নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: বিহারে বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন যে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) করেছে, তা বৈধ। অসাংবিধানিকও নয়। অবাধ এবং সুষ্ঠু ভোটের লক্ষ্যে ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার অধিকার ভারতের নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। কিন্তু এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া মানেই সেই ব্যক্তি বিদেশি বা নাগরিক নন, এই সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। সেই অধিকার কমিশনের নেই। বিহারের এসআইআর মামলায় এমনই রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে শুরু হয় এসআইআর শুনানি। ৪৯ দিন শুনানি শেষে গত ২৯ জানুয়ারি রায় রিজার্ভ রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। বিহার হোক বাংলা, ভোটপর্ব মিটে যাওয়ার পর, এদিন রায় শোনাল দেশের শীর্ষ আদালত।
দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর স্বাক্ষর করা ১২৪ পাতার রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেই ভারতের নাগরিক নয়, তা বলা যাবে না। নাগরিকত্ব বিচারের ক্ষমতা কমিশনের নেই। সেটা খতিয়ে দেখবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতো যোগ্য কর্তৃপক্ষ। ভোটার হতে গেলে প্রাথমিক শর্ত যেহেতু নাগরিক হওয়া, তাই নির্বাচন কমিশন স্রেফ দেখতে পারে, ওই ভোটার নাগরিক কিনা। নাগরিকত্ব দেখা বা কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কমিশন নিতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, যাদের নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় নেই, সেই তালিকা চার সপ্তাহের মধ্যে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। আর ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন মোতাবেকই তা পাঠাতে হবে। তারপর সেই অথরিটি (মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক) রাজ্যে পরবর্তী কোনো নির্বাচনের আগেই বাদ পড়া ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে। লোকসভা, বিধানসভা, পুরসভা, পঞ্চায়েত—যে ভোট আসছে, তার আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাদ পড়া ব্যক্তিরা নাম তোলার জন্য আবেদন করতে পারবেন। উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সরকারকে সন্তুষ্ট করতে পারলে ভোটার তালিকায় তাঁর নাম উঠবে বলেই রায় দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
এদিনের রায় মূলত বিহারের এসআইআর মামলায় হলেও প্রভাব পড়বে গোটা দেশেই। কারণ সুপ্রিম কোর্ট বলে দিয়েছে, এসআরআর বৈধ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের এক ঘোষণা ঘিরে। তারা জানিয়েছে, এসআইআরে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, কিংবা যাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন, তাঁরা সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। এ ব্যাপারে তৃণমূলের লোকসভার সাংসদ সৌগত রায় বলেন, ‘রাজ্য সরকারের এই নির্দেশ অনৈতিক। অমানবিক। সুপ্রিম কোর্টই রায় দিচ্ছে, ভোটার তালিকায় নাম বাদ মানেই তাঁকে বিদেশি বলা যাবে না, সেক্ষেত্রে সরকার কীভাবে নাগরিকের সামাজিক সুরক্ষার অধিকার কেড়ে নিতে পারে?’ তিনি আরও বলেন, ‘বিহার হোক বা বাংলা, তাড়াহুড়ো করে এসআইআরের মাধ্যমে লক্ষাধিক নাম বাদ দিয়ে কমিশন ভোটের আগে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে। ট্রাইবুনালে আবেদনের পর এখন অনেকেই ভোটার বলে গণ্য হচ্ছেন। তাঁরা যদি ভোট দিতে পারতেন, তাহলে ফলাফল ভিন্ন হতেই পারত। পশ্চিমবঙ্গেই তো ৩১ আসনে এসআইআরে বাদ পড়া নামের সংখ্যার চেয়ে জয়ের মার্জিন কম। তাহলে?’
তাঁর সুর ধরেই কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভির মন্তব্য, ‘সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব বিচারের ক্ষমতা কমিশনের নেই। অথচ নাগরিক নয়, এই তকমা দিয়েই তো ভোটার তালিকায় নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে এসআইআরের জন্যই যে এই নাম বাদ, তা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে উল্লেখ করা উচিত ছিল। পশ্চিমবঙ্গে তো ট্রাইবুনালে আবেদনকারীদের ৮০ শতাংশ নাম যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ভোটের আগে এটা হলে রেজাল্ট অন্যরকম হতো।’