Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মেধার সঙ্গে চরম আপস

চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পরিষেবাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলেছে মানবসভ্যতা। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির পিছনে এর অবদান অনস্বীকার্য।

মেধার সঙ্গে চরম আপস
  • ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পরিষেবাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলেছে মানবসভ্যতা। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির পিছনে এর অবদান অনস্বীকার্য। চিকিৎসাশাস্ত্রই একাধিক মহামারির মোকাবিলা করেছে এবং নির্মূল করেছে অসংখ্য প্রাণঘাতী ব্যাধি। তারপরও নিত্যনতুন রোগ, জীবাণু, ফাঙ্গাস, ভাইরাস প্রভৃতির সঙ্গে নিরন্তর লড়াই জারি রয়েছে। সেখানে একমাত্র ভরসা চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পরিষেবা। সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে চিকিৎসা পদ্ধতি। এখানেই ডাক্তারদের মুনশিয়ানার পরীক্ষা দিতে হয়। চিকিৎসায় সেরা সাফল্য পেতে তাঁদেরকে হয়ে উঠতে হয় সময়োপযোগী। প্রকৃত মেধাবী এবং সৎ, সেবাপরায়ণ ব্যক্তিরাই ভালো ডাক্তার হবেন বলে মনে করা হয়। তাই হবু ডাক্তার বাছাইয়ে সার্বিক স্বচ্ছতা সবসময় কাম্য। সমাজ চায়, শুধুমাত্র যোগ্য ছেলেমেয়েরাই ডাক্তারি পড়বেন। এই মহৎ পেশায় অযোগ্যরা যেন কোনোভাবেই অনুপ্রবেশ করতে না-পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে গোড়াতেই।

