Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

প্রেম দিবসে ঘুরে দেখুন কলকাতা

আজ ভ্যালেন্টাইনস ডে। আজ তাই চিরাচরিত ভ্রমণ ঠিকানা বাদ থাক। বরং তিলোত্তমার কয়েকটা এমন জায়গার সন্ধান দিই যা বিভিন্ন সময় নানা প্রজন্মের কাছে আপন হয়ে উঠেছে।

প্রেম দিবসে ঘুরে দেখুন কলকাতা
  • ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৭:০২
Prefer us on Google

আজ ভ্যালেন্টাইনস ডে। আজ তাই চিরাচরিত ভ্রমণ ঠিকানা বাদ থাক। বরং তিলোত্তমার কয়েকটা এমন জায়গার সন্ধান দিই যা বিভিন্ন সময় নানা প্রজন্মের কাছে আপন হয়ে উঠেছে।
নতুন করে পাব বলে
সকালে উঠে মেজাজটা বেশ ফুরফুরে ষাটোর্ধ্ব অনিমেষের। কর্মস্থল থেকে অবসর নেওয়ার পর হাতে এখন সময়ের অভাব নেই তাঁর। সকালে উঠেই চায়ের জল বসালেন। ইতি তখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। চায়ের জল ফুটতে দিয়ে অনিমেষও যেন ফিরে গেলেন সেই কলেজ জীবনের গোড়ার দিকে। তখনও বাঙালির মনে ভ্যালেন্টাইনস ডে দাগ কেটে বসেনি। বরং চিরাচরিত সরস্বতী পুজোই বাঙালির কাছে ছিল প্রেম নিবেদন, একে অপরের সঙ্গে সময় কাটানোর দিন। তার মধ্যে উপহার আদান প্রদানের গল্প ছিল না। ছিল না ফুল বা কার্ড বিনিময়ের রীতি। অনিমেষ তখন সদ্য কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। ইতির সঙ্গে একটু একটু আলাপ হয়েছে। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল ইতিকে। কিন্তু মনের কথা বলার সাহস হয়নি। ইতি আবার ভীষণ মিশুকে। প্রচুর বন্ধু তার। আড্ডা, হইহই, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ফুচকা— এই নিয়েই মেতে রয়েছে। ক্রমশ অনিমেষের সঙ্গেও ইতির বন্ধুত্ব জমে উঠল। সেবছর কলেজের সরস্বতী পুজোয় যখন ইতিকে কাছে টেনে নিজের মনের কথাটা বলেই ফেলবে ভাবছে অনিমেষ তখনই বাধ সাধল ইতি। বলল, ‘আর তো মাত্র কয়েকটা দিন। ভ্যালেন্টাইনস ডে-তেই বরং প্রোপোজ করিস আমায়।’ অনিমেষের মনে উত্তেজনা তখন দেখে কে। মাঝের ক’টা দিন যেন আকাশে উড়েছিল অনিমেষ। আজ সেসব কথা ভাবতে ভাবতে মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। 
‘সকাল সকাল কী এমন মনে পড়ল যে হাসছ?’ ইতি কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বুঝতে পারেননি ভাবে বিভোর অনিমেষ। বললেন, ‘ভাবছিলাম আজকের দিনটা তোমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। একটু পুরনো স্মৃতি ঘেঁটে দেখলে কেমন হয়?’ 
‘তাহলে তো ব্রেকফাস্ট দিয়েই শুরু করা উচিত। অনেকদিন পুঁটিরামের কচুরি খাওয়া হয় না।’ সায় দিলেন ইতি। কলেজ স্ট্রিটেই ইতি-অনিমেষের কলেজ জীবনের সম্পূর্ণটা কেটেছে। বইপাড়ার আনাচ কানাচে শুধু বইয়ের গন্ধই নয়, জমে রয়েছে তাঁদের বন্ধুত্ব গাঢ় হওয়ার নানা স্মৃতি। সেই নিয়েই কি সারাটা দিন কেটে যাবে? 
সকাল দশটার মধ্যে অনিমেষ আর ইতি পৌঁছে গেলেন পুঁটিরামে। কচুরি, ছোলার ডালের সঙ্গে অনিমেষ নিলেন সাদা দই, আর ইতি চেয়ে বসলেন কুলফি। জমে গেল ব্রেকফাস্ট। তারপর বইপাড়া চত্বরে বিস্তর ঘোরাঘুরি। ফুটপাথের বইয়ের স্টলগুলোয় আর বসে বই দেখার মতো শারীরিক অবস্থা নেই তাঁদের, তবু একটা বাঁধানো বই দেখে থমকে গেলেন অনিমেষ। এমিলি ব্রন্টের লেখা উদারিং হাইটস-এর প্রথম সংস্করণ। উবু হয়ে বসতে না পারলেও ঝুঁকে পড়ে তুলে নিলেন বইটা। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গিয়েছে। উৎসর্গ পত্রের নীচে কালো কালিতে লেখা ‘টু মাই ফার্স্ট লাভ’। ইতিও দেখেছেন লেখাটা। তারপর পার্স খুলে বইয়ের দরদাম শুরু করেছেন দোকানির সঙ্গে। বইটা কিনে প্রৌঢ় স্বামীটির হাতে ধরিয়ে লাজুক হেসে বললেন, বইতেই সব বলা আছে। অনিমেষ আবারও ফিরে গেলেন স্মৃতির সরণি বেয়ে সেই কলেজের প্রথম ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে। দুরুদুরু বক্ষে হাতে একটা রঙিন কাগজে মোড়া বই আর একরাশ আবেগ নিয়ে কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, সামনে ইতি। বইটা বান্ধবীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আলাদা করে আর কার্ড কিনে কিছু লিখলাম না। আমার মনের সব কথা এই বইয়ের নায়কের মুখেই বলা আছে।’ রঙিন কাগজের মোড়ক খুলতেই বেরিয়ে এল সবুজ বাঁধানো মলাটের উদারিং হাইটস। 

