সন্দীপন বিশ্বাস: আমরা যাকে বলি রথযাত্রা, ওড়িশার লোকেরা তাকেই বলেন গুণ্ডিচা যাত্রা। এই যে যাত্রা, সেই যাত্রা অংশটুকুকে বলে পহুণ্ডী বিজয়। জগন্নাথদেবের রথ পহুণ্ডী বিজয়ে বেরনোর আগে মন্দিরেই জগন্নাথকে ভোগদান করা হয়। মন্দিরে প্রথম যে ভোগ দেওয়া হয়, তাকে বলে সকাল ধূপ। রথযাত্রার দিন জগন্নাথ ব্রেকফাস্টে খিচুড়ি খান। সেই খিচুড়ি খেয়ে তিনি রথে চড়েন। মন্দিরে থাকলে তাঁকে যেসব ভোগ দেওয়া হয়, সেগুলি যাত্রার সময়েও তাঁকে দেওয়া হয়। সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দেখা যাক, পুরীর মন্দিরে সারাদিনে জগন্নাথদেবকে কতবার ভোগ নিবেদন করা হয়।
জগন্নাথদেবের ভোগ মোটামুটি দু’ধরনের হয়। একটিকে বলে কোঠভোগ এবং অপরটিকে বলে ছত্রভোগ। মন্দিরের তহবিল এবং রাজপরিবার থেকে যে ভোগ আসে, তাকে বলে কোঠভোগ এবং বিভিন্ন মঠ বা ভক্তদের প্রদত্ত অর্থ থেকে যে ভোগের ব্যবস্থা করা হয়, তাকে বলে ছত্রভোগ। জগন্নাথদেবের ভোগ রান্না এবং তা মন্দিরে নিয়ে যাওয়ার সময় খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। নাক মুখ ঢেকে সেবকরা এমনভাবে সেই ভোগ মন্দিরে নিয়ে যান, যাতে ভগবানের অন্নগ্রহণের আগে তার ঘ্রাণ ভক্তরা গ্রহণ করতে না পারেন।
জগন্নাথদেব খেতে খুব ভালোবাসেন, যাকে এককথায় বলা যায় ভোজন রসিক দেবতা তিনি। সারাদিনে তাঁকে নানাধরনের ভোগ নিবেদন করা হয়। তাছাড়া তিনি একেবারে ঘড়ি ধরে দিনযাপন করেন। সকাল ছ’টা থেকে সাড়ে ছ’টার মধ্যে তিনি দাঁত মাজেন এবং স্নানপর্ব সেরে নেন। সকাল ন’টার মধ্যে তাঁর ব্রেকফাস্টের আয়োজন করা হয়। একে বলে বল্লভ ভোগ। তাতে থাকে খই, মুড়কি, সরপাপড়ি, মাখন, নানা ধরনের নাড়ু, মণ্ডা, কলা, নারকেল, দই। পানীয় রূপে দেওয়া হয় ঘষাজল। অর্থাৎ একটি জায়ফলকে ঘষে, সেই সুগন্ধি জলে মেশানো হয়। তার সঙ্গে কর্পূর মিশিয়ে নিবেদন করা হয়। ওদিকে ততক্ষণে রান্না ভোগের প্রস্তুতি শুরু। প্রতিদিন রান্নাঘরে পুজো এবং হোম করে উনুনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মধ্যাহ্ন ভোজনের আগে সকাল দশটা নাগাদ তাঁর আর একটি ভোগের আয়োজন করা হয়। তাকে বলে সকাল ধূপ বা রাজভোগ। এই সময় দেওয়া হয় পিঠাপুলি, হংসকেলি, মাঠাপুলিবুঁদিয়া, আলুকদলি ইত্যাদি। এগুলি আসলে নানা ধরনের পিঠে, খিচুড়ি, সব্জি, তরকারি ইত্যাদি। এই সময় মূলত কলাই ডালের বাটা দিয়ে নানা ধরনের পদ রান্না করে দেওয়া হয়। যেমন এন্ডুরি। আদা, হিং ইত্যাদি কলাই ডালের বাটার সঙ্গে মিশিয়ে পরোটার মতো করে দেওয়া হয়। আবার সেটাকে ঘিয়ে ভেজে নাড়ু পাকিয়ে দিলে তাকে বলা হয় হংসকেলি। জগন্নাথ মন্দিরে নানা ধরনের ডাল রান্না হয়। কিন্তু কখনও জগন্নাথদেবকে মটর ডাল দেওয়া হয় না।
