শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: কালো কোট। বুকে টিটিইর ব্যাজ। হাওড়া স্টেশনে চলছিল টিকিট চেকিং। রেলওয়ে অথরিটির সন্দেহ হওয়ায় তাকে প্রশ্ন করতেই বেরিয়ে এলো আসল কাহিনী। জানা গেল টিটিইর পোশাক পরে থাকা ব্যক্তি রেলের কর্মীই নয়। ভুয়ো টিটি হিসেবে কাজ চালাচ্ছিল। রনিতরাজ সাউ নামে ওই জাল টিকিট পরীক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে হাওড়া রেল পুলিস। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই বেরিয়ে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যাচ্ছে রাজ্যের বিভিন্ন স্টেশনে ঘুরে বেড়াচ্ছে এরকম অজস্র জাল টিটিই।
রেল পুলিস তদন্তে নেমে জেনেছে, বেহালার বীরেন রায় রোডের বাসিন্দা রণিত একটি বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট পড়ুয়া। পাশাপাশি ভালো ক্রিকেট খেলে। পড়াশুনোর সঙ্গে সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। ক্রিকেট মাঠে তার সঙ্গে আলাপ হয় এক ব্যক্তির। কথায় কথায় ওই ব্যক্তি জানায়, খেলোয়াড় কোটায় রেলের বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগ চলছে। বিশেষত টিটিই পদে খেলোয়াড়দের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসাররা তাকে বলেছেন, ভালো ক্রিকেটার খুঁজে বের করতে। রণিতের খেলা পছন্দ হয়েছে বলে সে জানায়। তার নাম প্রস্তাব করলেই চাকরি হয়ে যাবে। রেলে চাকরির আশায় রণিত জানতে চায় কী করতে হবে? তদন্তকারীদের ধৃত জানিয়েছে, তাকে বলা হয় এরজন্য পাঁচ লক্ষ টাকা দিতে হবে। তাহলেই স্পোর্টস কোটায় চাকরি হয়ে যাবে। কোনও ইন্টারভিউ দিতে হবে না। সরাসরি নিয়োগপত্র মিলবে। এই প্রস্তাবে রাজি হলে, তার কাছ থেকে দাবিমতো টাকা নেয় প্রতারক চক্রের পাণ্ডা। এরপরই জাল নিয়োগপত্র দেওয়া হয় ওই ম্যানেজমেন্ট পড়ুয়াকে। তাকে বলা হয় হাওড়া, শিয়ালদহ, খড়্গপুর ও আসানসোলে টিকিট পরীক্ষা করবে। একজন ফোন করে তাকে ডিউটি দিত। সেইমতো সে হাজির হতো নির্দিষ্ট স্টেশনে। শনিবার তাকে হাওড়া স্টেশনে ডিউটি দেওয়া হয়েছিল। এই সময়ই সে ধরা পড়ে। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে পাঁচটি আইডি কার্ড ও টিটিই দের কালো পোশাক। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে চারটি স্টেশনে নিয়মিত ডিউটি করত। মাস দুয়েক ধরে সে এই কাজ করছিল।
রেল পুলিস তদন্তে নেমে জেনেছে, এর পিছনে একটি চক্র রয়েছে। যারা বেকার যুবকদের রেলে বিভিন্ন পদে চাকরি দেবার নাম করে প্রতারণা করে বেড়াচ্ছে। খেলোয়াড় কোটায় নিয়োগকে হাতিয়ার করেছে তারা। রণিত তদন্তকারীদের জানিয়েছে, চাকরি দেওয়ার আগে তার মতো আর অনেকের কাছ থেকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথি নেওয়া হয়েছে। সেখানেই বেতন বাবদ প্রতি মাসে টাকা জমা পড়ছে। তার মতো আরও অনেকেই এই প্রতারকদের ফাঁদে পড়েছে। সকলের কাছ থেকে পাঁচ থেকে দশ লক্ষ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তদন্তকারীদের অনুমান, চক্রে আরও অনেকেই রয়েছে। যারা নিজেদের রেলে কর্মী বা অফিসার বলে পরিচয় দিচ্ছে বলে খবর। তারা অফিস খুলে সেখানে ভুয়ো নিয়োগপত্র তৈরি করছে। তা দেওয়া হচ্ছে বেকার যুবকদের। তদন্তে জানা গিয়েছে, বিভিন্ন ভুয়ো নিয়োগপত্র নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন স্টেশনে টিটিই হিসেবে ডিউটি করছেন অনেকেই। এই সংখ্যাটা কত জানার চেষ্টা করছেন রেল পুলিসের কর্তারা। একসঙ্গে রণিতের মোবাইলের সূত্র ধরে চক্রের পান্ডা সহ বাকিদের পরিচয় জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।