Advertisement

তুমি আছ আমি আছি
এদিকে নন্দিনী আর স্বরূপের আজ বিয়ের তারিখ। গত বছরই ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইনস ডে-র পুণ্য লগ্নে চার হাত এক হয়েছিল ওঁদের। দেখাশোনা করে বিয়ে হলেও আলাপ পর্বেই প্রেমটা জমে উঠেছিল স্বরূপ আর নন্দিনীর। সেই সময় মাঝেমধ্যেই অফিস ছুটির পর পার্ক স্ট্রিটে খেতে যেত দু’জনে। নন্দিনীর প্রিয় খাবার কন্টিনেন্টাল। স্বরূপ পছন্দ করেন ইন্ডিয়ান কুইজিন। তাই ট্রিংকা’জ রেস্তরাঁই ছিল তাঁদের প্রিয় ঠেক। সেখানে গেলে নন্দিনীর ফিশ ফ্লোরেন্টাইন আর স্বরূপের মুর্গ তন্দুরি কোর্মা ছিল বাঁধা অর্ডার। শেষ পাতে একটা ব্রাউনি উইথ আইসক্রিম নিয়ে ভাগেযোগে মিষ্টিমুখ। জীবনের সব আনন্দ যেন লুকিয়ে থাকত ভাগ করা ডেজার্টে। প্রথম বিবাহবার্ষিকীও তাই পার্ক স্ট্রিটেই কাটাবে দু’জনে। তবে এবার আর গোনাগুনতি সময়, ঘড়ি কাঁটার ছুট, এসবের ঝামেলা নেই। সারাটা দিন শুধু দু’জনে কূজনে কেটে যাবে। জীবনের প্রথম বিবাহবার্ষিকীটা পালন করার জন্য ছুটি নিয়েছেন স্বরূপ। নন্দিনী বেসরকারি স্কুলের অঙ্কের দিদিমণি। শনিবার তাঁর এমনিই ছুটি। অতএব সারাটা দিন কাজ বিহীন। সকালের চা ব্রেকফাস্ট পর্ব বাড়িতেই মিটিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ইনি উনি দু’জনে। রোদ ঝলমলে দিনে একটু গরম লাগলেও হাওয়াটা মন্দ নয়। বসন্তের ফিল রয়েছে বাতাসে। নন্দিনীদের প্রথম গন্তব্য অক্সফোর্ড বুক স্টোর ও চা বার। অক্সফোর্ডের বইয়ের দোকানে বেশ খানিকক্ষণ বই ঘেঁটে চারটে বই পছন্দ করেছেন নন্দিনী। আর স্বরূপের পছন্দ হয়েছে একটা কালির দোয়াত ও ফাউন্টেন পেন। কেনাকাটা সেরে চা বারে স্যান্ডউইচ আর ফিশফ্রাই নিয়ে বসেছেন দু’জনে। রাস্তার ধারের একটা টেবিল আগে গিয়ে দখল করেছিলেন স্বরূপ। নিজেদের চেনার পালা এখনও পুরোপুরি সম্পূর্ণ হয়নি। গল্পে গল্পে উঠে আসছে একে অপরের পছন্দ অপছন্দ, ভালোলাগা মন্দলাগা, ছোটবেলার উল্লেখযোগ্য স্মৃতি। কোথা দিয়ে যে দু’ঘণ্টা পেরিয়ে গেল কে জানে। ঘড়ির কাঁটা দুটো পেরিয়েছে। দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে অনেকটা। অক্সফোর্ড বুক স্টোরের পাট চুকিয়ে এবার ট্রিংকাজ রেস্তরাঁয় ঢুঁ মারবেন তাঁরা। ম্যানেজার সাহেবের চেনা হাসি আর পরিচিত অর্ডারে সারা হবে লাঞ্চ। তারপরে বিকেলের মুখে পার্ক স্ট্রিটকে টাটা বলে বউকে নিয়ে প্রিন্সেপ ঘাটে যাওয়ার প্ল্যান করেছেন স্বরূপ। নন্দিনীর জন্য ওটাই ওর ভ্যালেন্টাইনস সারপ্রাইস। গঙ্গাবক্ষে নৌকাবিহারের আনন্দ উপভোগ করতে করতে একে অপরকে চেনার বাকিটুকু সেরে ফেলবেন। নন্দিনীর গানের গলাও বেশ সুরেলা। নিভৃতে একটা গান শোনারও অনুরোধ রাখবেন স্বরূপ স্ত্রীয়ের কাছে। 