এই ভোজনের দু’ঘণ্টার মধ্যে জগন্নাথের খিদে পেয়ে যায়। মূল ভোগ দেওয়া হয় দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে একটার মধ্যে। সেটাকে বলে মধ্যাহ্ন ধূপ বা ছত্রভোগ। এখানে থাকে পখাল বা ভাত, ডাল, ঝোল, পিঠে এবং মিষ্টান্ন। থাকে মহুরা (বেগুন, কচু, কাঁচকলা, কুমড়ো দিয়ে একটা পাঁচমিশেলি তরকারি), বেসর (নারকেল কোরা দিয়ে বিভিন্ন সব্জির তরকারি), অম্বল ইত্যাদি।
সন্ধ্যায় দেওয়া হয় সন্ধ্যাধূপ। সেখানেও কলাই ডালের কয়েকটি পদ দেওয়া হয়। দেওয়া হয় জেনামণি, মাঠপুলি, দুধ বা ছানা দিয়ে তৈরি রসাবলি, মাণ্ডুয় ইত্যাদি। দেওয়া হয় আটার মালপুয়া, দধিপখাল, চুপুড়া পখাল, মরিচনাড়ু ইত্যাদি। দিনের শেষ ভোগটি দেওয়া হয় রাত সোয়া এগারোটায়। শয়নের আগে জগন্নাথদেবের এই ভোগকে বলে বড়শৃঙ্গার ভোগ। এতে থাকে মিষ্টি পখাল, ক্ষীর খঞ্জি, খিরিখিরিসা, কলা, বড়া, সুয়ার পিঠা, দধি কাঞ্জি, সরপুলি ইত্যাদি। মহাপ্রভুর শয়ানের সময় দেওয়া হয় ঘষাজল, ডাব ও তাম্বুল।
এই সবক’টি ভোগই জগন্নাথদেবকে রথ চলার সময় দেওয়া হয়। তবে রথের উপরে চাল দিয়ে তৈরি কোনও রান্নার ভোগ দেওয়া হয় না। মূলত ‘নি-সকড়ি’ বা গম দিয়ে রান্না করা খাবার ভগবানকে পরিবেশন করা হয়। এই পদগুলি হল মনোহর, মরিচ-নাড়ু, কাকরা, কমালু, টাকুয়া চড়েই নদা ইত্যাদি। এছাড়া, ফলমূল মিষ্টি ইত্যাদি দেওয়া হয়।
রথযাত্রা ঘিরে ভক্তদের উল্লাস, নৃত্যগীত ইত্যাদি প্রভু জগন্নাথ রথের উপরে বসে উপভোগ করেন। রথ যখন মাঝামাঝি পথ যায়, তখন ভক্তরা ক্লান্ত। সেখানে জগন্নাথদেবও একটু বিশ্রাম নেন। একে বলে বলগণ্ডি। এইখানে জগন্নাথকে একটা ভোগ দেওয়া হয়। একে বলে বলগণ্ডি ভোগ। দেবতাকে পরিবেশন করা হয় ডাবের জল, খেজুর, কলা, নারকেল ইত্যাদি। রথযাত্রার ধকলে ক্লান্ত ভগবানকে পাখা, চামর ইত্যাদি দিয়ে হাওয়া করা হয়।
এছাড়া পুনর্যাত্রার দিন দেওয়া হয় অধরপণা ভোগ। সেই ভোগ খেয়ে নয়দিন পর আবার মন্দিরে ফিরে আসেন তিন ভাইবোন। পণা হল এক ধরনের খাদ্য, যা তৈরি হয় চিনি, দুধের সর, বড় এলাচের গুঁড়ো ও গোলমরিচ দিয়ে। এছাড়া দেওয়া হয় পোড়াপিঠে।
