পিনাকী ধোলে, মহম্মদবাজার: ‘তুমি গরমেন্ট। পাবলিকের কাম করার তুমি এক্তিয়ার। তা বলে পাবলিক বাঁচল কি মরল-ই খবর লিবে নাই?’- চার দশক আগে সৈকত রক্ষিত তাঁর ‘আকরিক’ উপন্যাসে প্রান্তিক জীবনের যে করুণ আখ্যান লিখেছিলেন, সেই সত্য আজও বদলায়নি। বীরভূমের পাথর শিল্পাঞ্চলের মাটিতে দাঁড়ালে আজও বঞ্চনার একই ইতিহাস ডুকরে কাঁদে। তৃণমূল জমানায় পাথর লুটের মহোৎসবে মেতে বেতাজ বাদশা হয়েছেন টুলু মণ্ডল। কোটিপতি হয়েছেন আরও অনেকেই। বর্তমান প্রশাসন এখন সমস্ত ‘লিকেজ’ আটকে মাসে একশো কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের স্বপ্নে মশগুল। কিন্তু, সেই মাটির ভূমিপুত্ররা আজও ঘোর অন্ধকারেই। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সম্পদ তাঁদের চোখের সামনে দিয়ে লুট হয়ে যায়। অথচ শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকু তাঁদের মেলে না। ‘পরিবর্তন’ তাঁদের কাছে এখনো অধরা। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, ‘আমাদের খবর কোনো সরকারই রাখে না।’
বীরভূমের পাথর শিল্পাঞ্চলের অন্যতম এপিসেন্টার আদিবাসী অধ্যুষিত দেউচা-পাচামি। জেলা সদর সিউড়ি থেকে রামপুরহাট যাওয়ার পথে ২৫কিলোমিটার দূরে সোঁতশাল মোড়। সেখান থেকে বাঁদিকে গেলেই শুরু ঝাড়খণ্ড সীমান্ত ঘেঁষা বিস্তীর্ণ ‘মৃত্যুপুরী’। স্থানীয়দের আদরের ‘পাহাড়’ আজ যেন এক অভিশপ্ত প্রান্তর। পাথরভাঙা কলের অবিরাম গর্জন, ধুলো আর ব্লাস্টিংয়ের বিষ-ধোঁয়ায় এখানেরআকাশ ধূসর। ডাম্পারের চাকায় পিষ্ট হয়ে পিচরাস্তার কঙ্কালটুকুও কবেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। খটখটে রোদে শ্বাসরোধী ধুলো আর বর্ষায় হাঁটুসমান জলকাদা, এই মরণফাঁদ পেরিয়েই চলে এখানকার মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াত।
জলকাদা মেখে এই রাস্তা পেরিয়েই প্রতিদিন হাটগাছা, তেঁতুলবাঁধি, শোলগড়িয়া, শালডাঙা, ঢোলকাটা সহ আশপাশের এলাকা থেকে শতাধিক পড়ুয়াকে যেতে হয় স্থানীয় গিরিজোড় সাঁওতাল উচ্চ বিদ্যালয়ে। বর্ষায় জুতোজোড়া হাতে নিয়ে, খালি পায়ে আধ ঘণ্টা হাঁটে তারা। প্রতিমা মুর্মু, নমিতা সোরেন, সুরজমণি হেমব্রমদের সরকার ‘সবুজ সাথী’র সাইকেল দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু, তা ঘরের কোণেই ধুলো খায়। কেন? একরাশ অভিমান নিয়ে সুরজমণিরা বলে, ‘পাথরবোঝাই বড়ো বড়ো ডাম্পার অনবরত ছোটে। প্যাডেলে পা রাখতেই বুক কেঁপে ওঠে।’
খুন্তিপাড়া প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক সনাতন চুনারি বলেন, স্কুল পর্যন্ত বাইক নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এক কিলোমিটার দূরে বাইক রেখে কাদাভাঙা মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হয়। আমরাই কাদায় আছাড় খাই। তো ছোটোরা কীভাবে আসবে কেউ ভেবেছে?’ একই আতঙ্কে দিন কাটান হাবড়াপাহাড়ীর প্রবীণ ধরমদাস পত্রধর। তাঁর কথায়, ‘দু’ধারে বিশাল খাদান। মাঝে রাস্তা দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা ছুটছে ডাম্পার। বাচ্চাদের একা ছাড়তে ভয় লাগে।’ ফলস্বরূপ, আতঙ্কের কাছে রোজ বলি হচ্ছে শৈশব, লাফিয়ে বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা।
এই সীমাহীন বঞ্চনার কথা উঠতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন আদিবাসী নেতা জগন্নাথ টুডু, লক্ষ্মীরাম বাসকিরা। তাঁদের সোজা কথা, ‘সবার নজর এখান থেকে সম্পদ চুষে নেবার দিকে। মন্ত্রী-নেতারা যদি এই রাস্তায় রোজ যাতায়াত করতেন তবেই বুঝতেন ভোগান্তি কাকে বলে!’ প্রশাসনের এক কর্তার আশ্বাস, ‘বিষয়টি ভেবে দেখা হবে।’
এতকিছুর পরেও এলাকায় কোনো সংগঠিত প্রতিবাদ নেই। প্রতিবাদী কণ্ঠরোধ করতে গাঁয়ের মোড়লদের হাতে নিয়মিত গুঁজে দেওয়া হয় মাসোহারা। চরম দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে এই সামান্য কিছু টাকার বিনিময়েই রোজ নিঃশব্দে নষ্ট হচ্ছে একটা আস্ত প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। ক্রমশ দীর্ঘ হতে থাকে শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস। (চলবে)