প্রাণের খেলা
নিউটাউনে একটা বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ে দিশা। প্রিয় বন্ধু অরণ্যর সঙ্গে আজই প্রথম ডেটে বেরবে সে। কলেজ কেটে সারাদিন একসঙ্গে কাটাবে এই প্রথম। এদিকে বাড়িতে এখনও নিজেদের সম্পর্কের কথা জানায়নি কেউই। ফলে কলেজে যাওয়ার নাম করেই বেরিয়েছে বাড়ি থেকে। তাই নিউ টাউনের কাছাকাছি কোথাও থাকতে হবে সারাদিন। সন্ধে ছ’টায় দিশার কারফিউ। তার আগেই গার্লফ্রেন্ডকে বাড়ি পৌঁছে দেবে অরণ্য। ডেটের প্রথম স্টপ ইকোপার্ক। দিগন্ত বিস্তৃত খোলামেলা প্রান্তর ভীষণ পছন্দ অরণ্যর। দিশাও প্রকৃতি ভালোবাসে। ঘরের কাছে প্রকৃতির সন্ধান বলতে আপাতত ইকোপার্কই সম্বল। মাঠে বসে গল্প। ভালো করে পরিচয় করার পর কাছাকাছিই একটু খেতেও যাবে দু’জনে। ওখানে কাফে একান্তে, ধামসা ইত্যাদি নানা রেস্তরাঁ রয়েছে। ধামসার বাঁশপোড়া মাটন তো রীতিমতো হিট। 
ইকোপার্কের প্রসঙ্গ উঠতেই দিশার মন চলে গিয়েছিল পৃথিবীর আশ্চর্যগুলোর কাছে। রিও ডি জেনেইরোর যিশুখ্রিস্টের মূর্তি, প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, চীনের গ্রেট ওয়াল সবই অরণ্যর সঙ্গে দেখবে বলে মনস্থির করেছে দিশা। সেই মতো টিকিটও কেটেছে সে দু’জনের জন্য। তারপর হাতে যদি সময় থাকে তাহলে একবার ওয়াক্স মিউজিয়ামটাও দেখে নেবে। মোটমাট সারাদিনের জমজমাট ভ্যালেন্টাইনস ডে প্ল্যান রেডি। মনে মনে উত্তেজনা নিয়ে কলেজের সামনে দেখা করেছে দু’জন। অধ্যাপকদের তো বটেই এমনকী বন্ধুদেরও চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে আজ।        
কমলিনী চক্রবর্তী
   

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