জগন্নাথদেবের সব থেকে পছন্দ অবশ্য ছাপান্ন ভোগ। নানা ধরনের ভাত, উকখুড়া বা মুড়ি, নানা ধরনের কেক, পিঠে, পুলি, মিষ্টি দিয়ে সাজানো হয় সেই ভোগ। এছাড়া থাকে আমালু বা মিষ্টি লুচি, রসাবলি বা দুধে ভেজানো মালপোয়া, আদাপচেটি বা আদা দিয়ে তৈরি চাটনি ইত্যাদি। কেন জগন্নাথের ছাপ্পান্ন ভোগ, তাই নিয়ে পুরাণে এক কাহিনি আছে। মা যশোদা ছোট্ট কৃষ্ণকে খেতে দিতেন আট প্রহরে আটবার। কিন্তু মহাপ্রলয় কালে পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য কৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বত সাতদিন ধরে কড়ে আঙুলে ধরে রেখেছিলেন। সেই সাতদিন কৃষ্ণ কিছুই খাননি। মহাপ্রলয় থামলে যশোদা কৃষ্ণকে সাতদিনের আট প্রহরের খাবার খেতে দেন। ব্রজের সকলে ছাপান্ন রকমের পদ এনে কৃষ্ণকে নিবেদন করেন। তাই প্রভুকে ছাপান্ন পদ দিয়ে তুষ্ট করা হয়। এই ছাপ্পান্ন ভোগে আরও যেসব পদ থাকে, সেগুলি হল চউতাপুরী, মগজনাড়ু, সরভাজা, সরমণ্ডা, নাড়িয়াখুদি, মোহনভোগ, লক্ষ্মীবিলাস, পোড়াপিঠা, চুলিয়াচুপড়া, কাণিকা (পায়েস) ইত্যাদি।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের মহাপ্রসাদ গ্রহণের কথা বহুবার ব্যক্ত করেছেন। একটি জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘রাত্রে তথা রহি প্রাতে স্নানকৃত্য কৈল। হেনকালে জগন্নাথের মহাপ্রসাদ আইল।। রাজার আজ্ঞায় পড়িছা প্রতি দিনে দিনে। বহুত প্রসাদ পাঠায় দিঞা বহুজনে।।’
মহাপ্রসাদের উপর অগাধ ভক্তি ছিল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের। তিনি বলতেন, কলিতে জগন্নাথের মহাপ্রসাদ হল সাক্ষাৎ ব্রহ্ম। তিনি রোজ সকালে তাঁর বটুয়া থেকে বের করে মহাপ্রসাদের একটি করে শুকনো দানা খেতেন। নরেনকে বলেছিলেন, মহাপ্রসাদ খা। মহাপ্রসাদ খেলে জ্ঞান, ভক্তি, বিশ্বাস লাভ হয়।
আসলে মহাপ্রসাদের একটি তাৎপর্য রয়েছে। দেবী বিমলাকে মনে করা হয়, তিনি হলেন জগন্নাথের শক্তি। মন্দির চত্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে তাঁর মন্দির রয়েছে। তান্ত্রিকদের অন্যতম পীঠস্থান দেবী বিমলার মন্দির। তাঁদের কাছে বিমলা হলেন ভৈরবী এবং জগন্নাথ স্বয়ং ভৈরব। প্রভু জগন্নাথের প্রসাদকে কিন্তু মহাপ্রসাদ বলে না। প্রভুর ভোগকে বলে প্রসাদ। সেই অন্ন নিবেদন করা হয় দেবী বিমলাকে। তিনি সেই অন্নগ্রহণের পর তবেই তা মহাপ্রসাদ হিসাবে গণ্য হয়।
