


অর্পণ সেনগুপ্ত, ধনেখালি: এক সময় দেশ কাঁপাত এখানকার তাঁত। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাণিজ্য চলত বিদেশেও। তবে এখন আর সেই রমরমা নেই। ফ্যাশনের সংজ্ঞা বদল, ভিনরাজ্যের সস্তার সিন্থেটিক শাড়ি অনেকদিন আগে থেকেই দুর্বল করতে শুরু করেছিল হুগলির প্রাচীন জনপদ ধনেখালির তাঁত শিল্পকে। তবে, এখনও যা আছে, সেটাই বাঁচিয়ে রাখা গেলে একটা ইতিহাসের পরিসমাপ্তি রোখা যাবে। অন্তত এমনটাই মনে করছেন এখানকার পুরানো মানুষজন। তাঁতের বুনন আলগা হলেও ক্ষমতার ঠাসবুনোট কোনদিকে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে একবার বুঝে নেওয়া গেল।
বাম আমলে সিপিএম আশ্রিত দুষ্কৃতীদের হাতে খুন হয়েছিলেন অজিত পাত্র। সেকথা মনে করে আজও ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন অজিতবাবুর মেয়ে, ধনেখালির তিনবারের বিধায়ক অসীমা পাত্র। তবে ১৫-২০ বছর আগের শত্রু বদলে গিয়েছে। সিপিএমের বদলে তৃণমূলের শত্রু হিসাবে উঠে এসেছে বিজেপি। ধনেখালিও পালটে গিয়েছে বিলকুল। এক সময় বাড়িতে বাড়িতে চলত তাঁত। দিনভর ভেসে আসত সেই আওয়াজ। বহু খুঁজে ব্রাহ্মণপাড়ার কাছে রায়পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা মিলল সেই তাঁতের। বৃদ্ধ তাঁতি জানালেন, স্রেফ অভ্যাসের বশেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পেশা হিসাবে দেখলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। দশঘড়া-ধনেখালি রোড থেকে হাসপাতাল রোডে নেমে খানিক এগলেই ধনেখালি হাসপাতাল। পাশেই শোমসপুর তাঁতি সমবায়ের অফিস। অনতিদূরে অজস্র শাড়ির দোকান। তবে অভিজ্ঞ লোকজনের বক্তব্য, তাঁতের পরিস্থিতি একেবারেই খারাপ। কারিগর অমিল। বাজার নেই। একসময় দেশে-বিদেশে শাড়ি সাপ্লাই করতেন স্থানীয় তরুণ ভড়। জানালেন, লোকসানের ফলে এখন ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
এলাকায় মল, বিরাট স্টোর প্রভৃতির অভাব নেই। একসময়ের প্রাচীন জনপদ এখন চাকচিক্যময়। ইতিহাস আগলে বসে থাকে দশঘড়ার বিশ্বাস এস্টেট রাজবাড়ি বা গোপীনাথ মন্দির। গত বিধানসভা নির্বাচনের চেয়ে লোকসভায় ধনেখালিতে ভোট বেড়েছে তৃণমূলের। তাতেও আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন না বিধায়ক অসীমা পাত্র। চষে বেড়াচ্ছেন প্রতিটা এলাকা। ধনেখালি হল্ট স্টেশন থেকে শিবাইচণ্ডী রেল স্টেশন, সবজি বাজার— অনেক এলাকা পায়ে হেঁটেও ঘুরেছেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই নেত্রী। এক সময় দলের মধ্যেই যাঁরা বিপক্ষে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেককেই ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন অসীমা। অন্তত এলাকার রাজনৈতিক মহলের তেমনটাই মত। খোদ দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অম্লমধুর সম্পর্ক। তিনি কখনও বকুনি দেন, আবার কখনও স্নেহের প্রশ্রয়ে ভাসিয়ে দেন। বুধবার নালিকুলের জনসভাতেও বারবার অসীমা পাত্রের নাম নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার অভিনেত্রী তথা প্রাক্তন সাংসদ নুসরাত জাহানকে নিয়ে বিরাট রোড শো’র ব্যবস্থা করেছেন অসীমা। আত্মবিশ্বাসী অসীমা বলেন, মানুষ বিজেপিকে চাইছে না, তাই আরও বেশি ভোটে তিনি এবার জিততে চলেছেন।
দলগত পারফরম্যান্স ধরলে অসীমার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির বর্ণালী দাস। গতবার বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির তুষারকুমার মজুমদার ৩০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে হেরেছিলেন অসীমা পাত্রের কাছে। মাস্টার ডিগ্রি করা গৃহবধূ বর্ণালী সক্রিয় রাজনীতিতে এসেছেন আট-ন’বছর আগে। প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, কীভাবে ঘুচবে এই ৩০ হাজারের ব্যবধান? তাঁর সাফ দাবি, মানুষ পরিবর্তন চাইছেন। কৃষকের ভোট পাবে না তৃণমূল। তাঁতের বাজার বাড়াতেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তপসিলি জাতি সংরক্ষিত আসন হলেও এই জনগোষ্ঠীর অনেকেরই পাকা বাড়ি নেই। রাস্তাঘাট এবং জলের সমস্যা রয়েছে বলে তাঁর দাবি। ক্ষমতায় এলে এসবের দিকে নজর দেবেন।
অসীমা অবশ্য ধনেখালি হাসপাতালের উন্নয়ন, বিশেষজ্ঞ ইউনিট ও ব্লাড ব্যাংক চালুর অঙ্গীকার, কৃষকদের সরকারি সহায়তা প্রদান এবং অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের জোরেই বেশ আত্মবিশ্বাসী। গত লোকসভা নির্বাচনে হুগলি সংসদীয় ক্ষেত্রের তিনটি বিধানসভা আসনে পিছিয়ে ছিলেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময় ধনেখালি তৃণমূল প্রার্থীকে বিরাট ব্যবধানে এগিয়ে রাখায় সহজে সংসদে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছিলেন রচনা। সেই সুফল অসীমা পাবেন বলে আশাবাদী।