সৌমিত্র দাস, কাঁথি: কাঁথি শহরে কয়েকটি প্রাচীন মন্দিরে ধুমধাম করেই কালীপুজো হয়। এরমধ্যে চোদ্দহাতের কালী ও কপালকুণ্ডলার কালীর পুজোর মাহাত্ম্য সম্পূর্ণ আলাদা। এছাড়া শহরে ভবতারিণী কালীমন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, খড়্গচণ্ডী শ্মশানকালী মন্দিরের পুজোও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চোদ্দহাতের কালীর আরাধনা ঘিরে শহরের বাগবাজার এলাকার বাসিন্দারা আনন্দে মেতে ওঠেন। চোদ্দহাত আর সুউচ্চ কালীপ্রতিমা সবার নজর কাড়ে। তবে কী কারণে মা কালী চোদ্দহাতের, সঠিক ব্যাখা কারও কাছে নেই। শতাধিক বছর আগে পুজোর প্রচলন করেছিলেন বাগবাজারের জমিদার রাজেন্দ্রনাথ বাগ। জমিদারি কবেই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। পরিবার খণ্ড খণ্ড হয়েছে। কিন্তু আজও রয়ে গিয়েছে পুজো। রাজেন্দ্রনাথ বাগের উত্তরসূরীররাই পুজোর ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন। কোনো চাঁদা না তুলে বাগ পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে পুজো হয়। একটি আটচালা মন্দিরে মায়ের মূর্তি রয়েছে। তবে এখানকার পুজোয় বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, প্রতিমার বিসর্জন দেওয়া হয় না। বিজয়া দশমীর দিন শুধুমাত্র ঘট বিসর্জন হয়। প্রতি বছর পুজোর কয়েকদিন আগে থেকেই আটচালা মন্দির ও প্রতিমায় রং করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, চোদ্দহাত কালীর বিশেষ নামডাক রয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন মায়ের পুজো দেখতে আসেন। সারা বছর সকাল-সন্ধ্যা নিত্যপুজো হয়। আর কালীপুজো জাঁকজমক করেই হয়। নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে।
বহু বিতর্ক সত্ত্বেও কাঁথি শহরের দারুয়ার কপালকুণ্ডলা কালীমন্দিরের মাহাত্ম্য অটুট রয়েছে। মন্দির ঘিরে নানা ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। তবে ‘নানা মুনির নানা মত’ মন্দিরের গুরুত্ব অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, কাঁথি-দারুয়া রাস্তার পাশে অবস্থিত এই কপালকুণ্ডলা কালীমন্দিরই বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের সেই বিখ্যাত কালীমন্দির। অনেকেই সেই তথ্য মানতে নারাজ। তাঁদের দাবি, আসল কপালকুণ্ডলা মন্দির রয়েছে দেশপ্রাণ ব্লকের দারিয়াপুরে। তৎকালীন সময়ে এলাকাটি নেগুয়া মহকুমার (বর্তমান কাঁথি মহকুমা) অন্তর্ভুক্ত ছিল। এলাকাটি ঘনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নেগুয়া মহকুমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। একবার তিনি একটি ডাকাতির ঘটনার তদন্তে দারিয়াপুরে আসেন। এসেছিলেন দারুয়াতেও। কথিত আছে, দারুয়ায় এসে তিনি এক কাপালিকের দেখা পান। এই কাপালিকই সম্ভবত ভোলানাথ পুরী নামে পরিচিত ছিলেন। তিনিই নাকি এই মন্দিরে কালীপুজো শুরু করেন। এদিকে বঙ্কিমচন্দ্রের মানসকন্যা কপালকুণ্ডলার নামানুসারে মন্দিরটি কপালকুণ্ডলা কালীমন্দির বলে পরিচিত হয়। কাপালিক ভোলানাথ পর্ণকুটির তৈরি করে কালীসাধনায় মগ্ন হন। পরবর্তীকালে তিনি খড়ের চালার মাটির মন্দির তৈরি করেন। কালীমূর্তিও ছিল মাটির। এরপর ১৩২৯বঙ্গাব্দে কাশী থেকে পাথরের কালীমূর্তি এনে পাকা মন্দির তৈরি এবং প্রতিষ্ঠা করেন কাপালিক ভোলানাথের উত্তরসূরীরা। সেই থেকে আজও নিষ্ঠাভরে কালী আরাধনা হয়ে আসছে। মন্দিরে কাপালিকের ব্যবহৃত খাঁড়া, হাঁড়িকাঠ এখনও সযত্নে রয়েছে। নিত্যপুজো ছাড়াও ধুমধাম করে কালীপুজো হয়। অনেকেই তাঁদের মানত পূরণের জন্য ছাগবলি দেন। পুরী পরিবারের পাঁচ শরিক পালা করে পুজোর আয়োজন করেন। ভবতারিণী কালীমন্দিরে পুজো দিতে বহু ভক্ত ভিড় জমান। আগে ছোট মন্দির থাকলে কয়েকবছর আগে নতুন সুদৃশ্য মন্দির তৈরি হয়েছে। শুধু কালীপুজোর দিন নয়, প্রতিদিনই পুজো দিতে ভিড় লক্ষ্য করা যায়।



