নুন ও হলুদ মাখিয়ে সরষের তেলে হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন। এবার ওই তেলেই পেঁয়াজ বাটা দিয়ে ভালো করে কষিয়ে আদা বাটা, হলুদ গুঁড়ো ও লংকা গুঁড়ো মিশিয়ে নিতে হবে। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে নারকেলের দুধ ঢেলে নুন ও সামান্য চিনি দিয়ে অল্প আঁচে ফুটতে দিন। ঝোল ফুটে এলে ভাজা চিংড়ি দিয়ে কিছুক্ষণ রান্না করুন, যাতে চিংড়ি সেদ্ধ হয় এবং নারকেলের দুধের স্বাদ মিশে যায়। অতিরিক্ত রান্না করলে চিংড়ি শক্ত হয়ে যেতে পারে, তাই খেয়াল রাখবেন এই দিকটি। সবশেষে চেরা কাঁচা লংকা ও গরমমশলা গুঁড়ো ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।
ঐতিহ্যের স্বাদ
বাংলার নিজস্ব কিছু পদ পুজোর সময় জমিয়ে রাঁধা যায় বাড়িতেই। তেমনই দুই পদের রেসিপি দিলেন দ্য অ্যাস্টর কলকাতার শেফ আজাদ আরিফ।
বাংলার কষা মাংস
কষা মাংস ভোজনরসিকদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ। গাঢ় রঙের মশলাদার ঝোল, সরষের তেলের ঝাঁজ আর ধীরে ধীরে কষানো মাংসের স্বাদই এই পদের বৈশিষ্ট্য। সাদা ভাত, চাপাটি কিংবা হাতরুটির সঙ্গে জমে যাবে এই জনপ্রিয় বাঙালি পদ।
উপকরণ: খাসির মাংস ১ কেজি, বড়ো পেঁয়াজ ৪টি কুচি, আদাবাটা ১ টেবিল চামচ, রশুন বাটা ২ টেবিল চামচ, ফেটানো টক দই আধ কাপ, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, কাশ্মীরি লংকা গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, সরষের তেল ৪-৫ টেবিল চামচ, তেজপাতা ২টি, শুকনো লংকা ২টি, এলাচ ৩-৪টি, দারচিনি ১ টুকরো, লবঙ্গ ৪-৫টি, গরমমশলা গুঁড়ো আধ চা চামচ, নুন ও চিনি স্বাদমতো।
প্রণালী: প্রথমে মাংস ধুয়ে জল ঝরিয়ে তাতে সামান্য সরষের তেল, টক দই, অর্ধেক আদা-রশুনবাটা, হলুদ গুঁড়ো ও নুন মাখিয়ে অন্তত ১ ঘণ্টা ঢেকে রাখতে হবে। কড়াইতে সরষের তেল গরম করে সামান্য চিনি দিতে হবে। চিনি হালকা রং ধরলে তেজপাতা, শুকনো লংকা, এলাচ, দারচিনি ও লবঙ্গের ফোড়ন দিতে হবে। এরপর পেঁয়াজকুচি দিয়ে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভেজে বাকি আদা-রশুন বাটা দিয়ে ভালো করে কষাতে হবে। জিরেগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো ও কাশ্মীরি লঙ্কাগুঁড়ো সামান্য জলে গুলে কড়াইতে দিয়ে মশলা থেকে তেল ছাড়া পর্যন্ত কষাতে হবে। এবার ম্যারিনেট করা মাংস দিয়ে মাঝারি আঁচে অনবরত নাড়তে নাড়তে ভালো করে কষাতে হবে, যাতে মাংসের জল শুকিয়ে মশলা মাংসের গায়ে মাখা মাখা হয়ে আসে। এরপর অল্প অল্প করে গরম জল দিয়ে ঢেকে মৃদু আঁচে মাংস নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে। প্রয়োজনে প্রেসার কুকারেও সেদ্ধ করা যায়। মাংস সেদ্ধ হয়ে ঝোল গাঢ় ও মাখামাখা হলে গরমমশলা গুঁড়ো ছড়িয়ে নামিয়ে নিতে হবে। গরম ভাত, চাপাটি বা হাতরুটির সঙ্গে পরিবেশন করুন কষা মাংস।
ভেটকি ট্র্যামফ্যাডো
ঠাকুরবাড়ির রন্ধনশৈলীতে দেশি উপকরণের সঙ্গে নানা স্বাদের মেলবন্ধন ঘটেছিল। সেই ঐতিহ্যবাহী রন্ধনধারা থেকে অনুপ্রাণিত ভেটকি ট্র্যামফ্যাডোয় সরষে, রশুন, কাঁচালংকা ও ভিনিগার যোগ হয়। পোলাও স্বাদ মাছকে দেয় এক অন্য মাত্রা।
উপকরণ: ভেটকি মাছ ৬ টুকরো, সরষে বাটা ২ টেবিল চামচ, রশুন বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচালংকা বাটা ১ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ বেরেস্তা ২ টেবিল চামচ, শুকনো লংকা ২-৩টি, ভিনিগার ১ টেবিল চামচ, চেরা কাঁচালংকা ৩-৪টি, সরষের তেল প্রয়োজন মতো, নুন ও চিনি স্বাদমতো, সামান্য জল।
প্রণালী: প্রথমে ভেটকি মাছের টুকরোগুলি ভালো করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিন। এবার একটি পাত্রে সরষে বাটা, রশুন বাটা, কাঁচালংকা বাটা, নুন, চিনি ও ভিনিগার একসঙ্গে মিশিয়ে মশলার পেস্ট তৈরি করে নিন। এই মশলা মাছের টুকরোগুলিতে ভালো করে মাখিয়ে ৩০ মিনিট ম্যারিনেট করে রাখতে হবে। এরপর কড়াইতে সরষের তেল গরম করে মাছের টুকরোগুলি এপিঠ-ওপিঠ হালকা করে ভেজে তুলে নিতে হবে। ওই তেলেই শুকনো লংকা ফোড়ন দিয়ে মাছ মাখানোর পর পাত্রে অবশিষ্ট মশলা দিয়ে মাঝারি আঁচে ভালো করে কষাতে হবে। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে ভাজা মাছ দিয়ে সামান্য জল মিশিয়ে নিতে হবে। উপর থেকে চেরা কাঁচালংকা ও বেরেস্তা ছড়িয়ে কড়াই ঢেকে অল্প আঁচে প্রায় ৫ মিনিট রান্না করুন। খানিক পর ঝোল মাখামাখা হলে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন ভেটকি ট্র্যামফ্যাডো।



