সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ভিক্ষে করেন অনেকেই। কেউ পেটের তাগিদে। কেউ স্বভাবে। ভিক্ষাবৃত্তির স্থানও সবার এক হয় না। কেউ বাসে, ট্রেনে। কেউ বা স্টেশন চত্বরে। কেউ পথের ধারে। কেউ বা মন্দির বা তীর্থস্থানে।
সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ভিক্ষে করেন অনেকেই। কেউ পেটের তাগিদে। কেউ স্বভাবে। ভিক্ষাবৃত্তির স্থানও সবার এক হয় না। কেউ বাসে, ট্রেনে। কেউ বা স্টেশন চত্বরে। কেউ পথের ধারে। কেউ বা মন্দির বা তীর্থস্থানে।
বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরের কাঁঠাল গাছের তলা থেকে বাইরের চাতাল—অনেকের হাতে ভিক্ষার পাত্র। ভগবতীও তাঁদের একজন। শীর্ণকায় বৃদ্ধা। কোমর পড়েছে। পা টেনে টেনে হাঁটেন। আশিতে এলে যা হয় আর কি! তবুও ভগবতী গড়াই যেন সবার চেয়ে একটু আলাদা। তাঁর ভিক্ষে চাওয়ার আবদারটিও বেশ ভিন্ন। কাঁদো কাঁদো গলায় নগাড়ে বলে চলেন—‘দুটো পয়সা দেবে বাবু। বাড়িতে ছেলেটা অসুস্থ। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকে। ওষুধ কিনতে হবে...।’ না, কোনও ভনিতা নয়। ধবধবে সাদা শাড়ি পরে মিথ্যে বলেন না বৃদ্ধা। একদা সংসার বেশ সুখের ছিল। ছেলেটা ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত করিতকর্মা ছিলেন। গায়ে গতরে খেটে রোজাগার করতেন। ভগবতীদেবী ও তাঁর স্বামীও দস্তুরমতো খাটতেন। তিনজনের ছ’ হাতের আয়ে দিব্যি চলে যেত সংসার। স্বামীর অকাল মৃত্যুতে ছন্দপতন। ছেলেটাকেও ধরল স্নায়ুরোগে। ধীরে ধীরে শয্যাশায়ী। চিকিৎসা করাতে গিয়ে সঞ্চয়-সম্বল শেষ। অগত্যা বছর দু’য়েক হল ভিক্ষাপাত্র হাতে তুলেছেন ভগবতীদেবী। বৃদ্ধার উদ্দেশ্য একটাই—যতদিন বাঁচিয়ে রাখা যায় প্রৌঢ় সন্তানকে।
সকালে উঠে খুঁড়িয়ে সর্বমঙ্গলা মন্দিরে চলে আসেন ভগবতীদেবী। প্রথমে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেন। সেই প্রার্থনায় থাকে ছেলে রমেশকে সুস্থ করার কামনা। তারপর অশক্ত শরীরটা টেনে এনে বসে পড়েন চাতালে। প্রতিদিন বহু পুণ্যার্থী সর্বমঙ্গলার দর্শনে আসেন। তাঁদের দেখে দু’টো পয়সা পাত্রে ফেলার আর্জি রেখেই চলেন। কেউ দেন। কেউ মুখ ফিরিয়ে চলে যান। রোদে তেতেপুড়ে দিনের পাত্রে যা জমা পড়ে তা নিয়ে চিলতে ঘরে ফেরেন। ছেলেকে বিছানা থেকে তুলে ওষুধ খাওয়ান। কোনও ওষুধ কিনতে ভিক্ষের টাকা ফুরিয়ে গেলে নিজের আর খাওয়া হয় না! সর্বমঙ্গলা মায়ের নাম নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন সকালে ফের মন্দিরে। আর ক’দিন বাদেই পুজো। চারদিন মন্দিরে উপচে পড়ে ভিড়। মনস্কামনা পূরণে ডালি সাজিয়ে পুজো দেওয়ার হিড়িক। ভগবতীদেবী প্রহর গুনছেন। পুজোর ক’টা দিন হয়তো একটু বাড়তি উপার্জন হবে। ছেলেটাকে একটু পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো যাবে। শনিবারের সকাল। ভগবতীদেবী কখনও বসে, কখনও দাঁড়িয়ে ভিক্ষে চাইছেন সবার কাছে। এক ফাঁকে বলছিলেন, ‘দু’বছরের বেশি সময় ধরে মন্দিরে আসছি। বড়বাজারে ছোট একটা ঘরে থাকি। সঙ্গে থাকে আমার ছেলে। দীর্ঘদিন অসুস্থ। কাজ করতে পারে না। আমি মন্দিরে না এলে ওর ওষুধ কিনতে পারব না।
খাবারও জুটবে না। সর্বমঙ্গলার কৃপায় কোনওরকমে দিন কাটছে।’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলা বলছিলেন, ‘ভগবতীদেবী অত্যন্ত ভদ্র স্বভাবের। কারও কাছে জোর জুলম করেন না। পুণ্যার্থীরা যা দেন, খুশি মনে তাই নেন।’ ‘ভগবতী’র অর্থের সঙ্গে ভগবতীর বৃত্তি বড্ড বেমানান! সবই বোধহয় ভাগ্যের পরিহাস! -নিজস্ব চিত্র