সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: বর্ধমান শহর যেন ভুয়ো ডাক্তারের আঁতুড়ঘর! যতই খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে একের পর এক চিকিৎসা পরিষেবার কলঙ্কিত অধ্যায়!
সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: বর্ধমান শহর যেন ভুয়ো ডাক্তারের আঁতুড়ঘর! যতই খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে একের পর এক চিকিৎসা পরিষেবার কলঙ্কিত অধ্যায়!
এবার আর লম্বা ডিগ্রিধারী এমবিবিএস, এমএস, এমডি নন—ভুয়ো চিকিৎসদের কেউ কেউ রীতিমতো রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত দাবি করে চুটিয়ে প্র্যকটিস করে যাচ্ছেন। এরকমই এক গুণধর চিকিৎসক এস দে সরকার। প্রচার-পোস্টারে তিনি লিখছেন, ‘রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারত বিখ্যাত গ্যাস্ট্রোএন্টোরোলজিস্ট এবং হেপাটোলজিস্ট’। সঙ্গে একাধিক ডিগ্রি—ডিএম, ডিএসসি, ডিলিট, পিএইচডি। অথচ, কোন সালে, কোন কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেছেন, তা জানতে চাইলে আমতা আমতা করে তিনি বলেন, ‘আমি তো এমবিবিএস লিখি না। রিসার্চ করছি।’ আর রাষ্ট্রপতি পুরস্কার কবে পেলেন? তিনি বলেন, ‘এসব লিখি না তো।’ অথচ, পোস্টারে তাঁর ছবির পাশে জ্বলজ্বল করছে—‘রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত’।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, স্বঘোষিত ওই চিকিৎসক বর্ধমান শহরের একাধিক নার্সিংহোমে দাপিয়ে প্র্যাকটিস করছেন। উল্লাসের কাছে একটি নার্সিংহোমেও তিনি দীর্ঘদিনের চিকিৎসক। পেট ও লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে তিনি মঙ্গলকোট, গুসকরা, বীরভূম, এমনকী কলকাতার বিভিন্ন জায়গাতেও রোগী দেখছেন। বিজেপি নেতা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র বলেন, ‘ওই চিকিৎসকের বিজ্ঞাপন দেখে আমি তো হতবাক! ভুয়ো চিকিৎসকও আবার রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার প্রাপ্ত। এঁদের সাহস কোন স্তরে পৌঁছলে এমনটা হতে পারে, তা ভাবলেই শিউরে উঠছি। ওঁর বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যদপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে। এবার যাতে এফআইআর হয়, সেই ব্যবস্থাও করা হবে। বহু রোগীর সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেছেন। তাঁরাও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁরাও প্রতারণার মামলা করবেন।’
বর্ধমানের এক প্রকৃত চিকিৎসকের দাবি, যে সব নার্সিংহোমে উনি রোগী দেখতেন বা দেখছেন সেগুলির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সাধারণ রোগীদের পক্ষে কে আসল আর কে নকল ডাক্তার, চিহ্নিত করা সহজ নয়। কিন্তু যাঁরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা তো ফারাকটা বুঝতে পারবেন। ফলে এটা বলা যেতেই পারে, ওই নার্সিংহোমগুলি সবকিছু জেনেই ভুয়ো ডাক্তারদের প্রশ্রয় দিয়েছে। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছে। সোমবার দুর্গাপুরে এসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শ্বারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘ভুয়ো ডাক্তারদের লম্বা তালিকা। সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউই ছাড়া পাবেন না।’
স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, চিকিৎসার জন্য বর্ধমান শহরের উপর বীরভূম, মুর্শিদাবাদের রোগীরাও নির্ভরশীল। প্রতিদিনই খোশবাগান বা নবাবহাটে রোগীদের ভিড় উপচে পড়ে। নামী চিকিৎসকদের দেখানোর জন্য অপেক্ষা করে থাকেন দীর্ঘক্ষণ। সেই সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছেন ভুয়ো চিকিৎসকরা। দালালরা তাঁদের কাছে রোগী নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখে দিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এখনও কোনও ভুয়ো চিকিৎসক গ্রেপ্তার হয়নি। তাঁরা রমরমিয়ে প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনও অনেকেই প্রতারণা হচ্ছে। আরামবাগ শহরেও এক কম্পাউন্ডার ডাক্তার সেজে আইভিএফের মতো স্পর্শকাতর সেন্টার চালাচ্ছেন। রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এজেন্টদের দৌলতে সেই সেন্টারে মহিলাদের ভিড় উপচে পড়ছে। জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, ১৭ বছরের রেজিস্ট্রেশন যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। ভুয়ো চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে থানায়ও অভিযোগ করা হবে।