মহাপ্রসাদ মূলত দু’ধরনের একটি সঙ্কুরি প্রসাদ এবং অন্যটি সুখিলা প্রসাদ।
সঙ্কুরি মহাপ্রসাদ হল ভাত, ডাল, সব্জি, পায়েস ইত্যাদি। সুখিলা মহাপ্রসাদ আসলে ভোগ দেওয়া শুকনো মিষ্টি। এই দু’রকম ছাড়াও আছে অন্য এক ধরনের শুকনো মহাপ্রসাদ। তার নাম হল নির্মাল্য। এটি কৈবল্য নামেও পরিচিত। নির্মাল্য হল সাধারণত শুকনো চাল।
এছাড়াও অনেক রকম খাবার আছে, যেগুলি জগন্নাথদেব খান না। সেগুলি তাঁকে ভোগে দেওয়া হয় না। যেমন ঢেঁড়শ, কপি, লাউ, পুঁই শাক, সজনে ডাঁটা, পিঁয়াজ, রসুন, চিনি, সিদ্ধ চাল, কলে পেষা আটা, সাদা লবণ ইত্যাদি।
রান্নার এই বিষয়টি দেখার জন্য রয়েছে একটা বিশাল টিম। যেমন লেঙ্কা পদবিধারীরা রান্না করেন। যাঁরা মহাপ্রভুর জন্য দুধ, দই, ছানা তৈরি করেন, তাঁদের বলে ‘মহাভোই’। যাঁরা ডাল গুঁড়ো করেন বা বাটেন, চাল সব্জি ধোয়ার কাজ করেন, তাঁদের বলে ‘সমার্থাগণ’। যাঁরা রন্ধনের ব্যাপারে নজরদারি করেন, তাঁদের বলে ‘রোষ পাইক’। মানে রসুই ঘরের নজরদার। যাঁরা রন্ধন সামগ্রীর পরিশুদ্ধতার ব্যাপারে দেখভাল করেন, তাঁর বলে ‘শুদ্ধ পাইক’। সুতরাং পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ভগবানের ভোগ নির্মাণ এক বিশাল ম্যানেজমেন্টের কাজ। ঘড়ি ধরে, শুদ্ধতার সঙ্গে প্রতিদিন তা করা হয়।
‘স্কন্দপুরাণ’ অনুসারে মহাপ্রসাদকে ‘অন্নব্রহ্মা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মন্দিরের রান্নাঘরে দিনে এক লাখ ভক্তের খাবার রান্না করার ক্ষমতা রয়েছে। মহাপ্রসাদ শুধুমাত্র মাটির হাঁড়িতে রান্না করা হয় এবং জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হয়। মন্দিরের বাইরের দিকে উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত অংশটি ‘আনন্দ বাজার’ নামে খ্যাত। এখানে বিক্রি হয় মহাপ্রসাদ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ওপেন-এয়ার হোটেল বা ফুড মার্ট। ভক্তরা এখানে প্রসাদ কিনে বসে খাওয়াদাওয়া করেন অথবা বেঁধে নিয়ে যান।
পুরীর এবং আশপাশের বেশিরভাগ বাসিন্দা বিবাহ সহ তাঁদের বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথিদের আপ্যায়ন করার জন্য এই মহাপ্রসাদের উপর নির্ভর করেন। ওড়িয়া হিন্দু পরিবারগুলিতে সমস্ত শুভ অনুষ্ঠানে প্রথমে মহাপ্রসাদ খাওয়া হয়। শিশুদের অন্নপ্রাশনে আগে মুখে মহাপ্রসাদ দেওয়া হয়।