নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: সেবিকার প্রশিক্ষণ নিতে শিক্ষাঙ্গনে পা রাখলেন পুরুলিয়ার কন্যা। প্রথমবার, হ্যাঁ প্রথমবার। কারণ, বিরহড় জনজাতির কন্যাদের উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হওয়ার ইতিহাসই বিরল। গত বছর সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন গঙ্গা শিকারি। তারপরে পার করলেন দ্বিতীয় গণ্ডি। সম্প্রতি হাওড়া-হুগলির শ্রমজীবী স্বাস্থ্যপ্রকল্পের সরকারি অ্যাসিট্যান্ট হেলথ ওয়ার্কার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছেন গঙ্গা। তাঁর জনজাতির নিরিখে তিনিই প্রথম ওই কাজ করেছেন। তাৎপর্যপূর্ণ এই যে, বিরহড় জনজাতির মধ্যে প্রথম উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি যিনি টপকেছিলেন, তাঁর নাম জানকী শিকারি। সম্পর্কে গঙ্গার আপন দিদি। কিন্তু সেই দিদিও সরকারি নার্সিং কোর্সের বা কলেজের আঙিনায় পা রাখেননি। রাখলেন গঙ্গা। একটি জনজাতির নিরিখে তিনিই এখন ভগীরথ।
এমন বেনজির ছাত্রীকে নিয়ে খুব উৎসাহিত বালির শ্রমজীবী নার্সিং অ্যাকাডেমির কর্তারা। সেবিকার কোর্স থেকে সবেতেই গঙ্গার জন্য ছাড়ের বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন তাঁরা। লাজুক গঙ্গা এমন ভিআইপি ব্যবস্থাপনায় অস্বস্তিতে আছেন। এখনও তাঁর পায়ে সাধারণ চপ্পলই। বাবা প্রয়াত কয়েক বছর আগে। বাড়িতে এখনও অবিবাহিত ছোট বোন, এক ভাইও আছে। সে পড়াশোনা করে ঝাড়খণ্ডে। বিরহড় জনজাতির ভগীরথ জানেন তাঁর দায়িত্ব অনেক। তাই শ্যামলা সরল মুখের পেশি বেশিরভাগ সময়ে কুঁচকেই থাকে। তিনি বলেন, অ্যাকাডেমির কর্তারা আমার জন্য যা করেছেন, তা নিয়ে যত বলব, ততই কম বলা হবে। পুরুলিয়ার আজ অনেক বদল হয়েছে। আমাদের জনজাতিকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আমার নেওয়া উচিত। কতটা পারব, জানি না। ঘরেও অনেক দায়িত্ব। তাই ভাবনা হয়।
শ্রমজীবী স্বাস্থ্যপ্রকল্পের অন্যতম কর্তা গৌতম সরকার বলেন, আমরা ওই সরকারি প্রশিক্ষণের আওতায় আদিবাসীদেরই অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছি। যখন বিরহড়ের কন্যার কথা আমরা জানলাম, তখন বাড়তি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আমাদের এক সহায়ক সংগঠন ওই কাজে সাহায্য করেছে। পশ্চাদপদ ওই জনজাতির মধ্যে গঙ্গাদের পরিবারই পৃথক। ওর জেদকে কুর্নিশ করে আমার ওকে কলেজের সমতুল শিক্ষার আঙ্গিনায় আনতে পেরেছি। আমরা গর্বিত। গৌতমবাবুর কথা শুনে তখন লাজুক হাসিতে মুখ ভরেছে গঙ্গার– যিনি নামেই গঙ্গা, আচরণে ভগীরথ, যিনি পুরুলিয়ার রুক্ষ বুকে এক বিরল জলধারা। -নিজস্ব চিত্র