নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: তখনও কলকাতায় কাঠাফাটা রোদ। সাহেবরা টুপি, মেমরা বাহারি ছাতা মাথায়, আরও বড়লোক সাহেবরা গ্যালারির ছাউনির নীচে বসে খেলা দেখতেন। নেটিভদের পয়সা দিয়ে টিকিট কেনার ক্ষমতা ছিল না। ফলে তারা উঠত স্টেডিয়ামের পাশে গাছে। ধুতি-পিরান পরে ডালে বসে ক্রিকেট দেখত ইডেনে। স্টেডিয়ামটি তৈরি হয় ১৮৬৪ সালে। কিন্তু তার আগে স্টেডিয়াম তৈরির প্রাক্কালে এই জায়গায় প্রথম ক্রিকেট ম্যচটি খেলা হল ১৮২৫ সালে। সেই অর্থে ইডেনের ক্রিকেট ম্যাচ ঠিক ২০০ বছরে পা দিল। যদিও তার বিশ বছর আগেই কলকাতার কোনও একটি মাঠে একটি ম্যাচ খেলা হয়ে গিয়েছে ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি।
‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ বইতে ইতিহাসবিদ হরিসাধন মুখোপাধ্যায় লিখছেন, ‘প্রাচীন কলকাতার ক্রিকেটের প্রথম প্রচলন হয়, ১৮০৪ খ্রী: ১৯ জানুয়ারী। উক্ত দিবসে কোম্পানীর ইটোনিয়ান সিভিল-সার্জেন্ট ও অন্যান্য ইংরাজদের মধ্যে প্রথম ‘ক্রিকেট ম্যাচ’ হয়। ইহার পূর্ব্বে প্রকাশ্য ভাবে ক্রিকেট-ম্যাচের আর কোন বিবরণ পাওয়া যায় না।’ সেই যে কলকাতা ক্রিকেটে মাতল। ২০০ বছর পথ হেঁটেও তার ক্লান্তি এল না। উল্টে উৎসাহ বেড়েই চলল। বর্তমানে উন্মাদনা আকাশছোঁয়া। ইডেন এখন টগবগ করে ফুটছে আইপিএল ঘিরে। সরকারি আমলা থেকে সাধারণ মানুষ, সকলের মুখেই একটাই প্রশ্ন, ‘একটা টিকিট পাওয়া যাবে?’ আর পুলিস টিকিট ব্ল্যাকারদের গ্যাংয়ের পিছনে ছুটতে ছুটতে পাগল হয়ে যাচ্ছে।
ইংরেজদের দৌলতে কি না কে জানে, কলকাতার রক্তে ফুটবলের সঙ্গে ক্রিকেটটাও পুরোপুরি মিশে আছে। এখন ব্ল্যাকে টিকিট কিনে আইপিএল দেখে কলকাতা। তখন টিকিট না কিনে ঠাঠাপোড়া রোদ মাথায় গাছে উঠে ক্রিকেট দেখত সাধারণ মানুষ। ব্রিটিশরা তখন প্রভুর আসনে। তারা নেটিভদের খেলা দেখাকে কথায় কথায় ব্যঙ্গ করত। আর বলত মাঙ্কিদের মতো কেমন গাছে উঠেছে দেখ, এইসব বলে আমোদ পেত। লালমুখো মেমরা সেসব শুনে মুখটিপে হাসত ফিকফিক করে। সে কলকাতা ব্রিটিশ মুক্তও হল একদিন। আর এখন তো ভারতীয় টিম বলে বলে ইংরেজদের ক্রিকেটে হারায়। তবে এটাও ঠিক, নেটিভরা যাতে খেলা দেখতে পায় সে জন্য ইডেন গার্ডেন্সের একটা দিক খোলা রেখেছিল ব্রিটিশরাই। যাতে গাছে উঠে খেলা দেখতে পারে কালো চামড়ারা। ইতিহাসের গবেষক হরিপদ ভৌমিক বললেন, ‘বিভিন্ন মাঠে বা কলকাতা শহরের বিবিন্ন প্রান্তে ক্রিকেট খেলা তো হতো। স্বামী বিবেকানন্দ নিজে ক্রিকেট খেলতেন। সাধারণ মানুষের জন্য ইডেনের একটা দিক খোলা থাকত। সেখানে গাছে উঠে মানুষ খেলা দেখতেন। সেকালে টিকিট নিয়ে এমন কালোবাজারি ছিল না।’ এর বহু পরে দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেকালে কলকাতা শহরে ক্রিকেট খেলার ক্লাবও ছিল, ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব’। সে ক্লাব কলকাতায় খুঁজলে এখনও দেখা পাওয়া যাবে।
এখন রঙিন আলো, গান-বাজনার সঙ্গে কালোবাজারি মিলেমিশে একাকার। আর ভেদাভেদ সরিয়ে মিলেমিশে গিয়েছে সাদা চামড়া-কালো চামড়া। সাদাদের একলা আধিপত্য অস্তে গিয়েছে। এখন কালোরা বলে বলে সাদাদের আউট করে। সাদা বোলারকে পিটিয়ে ছাতু করে কথায় কথায় সেঞ্চুরি করে।