Advertisement

কিন্তু মেধার যাচাই কি যথাযথভাবে হচ্ছে? এই প্রশ্নটাই বড়ো হয়ে উঠেছে এখন। গতবছর ১৫ থেকে ৩৪ শতাংশের মধ্যে নম্বর পেয়েই নিট ইউজি ‘উত্তীর্ণ’ হয়েছিলেন প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ পরীক্ষার্থী। এমবিবিএসের স্বপ্নের জগতের পাষাণ দ্বার যেন চিচিং ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। ৭২০ নম্বরের সেই পরীক্ষায় অসংরক্ষিত প্রার্থীদের জন্য কাট অফ মার্কস ছিল ১৪৪ বা ২০ শতাংশ। মোদি জমানায় নিটের মতো পরীক্ষার হাল-হকিকত নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন উঠেছিল তখনই। কিন্তু ওটাই ক্লাইম্যাক্স ছিল না। নিট পিজির ফল প্রকাশের পর কাউন্সেলিং শুরু হতেই দেখা যাচ্ছে, পিকচার আভি বাকি হ্যায়! যেখানে পূর্ণমান ৮০০, সেখানে মাত্র ৪ পেয়েই স্পেশালিস্ট ডাক্তার হওয়ার সুযোগ পকেটস্থ করেছেন কিছু পড়ুয়া। ফিজিয়োলজি নিয়ে পড়তে গিয়েছেন মাইনাস (-)১২ পেয়েও। উচ্চশিক্ষায় প্রতিযোগিতা যখন কঠিনতর হচ্ছে, সেখানে মেডিকেলে এই উলটপুরাণ—ভাবা যায়! কঠিনতম পরীক্ষাগুলির একটি হল নিট পিজি। ৮০০ নম্বরের মধ্যে কেঁদেকঁকিয়ে ৪ তোলা পরীক্ষার্থীও হাড়ের ডাক্তার হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন—রোহতকের একটি নামী কলেজে! আজব মেডিকেল শিক্ষার ছবির সামনে যবনিকা পতন এখানেই নয়, সামনে এসেছে আরো গুচ্ছ কীর্তি। যেমন ৮০০-র মধ্যে ৪০ পেয়ে এমডি জেনারেল মেডিসিন পড়ছেন আরেকজন। তামিলনাড়ুর একটি  কলেজে আসন নিশ্চিত করেছেন তিনি। মোদি জমানা সত্যিই, কিছু মানুষের বা পরিবারের ভাগ্য খুলে দিয়েছে একেবারে যেন শত হাতে। মোদিবাবু কথায় কথায় দাবি করেন, তাঁর ‘সুশাসন’ দেশে ‘আচ্ছে দিন’ এনেছে। এই ভাগ্যবানদের কথা ধরলে অবশ্য গেরুয়া শিবিরের দাবি নস্যাৎ করার সুযোগ নেই। ডাক্তারি শিক্ষার্থীদের কাছে যেসব বিষয় সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সেগুলি হল—মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, অর্থো, পেডিয়াট্রিকস প্রভৃতি। আর এখানেই অবাক করেছে মোদি জমানা—এইসব বিষয়ে প্রবেশাধিকার পেতে এখন সর্বনিম্ন নম্বর আর জিরো বা শূন্যও নয়, তার চেয়েও কম পেয়ে মিলছে দুর্লভ সুযোগ। 
স্বভাবতই ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রশ্ন উঠছে, প্রবেশিকাতেই যাঁরা মাইনাসে রয়েছেন, তাঁদের কাছে ভবিষ্যৎ কোন প্রত্যাশা রাখবে? কোন ভরসায় একজন রোগীকে নিয়ে যাওয়া হবে এই কীর্তিমানদের কাছে? প্রার্থী-পরীক্ষার্থীদের একতরফা দোষ দিয়েও অবশ্য লাভ নেই। সবকিছুর নেপথ্যে রয়েছে মোদি সরকারের অর্থনীতিসঞ্জাত শিক্ষানীতি এবং অতিবিতর্কিত একটি নির্দেশ। ১৩ জানুয়ারির ওই নির্দেশবলে নিট পিজিতে ভরতির কাট অফ মার্কস এক ধাক্কায় তলানিতে নেমে এসেছে। অসংরক্ষিত প্রার্থীদের জন্য কাট অফ ছিল ৫০ পার্সেন্টাইল বা ২৭৬ নম্বর। সেটাই কমিয়ে ৭ পার্সেন্টাইল বা ১০৩ নম্বর করা হয়েছে। এসসি, এসটি ও অন্যান্য সংরক্ষিত শ্রেণির জন্য কাট অফ আরো কম—শূন্য (০) পার্সেন্টাইল কিংবা মাইনাস (-) ৪০। যে বিদ্যাচর্চার উপজীব্য হল মানুষের জীবন-মৃত্যু—সেখানে এই ভয়ানক কাণ্ড ভাবা যায়! চিকিৎসকদের সর্বভারতীয় সংগঠনও এনিয়ে সংগত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কেননা, এরপর রয়েছে রাজ্যগুলিতে কাউন্সেলিং। ওই পর্বে আরো বেহাল দশা বেআব্রু হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। এতে যার-পর-নাই অস্বস্তিতে তরুণ চিকিৎসক মহলও। তাদের অনুমান, এর পিছনে সক্রিয় প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ লবি। তাদের ‘দামি’ আসনগুলি ভরাতেই এই কৌশল। এই ‘কারবার’ কি আমাদের ন্যূনতম প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা কোনোভাবে স্বস্তি দিতে পারে? অনেকের মতে, এমবিবিএস আসন সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছে। সম্ভবত তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ‘কোয়ালিফায়েড’ পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ‘ব্যবস্থা’র নামে এই ‘অব্যবস্থা’ আমাদের চিন্তায় রেখেছে বইকি! প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের যুক্তিগ্রাহ্য পন্থার খোঁজ করা জরুরি অবিলম্বে। না-হলে চিকিৎসা পরিষেবায় ভারত আগামী দিনে অথই জলে পড়ে যেতে পারে। তার মূল্য চোকাতে হবে সকলকেই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