নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দশকের পর দশক ধরে কলকাতা তথা বাংলার মানুষ সঞ্চয়ের ব্যাপারে রক্ষণশীল। যাঁরা ইকুইটি বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন, তাঁদের পছন্দ বরাবরই রক্ষণশীল ব্লু-চিপ লগ্নি। এছাড়া ঝুঁকিহীন বিনিয়োগ হিসাবে ডাকঘরের সঞ্চয় প্রকল্পগুলি জনপ্রিয়। তবে এই চেনা ছবিটা গত প্রায় একবছরে আমূল বদলে গিয়েছে। কলকাতার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বাজারের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকছেন, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কলকাতার লায়ন্স রেঞ্জ ও ডালহৌসি পাড়ায় হাজারো ব্রোকারেজ হাউস রয়েছে। তাদের দাবি, কোনো সংস্থা প্রথমবার বাজারে শেয়ার ছাড়লে, (যাকে বলে ইনিশিয়াল পাবলিক অফার বা আইপিও) সেখানে খুচরো বিনিয়োকারীর আবেদনের সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। বাজার মধ্যস্থতাকারীদের মতে, সাম্প্রতিককালে ধারাবাহিক ভাবে ভালো লিস্টিং হচ্ছে বা শেয়ার বাজারে নাম নথিভুক্তি চলছে বহু সংস্থার। এর ফলে ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট থেকে সাধারণ মানুষের টাকা সরে এসে ঢুকছে প্রাইমারি অফারে বা শেয়ার বাজারে।
ভাটিয়া সিকিউরিটিজের কর্ণধার বিকাশ ভাটিয়া বলেন, একসময় কলকাতায় আমাদের সক্রিয় খুচরো বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ প্রাইমারি ইস্যুতে আবেদন করতেন। আজ সেই হার চারগুণ বেড়েছে। গত কয়েক ত্রৈমাসিকে আইপিওতে অংশ নিয়ে ভালো লাভ মিলেছে। তা সাধারণ বিনিয়োগকারীকে বুঝিয়েছে যে, আইপিও শুধু ফাটকা নয়, বিনিয়োগের পোর্টফোলিয়োর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বিকাশ আরও জানান, এখন শেয়ার বাজারে আসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা প্রায় নেই বললেই চলে। পেপারওয়ার্ক বা কাগুজে ঝামেলা ছাড়াই ডিম্যাট খোলা, ৫ মিনিটেরও কম সময়ে এএসবিএ বা ইউপিআই-তে টাকা ব্লক করার সুবিধাগুলি রয়েছে। ফলে ইস্যু বা নতুন শেয়ার বিক্রির কথা ঘোষণা হলেই বিনিয়োগকারীরা তাতে সুষ্ঠুভাবে অংশ নিতে পারেন। তাঁর কথায়, জিও-র মতো বড়ো পাবলিক অফার সামনেই আসছে। তাই তার আসল সুবিধা পাবেন তাঁরাই, যাঁরা আগে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখন রেকর্ড সংখ্যায় ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। এর ফলে সাবস্ক্রিপশন উইন্ডো খুললে, সবাই সেই সুযোগ নিতে ঝাঁপাতে পারবেন। ব্রোকাররা এখন ক্লায়েন্টদের শেয়ারহোল্ডার কোটার সুবিধা নেওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন। ভারতীয় শেয়ার বাজারের নিয়ম অনুযায়ী, যখন কোনো বড়ো কর্পোরেট গ্রুপ তাদের কোনো সাবসিডিয়ারি বা অধীনস্থ সংস্থাকে শেয়ার বাজারে আনে, তখন ইস্যুর একটি নির্দিষ্ট অংশ মূল সংস্থার বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। আসন্ন জিও পাবলিক অফারে এই ধরনের ‘পেরেন্ট’ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সংরক্ষণ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিকাশবাবু বলেন, আমরা গ্রাহকদের পরামর্শ দিচ্ছি, ‘রেকর্ড ডেট’-এর আগেই প্রতিটি পারিবারিক ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে অন্তত একটি করে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার ধরে রাখুন। তাতে তাঁরা রিটেল এবং শেয়ারহোল্ডার দুটি কোটাতেই বৈধভাবে একই সঙ্গে দুবার ‘বিড’ করে অ্যালটমেন্টের সম্ভাবনা বাড়াতে পারেন।
বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ শৈবাল নন্দী বলেন, আগে আমরা প্রাইমারি মার্কেট এড়িয়ে চলতাম, কারণ অ্যালটমেন্ট পাওয়া লটারি জেতার মতো মনে হত। পেরেন্ট শেয়ারহোল্ডার কোটা কীভাবে কাজ করে, তা জানার পর আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে।