অবতার না হলে মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় না। ভক্তের অবতার চাই। তিনি মানুষ রূপে অবতার হয়ে আসেন, প্রেমভক্তি শেখানোর জন্য। একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রকে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, কেউ কেউ যে আমাকে ঈশ্বরের অবতার বলে, তোর কী বোধ হয়?’ নরেন্দ্রর জবাব, ‘অন্যের মত শুনে আমি কিছু করব না, আমি নিজে যখন বুঝব, নিজের যখন বিশ্বাস হবে, তখনই বলব।’ ঠাকুর যখন ক্যান্সারের যন্ত্রণায় অস্থির, নরেন্দ্র ভাবছেন, এই যন্ত্রণার মধ্যে যদি বলেন যে, আমি সেই ঈশ্বরের অবতার তাহলে বিশ্বাস হয়! চকিতের মধ্যে ঠাকুর বললেন, ‘যে রাম যে কৃষ্ণ, ইদানীং সে-ই রামকৃষ্ণরূপে ভক্তের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।’ নরেন্দ্র এই কথা শুনে স্তব্ধবাক! ঈশ্বরের প্রতিনিধি হয়ে অবতার কেন আসেন? লিখেছেন স্বামী ঋতানন্দ।
Advertisement
শিরোনামের প্রশ্ন দুটি অত্যন্ত ছোট কিন্তু যুগে যুগে মুনি-ঋষি, সাধু-সন্ত থেকে শুরু করে চিন্তাশীল, বিদগ্ধ, পণ্ডিতকুল ও সাধারণ মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা দুটি অবশ্যই দুর্জ্ঞেতায় আচ্ছন্ন। আবার অনেকের কাছে চরম ধাঁধা কিংবা এক জটিল সমস্যা।
এ ধরনের অতীন্দ্রিয় প্রশ্নের উত্তরের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণের ভ্রাতুষ্পুত্র শিবরাম চট্টোপাধ্যায়ের সহজতম পন্থা সর্বজনবিদিত। তাঁর খুড়িমা শ্রীমা সারদা দেবীকে বিভিন্নজনে দেবী-ভগবতী ইত্যাদি বলে থাকেন। তিনি সেসব কথায় সিদ্ধান্ত না করে এক মোক্ষম ক্ষণে শ্রীশ্রীমাকে সেই প্রশ্নটি করে বসলেন। শিবুদাকে সঙ্গী করে মেঠো পথে চলেছেন শ্রীমা কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটি। অতর্কিতে মাঝপথে শিবুদা মাকে প্রশ্ন করেন—‘আজ আমাকে বলতে হবে, তুমি কে?’
শ্রীমা বলেন, ‘আমি আর কে? আমি তোর খুড়ি।’ উত্তরটি শিবুদার মোটেই মনঃপূত হয় না। রাগ-অভিমানে মাঠে পুঁটলি-প্যাঁটরা নিয়ে বসে পড়েন। বলেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে যাব না, তুমি একলাই যাও। ওই তো হোথা দেখা যাচ্ছে জয়রামবাটি।’
শ্রীমা বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এবং শেষে শিবুদার একগুয়ে নাছোড় প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘লোকে বলে কালী।’ এতেও শিবুদা তৃপ্ত নন। ‘লোকে কি বলে শুনতে চাই না, তুমি কী বল, আমায় বলতেই হবে।’ অবশেষে শ্রীমা স্বীকার করে বলেন, হ্যাঁ, তাই।’ এরপরেও মাকে দিয়ে শিবুদা তিনসত্য করিয়ে নিয়েছিলেন যে, শ্রীমা কালী। পরে জগৎ জেনেছে শ্রীমা কেবল কালী নন, তিনি সর্বদেবদেবী স্বরূপিণী। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণাবতারের লীলাসঙ্গিনী দেবী ভগবতী। হ্যাটস অব টু শিবুদা!
শিবুদার মতো অনেকেরই মনে হয় স্বয়ং তিনি বললেই তো হয়! এরকম ধারণা ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারও একদিন ব্যক্ত করেছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং নরেন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে। গীতাতেও বলা আছে ‘স্বয়ঞ্চৈব ব্রবীষী মে’—আপনি নিজ মুখে আমায় বলেছেন। ডাক্তার সরকারের সরল আকাঙ্ক্ষার উত্তরে ধুরন্ধর বুদ্ধিমান গিরিশবাবু বলে ওঠেন, ‘তিনি বললেই আপনি মেনে নেবেন? বলবেন, ‘শয়তান (devil) এসেছে, বলছে ভগবান।’ শেষ পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে অবতার চেনা বিষয়টি সহজ নয়। ঈশ্বরানুগ্রহে বহু সাধনার সিদ্ধিরূপ হল অবতারে বিশ্বাস। সে কথার অবতারণাই বর্তমান নিবন্ধের প্রতিপাদ্য।
ঈশ্বরের অস্তিত্বই যেখানে যুগে যুগে প্রশ্নাতীত নয়, সেখানে ‘অবতার’ অর্থাৎ ঈশ্বরের মানুষ হয়ে অবতাররূপে আসা যে এক চরম হেঁয়ালি মাত্র তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বেদে যাঁরা ঋষি বলে উল্লেখিত, দার্শনিক যুগে তাঁদের আধিকারিক পুরুষ বলে গণ্য করা হয়েছে, এবং তাঁরাই পৌরাণিক যুগে ঈশ্বরাবতার বলে গৃহীত হয়েছেন। সে ভাবনা জগতে যথারীতি আদৃত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে চলেছে। শুধু এদেশে নয়, সেমেটীয় ধর্মের মধ্যে যেমন, খ্রিস্টধর্মে যিশুখ্রিস্টকে ঈশ্বরপুত্র এবং ইসলামে হজরত মহম্মদকে প্রফেট বলে চিহ্নিত করা সনাতন ধর্মের অবতারবাদেরই নামান্তর মাত্র। সেমেটীয় ধর্মে যেখানে যিশুখ্রিস্ট কিংবা মহম্মদকে মাত্র একবার অবতরণের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সনাতন হিন্দুধর্মে অসংখ্যবার অবতারের আগমন সিদ্ধতা অর্জন করে আছে।
অবতার কে?
স্বয়ং ঈশ্বর যখন মানুষের জন্য মানুষের মধ্যে মানুষরূপে ধরায় অবতীর্ণ হন, তাঁকে ঈশ্বরাবতার বলা হয়। তাঁরই সংক্ষিপ্ত নাম ‘অবতার’। দর্শন রাজ্যে ভারতের ‘বেদ’ এক অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে চলেছে। ‘বেদ’-কে জ্ঞানভাণ্ডার এবং অপৌরুষেয় বলা হয়েছে। তা কোনও ব্যক্তির সৃষ্টি নয়। ব্যক্তি বা মানুষজীবন কখনওই ত্রুটিহীন, নিখাদ হয় না। অপৌরুষেয় তত্ত্বে সেটিকে সন্ধান করতে হবে। তাই বেদকে সর্বজ্ঞ বা সর্বজ্ঞের মতো বলা হয়েছে। মানবীয় দুর্বলতা পরিহারের অত্যদ্ভূত ধারণা থেকে বেদের প্রামাণ্য অবিসংবাদীরূপে স্বতঃসিদ্ধ বলে ভারতীয় দর্শনে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদে স্বীকৃত এবং গ্রাহ্য।
পৌরাণিক যুগ ও অবতার ধারণা
বেদ পরবর্তী যুগে দেখা গেল দার্শনিক যুগ এবং তারপর পৌরাণিক যুগের সূচনা। বেদের জ্ঞান ও কর্মকাণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের মনের ভালোবাসার প্রস্রবণকে সত্যাবিষ্কারে নিযুক্ত করে মুনি-ঋষি ও সাধকেরা খুঁজে পেলেন ভক্তিরসের অতল অতি মিষ্টরসের অফুরন্ত ভাণ্ডার। তাতে অবগাহন করে ভারত পেল ব্যাসদেব রচিত ভক্তিশাস্ত্রের চূড়ামণি শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থ। শাণ্ডিল্য ও নারদের ভক্তিসূত্র, ভক্তিরসায়ন, ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ইত্যাদি একের পর এক শ্রীভগবানের রূপ-গুণ ও তত্ত্বের বর্ণনায় মহিমান্বিত সব কালজয়ী গ্রন্থ।
এরই মধ্যে পূর্ববর্তী ঈশ্বরাবতারদের জীবন ও কর্ম নিয়ে যেমন ‘রামায়ণ’ রচিত হয়েছে এবং তাকে মূল করেই শতাধিক রামায়ণ জগতের বিভিন্ন দেশে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং সেগুলি বর্তমানে উপলব্ধও হচ্ছে। এছাড়া, ১৮টি পুরাণ গ্রন্থ এবং ১৮টি উপপুরাণ লিখিত হয়েছে। সবই ভক্তিরসাশ্রিত ভাবতত্ত্বের কাহিনি, গল্প এবং গভীর তত্ত্বে সমৃদ্ধ।
মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যকে উপজীব্য করে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’, ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত’, ইত্যাদি গ্রন্থ পূর্বোক্ত ভক্তিপথকে অবলম্বন করে সমাজজীবনকে জীবন্ত রেখেছে।
শুধু ভারতে নয়, জেরুজালেমের প্যালেস্তাইনে জন্মে ভগবান যিশু তাঁর সহিষ্ণুতা ও করুণা প্রদর্শনে জগৎকে বিস্মিত করে শুধু ঈশ্বরপুত্র হিসাবে নয়, স্বয়ং ঈশ্বররূপে সর্বত্র পূজিত হচ্ছেন। তাঁর অলৌকিক জীবন ও উপদেশ জীবনযুদ্ধে শ্রান্ত-ক্লান্ত-বিষণ্ণ পথহারা সুবিপুল মানুষকে শান্তির পথে আহ্বান করছে। পরিত্রাতা হিসাবে জগতের বিরাট সংখ্যক আর্দ্রহৃদয় মানুষ ভগবান যিশুর মধ্যে তাদের ঈশ্বরপুত্রকে খুঁজে পরিত্রাণের পথ পাচ্ছে। সে-ও এক ভক্তি আন্দোলনের লীলা কথন।
অবতারের আগমনের কারণ
বেদের নির্গুণ-নিরাকার ব্রহ্মের ধারণা ভক্তিবাদে সগুণ-সাকার ধারণায় পর্যবসিত হয় ভক্তের তীব্র আকুলতা এবং ঈশ্বরের অসীম অনুকম্পায় সেটি সংসাধিত হয়। নির্গুণ-নিরাকার ব্রহ্ম মায়াপোহিত হয়ে সগুণ-সাকার হন। জ্ঞানে নির্গুণ-নিরাকার, ভক্তিহিমে জমে বরফের সাকার রূপ ধারণ।
সর্বশক্তিমান ভগবানের জীবজগতের কল্যাণের জন্য নরদেহধারণ করে আবির্ভূত হওয়া জগতের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক বিরল ঘটনা। কালপ্রভাবে যখন জগৎ পাপভারে আক্রান্ত হয়, তখন তিনি দয়াপরবশ হয়ে যেন নিজ কর্তব্যবোধে জগতে অবতীর্ণ হন ধর্মের গ্লানি দূর করবার জন্য। এই সরল সত্যটি শ্রীরামকৃষ্ণ সহজবোধ্য লৌকিক দৃষ্টান্তের সাহায্যে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জমিদারীর কোনও তালুকে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে জমিদার (ঈশ্বর) তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ লাঠিয়াল গোলোক চৌধুরীকে সেখানে শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপনের জন্য পাঠিয়ে দেন। ধর্মপ্রসারের যে সব বাধার সৃষ্টি হয় সে সব অবতার নানাভাবে অপসারিত করে ধর্মের স্রোতকে আবিলতামুক্ত করে দেন। এই হয়ে আসছে যুগে যুগে। অবতারতত্ত্বে যুগপ্রয়োজন একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য নির্ধারক। প্রত্যেক যুগের অবতারকে সেজন্য যুগাবতার বলে আখ্যা দেওয়া হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ সুস্পষ্ট করে বলেছেন, ‘নবাবী আমলের মুদ্রা বাদশাহী আমলে চলে না।’
শুধু ধর্মগ্রন্থে হয় না, আদর্শ জীবনের প্রয়োজন। তাই ভগবান আসেন, নিজে আচরণ করে শাস্ত্রের মর্যাদা দেন, যুগধর্মের আদর্শ দেখান, ধর্মভাব জগতে প্রচার করেন। তাঁর জীবনাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে লোক ধর্মমার্গ অনুসরণ করে। এভাবে শ্রীভগবান জগতে ধর্মসংস্থাপন করেন। যুগে যুগে এই হয়ে আসছে।
অবতার এক পরম রহস্য
ভগবান অজ, জন্মরহিত; তার জন্ম হতে পারে না। তবু তিনি নিজ মায়াশক্তি অবলম্বন করে দেহধারী হন, অবতরণ করেন। কেন যে তিনি জীবের দুঃখে দুঃখিত হয়ে জীবগণকে দুঃখ পারাবার থেকে ত্রাণ করবার জন্য অবতীর্ণ হন এটিই পরম রহস্য।
অবতার না হলে মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় না
নির্বিশেষ ঈশ্বর তত্ত্ব সকলে ধারণা করতে পারে না। নির্গুণ-নিরাকার ব্রহ্ম জ্ঞানীদের পক্ষে। ভক্তের অবতার চাই। অবতার মায়ার রাজ্যে, চিৎশক্তির এলাকায় যাওয়া। সাধারণ মানুষের ভূমিতে বিচরণ। সহজ-সরল বাতাবরণে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, লীলা ধরে ধরে নিত্যে যেতে হয়, যেমন সিঁড়ি ধরে ধরে ছাদে ওঠা। নিত্য-দর্শনের পর নিত্য থেকে লীলায় এসে থাকতে হয়। ভক্তি-ভক্ত নিয়ে থাকা—এইটি পাকা মত।
‘তাঁর নানারূপ, নানালীলা—ঈশ্বরলীলা, দেবলীলা, নরলীলা, জগৎলীলা। তিনি মানুষ হয়ে অবতার হয়ে যুগে যুগে আসেন, প্রেমভক্তি শিখাবার জন্য। দেখ না চৈতন্যদেব। তাঁর অবতারত্বে প্রেম-ভক্তি আস্বাদন করা যায়। তাঁর অনন্ত লীলা—কিন্তু আমার দরকার প্রেম, ভক্তি। আমার ক্ষীরটুকু দরকার। গাভীর বাঁট দিয়েই ক্ষীর আসে। অবতার গাভীর বাঁট।’
‘অবতার—যিনি তারণ করেন। তা দশ অবতার আছে, চব্বিশ অবতার আছে আবার অসংখ্য অবতার আছে।’
‘এই ভুবনমোহিনী মায়ায় সকলে মুগ্ধ। ঈশ্বর দেহধারণ করেছেন—তিনিও মুগ্ধ হন। রাম সীতার জন্য কেঁদে কেঁদে বেড়িয়েছিল। পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে।’
‘তবে একটি কথা আছে, —ঈশ্বর মনে করলেই মুক্ত হন।’
‘তবে অবতার ইচ্ছা করে নিজের চোখে কাপড় বাঁধে। যেমন ছেলেরা কানামাছি খেলে। কিন্তু মা ডাকলেই খেলা থামায়।’
কয়েকটি ঘটনাচিত্র
১ মার্চ ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ। দোলযাত্রার দিন। নরেন্দ্রাদি ভক্তগণ এসেছেন। ওইদিনে ঠাকুর নরেন্দ্রকে বলছেন, ‘গিরিশ ঘোষ যা বলে, তোর সঙ্গে কি মিলল?’
নরেন্দ্র—‘আমি কিছু বলি নাই, তিনিই বলেন তাঁর অবতার বলে বিশ্বাস। আমি আর কিছু বললুম না।’
শ্রীরামকৃষ্ণ—কিন্তু খুব বিশ্বাস! দেখেছিস?
কিছুদিন পরে নরেন্দ্রের সঙ্গে ঠাকুরের অবতার বিষয়ের কথা হল। ঠাকুর বলছেন, ‘আচ্ছা, কেউ কেউ যে আমাকে ঈশ্বরের অবতার বলে, তোর কি বোধ হয়?’
নরেন্দ্র বলেন, ‘অন্যের মত শুনে আমি কিছু করব না, আমি নিজে যখন বুঝব, নিজের যখন বিশ্বাস হবে, তখনই বলব।’
কাশীপুরে ঠাকুর যখন ক্যান্সারের যন্ত্রণায় অস্থির, ভাতের তরল মণ্ড পর্যন্ত গলাধঃকরণ হচ্ছে না, তখন একদিন নরেন্দ্র ঠাকুরের কাছে বসে ভাবছেন, এই যন্ত্রণার মধ্যে যদি বলেন যে, আমি সেই ঈশ্বরের অবতার তাহলে বিশ্বাস হয়। চকিতের মধ্যে ঠাকুর বলছেন, ‘যে রাম যে কৃষ্ণ, ইদানীং সে-ই রামকৃষ্ণরূপে ভক্তের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।’ নরেন্দ্র এই কথা শুনে অবাক হয়ে রইলেন। পরবর্তী সময়ে নরেন্দ্র কীরকম বুঝেছিলেন, তার সামান্য নিদর্শন ৩ মার্চ, ১৮৯০ গাজীপুর থেকে প্রমদাবাবুকে হৃদয় উন্মুক্ত করে লিখলেন:
‘আর কোন মিঞার কাছে যাইব না—
এখন সিদ্ধান্ত এই যে—রামকৃষ্ণের জুড়ি আর নাই, সে অপূর্ব সিদ্ধি, আর অপূর্ব অহেতুকী দয়া, সে intense sympathy (প্রগাঢ় সহানুভূতি) বদ্ধ জীবনের জন্য—এ জগতে আর নাই।’
‘তাঁহার জীবদ্দশায় তিনি কখনো আমার প্রার্থনা গরমঞ্জুর করেন নাই—আমার লক্ষ অপরাধ ক্ষমা করিয়াছেন—এত ভালবাসা আমার পিতামাতায় কখনো বাসেন নাই। ইহা কবিত্ব নহে, অতিরঞ্জিত নহে, ইহা কঠোর সত্য এবং তাঁহার শিষ্যমাত্রেই জানে। বিপদে, প্রলোভনে ‘ভগবান রক্ষা কর’ বলিয়া কাঁদিয়া সারা হইয়াছি—কেহই উত্তর দেয় নাই—কিন্তু এই অদ্ভুত মহাপুরুষ বা অবতার বা যাই হউন, নিজ অন্তর্যামিত্বগুণে আমার সকল বেদনা জানিয়া নিজে ডাকিয়া জোর করিয়া সকল অপহৃত করিয়াছেন।
‘ভায়া, রামকৃষ্ণ পরমহংস যে ভগবানের বাবা, তাতে আমার সন্দেহমাত্র নাই; তবে তিনি কী বলতেন, লোককে দেখতে দাও; তুমি জোর করে কি দেখাতে পারো? এইমাত্র আমার objection (আপত্তি)।’
‘লোকে বলুক, আমরা কি বলব? দাদা, বেদ-বেদান্ত পুরাণ-ভাগবতে যে কি আছে, তা রামকৃষ্ণ পরমহংসকে না পড়লে কিছুতেই বুঝা যাবে না।’
শ্রীরামকৃষ্ণ (১৮৮৪, ৯-মার্চ) ভক্তদের বলছেন—‘দেখ, এই হাতে লাগার দরুণ আমার স্বভাব উল্টে যাচ্ছে। এখন মানুষের ভিতর ঈশ্বরের বেশি প্রকাশ দেখিয়ে দিচ্ছে। যেন বলছে আমি মানুষের ভিতর রইচি, তুমি মানুষ নিয়ে আনন্দ কর।’
‘তিনি শুদ্ধভক্তের ভিতর বেশি প্রকাশ—তাই নরেন্দ্র, রাখাল এদের জন্য এত ব্যাকুল হই।’
‘এমন আছে যে শালগ্রাম হতেও বড় মানুষ। ‘নরনারায়ণ’।
‘প্রতিমাতে তাঁর আবির্ভাব হয়, আর মানুষে হবে না?’
‘তিনি নরলীলা করবার জন্য মানুষের ভিতর অবতীর্ণ হন, যেমন-রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্যদেব। অবতারকে চিন্তা করলেই তাঁর চিন্তা করা হয়।’
[১৮৮৩, ২০ ডিসেম্বর] শ্রীরামকৃষ্ণ—‘ঈশ্বর নরলীলা করেন।’ বলরামের পিতা প্রভৃতি ভক্তদের বলছেন।
‘মানুষে তিনি অবতীর্ণ হন, যেমন শ্রীকৃষ্ণ, রামচন্দ্র, চৈতন্যদেব।
‘আমি কেশব সেনকে বলেছিলাম যে, মানুষের ভিতর তিনি বেশি প্রকাশ। মঠের আলের ভিতর ছোট ছোট গর্ত থাকে; তাদের বলে ‘ঘুটী’। ঘুটীর ভিতর মাছ, কাঁকড়া জমে থাকে। মাছ কাঁকড়া খুঁজতে গেলে ওই ঘুটীর ভিতর খুঁজতে হয়; ঈশ্বরকে খুঁজতে হলে অবতারের ভিতর খুঁজতে হয়।’
‘ওই চৌদ্দপোয়া মানুষের ভিতরে জগন্মাতা প্রকাশ হন। গানে আছে—
শ্যামা মা কি কল করেছে!
চৌদ্দপোয়া কলের ভিতরি কত রঙ্গ দেখাতেছে!—ইত্যাদি।
অবতারকে চেনার উপায়
‘কিন্তু ঈশ্বরকে জানতে হলে, অবতারকে চিনতে গেলে, সাধনের প্রয়োজন। দীঘিতে বড় বড় মাছ আছে, চার ফেলতে হয়। দুধেতে মাখন আছে, মন্থন করতে হয়। সরিষার ভিতর তেল আছে, সরিষাকে পিষতে হয়। মেথিতে হাত রাঙা হয়, মেথি বাটতে হয়।’
[১৮৮৪, ৯ নভেম্বর]
লক্ষণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন—ভগবানকে কোথা-কোথা দর্শন হতে পারে। রাম অনেক কথা বলে তারপর বললেন—‘ভাই, যে মানুষে উর্জিতা ভক্তি দেখতে পাবে—হাসে, কাঁদে, নাচে, গায়, —প্রেমে মাতোয়ারা সেইখানে জানবে যে আমি (ভগবান) আছি।’
শ্রীরামকৃষ্ণ—আহা! আহা!
অবতার বিষয়ে বিচারে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রবল আগ্রহ। একদিন গিরিশকে বলছেন, ‘তুমি নরেন্দ্রের সঙ্গে বিচার করে দেখো, সে কি বলে।’
গিরিশ (সহাস্য)—‘নরেন্দ্র বলে, ঈশ্বর অনন্ত। যা কিছু আমরা দেখি, শুনি,—জিনিসটি, কি ব্যক্তিটি—সব তাঁর অংশ, এ পর্যন্ত আমাদের বলবার জো নাই। Infinity (অনন্ত আকাশ) —তার আবার অংশ কি? অংশ হয় না।’
শ্রীরামকৃষ্ণ—‘ঈশ্বর অনন্ত হউন আর যত বড় হউন, —তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর ভিতরের সার বস্তু মানুষের ভিতর দিয়ে আসতে পারে ও আসে। তিনি অবতার হয়ে থাকেন, এটি উপমা দিয়ে বুঝান যায় না। অনুভব হওয়া চাই। প্রত্যক্ষ হওয়া চাই।
‘সেইরূপ প্রেমভক্তি শিখাইবার জন্য ঈশ্বর মানুষদেহ ধারণ করে সময়ে সময়ে অবতীর্ণ হন।’
‘তাঁর অবতারকে দেখলেই তাঁকে দেখা হল। যদি কেউ গঙ্গার কাছে গিয়ে গঙ্গাজল স্পর্শ করে, সে বলে—গঙ্গা দর্শন-স্পর্শন করে এলুম। সব গঙ্গাটা হরিদ্বার থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত, হাত দিয়ে ছুঁতে হয় না। (হাস্য)। ...ঈশ্বরতত্ত্ব যদি খোঁজ, মানুষে খুঁজবে। মানুষে তিনি বেশি প্রকাশ হন।’
ঈশ্বর এবং অবতার এক ও অভিন্ন
বিচিত্র এবং নিগূঢ় উপায়ে অবতার সমসময়ের কিছু সৌভাগ্যবান মানুষের কাছে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁদের বলা হয় অবতারের পরিকর, অন্তরঙ্গ বা পার্ষদ। সেকালের বেশ কিছু পণ্ডিত ও সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের দিব্য প্রভায় প্রভান্বিত হয়েছিলেন। যেমন—ভৈরব ব্রাহ্মণী, বৈষ্ণবচরণ, পদ্মলোচন এবং গৌরী পণ্ডিত শ্রীরামকৃষ্ণকে ঈশ্বরের অবতার বলে ঘোষণা করেছেন। গদাধরের ছেলেবেলায় কামারপুকুরের চিনু শাঁখারী (শ্রীনিবাস) সর্বপ্রথম ঈশ্বরাবতার বলে চিনে তাঁকে পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে পুজো করে নিজের অভিমত জানিয়ে ছিলেন। রানি রাসমণি ঠাকুরের মধ্যে অন্তর্যামীকে অনুভব করেছিলেন। মথুরামোহন বিশ্বাস তাঁর মধ্যে শিব এবং কালীকে দর্শন করেছিলেন। তাঁর গুরু ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাছে তিনি ছিলেন গৌরাঙ্গ। গোপালের মার কাছে গোপাল। স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের ভিতর নিজ আদর্শের পরাকাষ্ঠা দেখেছিলেন। তিনি একবার ঠাকুরের মধ্যে গোপীরাধাকে দর্শন করেন এবং সেই দর্শন তাঁকে বিশেষভাবে আলোড়িত করে। স্বামী তুরীয়ানন্দ পুরীতে জগন্নাথ বিগ্রহের স্থলে শ্রীরামকৃষ্ণকে উপবিষ্ট দেখেন। স্বামী শিবানন্দ বেনারসে বিশ্বনাথ মন্দিরে শিবমূর্তিতে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন। এক অত্যাশ্চর্য দর্শনে স্বামী অভেদানন্দ দেখেন, সব দেবদেবী ও অবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেহে লীন হয়ে যাচ্ছে। প্রথম দর্শনে মাস্টারমশাই ‘শ্রীম’-এর শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃত পরিবেশনকে মনে হয়েছিল যেন শুকদেব ভাগবত কথা অথবা শ্রীচৈতন্য হরিকথা কইছেন। কেশবচন্দ্র সেনের কাছে তিনি নাইনটিন্থ সেঞ্চুরীর চৈতন্য। ঈশান মুখোপাধ্যায় স্বীকার করেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণের কথা যেন জগন্মাতার মুখের বাণী। একদিন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী শ্রীরামকৃষ্ণকে বলেন, ‘আমি জানি আপনি কে।’ ঠাকুর ভাবস্থ অবস্থায় বলেন, ‘তা যদি হয়, তা-ই।’ উইলিয়াম নামে এক ভারতীয় খ্রিস্টান শ্রীরামকৃষ্ণকে একদিন বলেন, ‘আপনি স্বয়ং সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ ঈশ্বরপুত্র যিশুখ্রিস্ট।’
গুরু তোতাপুরী এবং জটাধারী জানতেন শ্রীরামকৃষ্ণকে। ঠাকুর বলেছেন, ‘আমার বাবা জানতেন আমার মধ্যে কে আছেন।’ গয়াধামে স্বপ্নে রঘুরীর তাঁকে দর্শন দিয়ে বলেন, ‘আমি তোমার পুত্র হব।’
স্বামী সারদানন্দের উপস্থাপনায় শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্ব
শ্রীরামকৃষ্ণ-জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনাকার স্বামী সারদানন্দ ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ’-গ্রন্থে শ্রীরামকৃষ্ণকে সর্বাধুনিক এবং সর্বোত্তম বিকশিত অবতার বলে প্রকাশ করেছেন। ‘লীলাপ্রসঙ্গ’ শব্দচয়নের মধ্যেই রয়েছে লীলাবিস্তার কাহিনির ইঙ্গিত। কার লীলা?—অবশ্যই ঈশ্বরাবতারের। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মহারাজজি শ্রীরামকৃষ্ণ জীবনে অবতারলীলার তত্ত্ব, লক্ষ্য, সৌষ্ঠব ও মাধুর্যকে আধুনিক যুগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশন করেছেন। তারই মধ্যে বিশেষ কিছু দিকদর্শনের কথা আমরা সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।
এক, উপরি-উক্ত গ্রন্থের পঞ্চম খণ্ডের ‘নিবেদন’ অংশে সারদানন্দজি পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন যে, ‘শ্রীরামকৃষ্ণরূপ জগন্মাতার জীবন-লীলা যখন প্রথম লিপিবদ্ধ করিতে আরম্ভ করি তখন আমরা এতদূর অগ্রসর হইতে পারিব, একথা কল্পনায় আনিতে পারি নাই।’ এ থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, সারদানন্দজির পূর্ণ প্রত্যয় ছিল, শ্রীরামকৃষ্ণ জগন্মাতারই অন্য এক রূপ ধারণ করে লীলা করেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ এই কথাকে স্বীকার করে বলেছেন, ‘আমার মনে হয় জগন্মাতা স্বয়ং এই শরীরে জন্ম নিয়ে এর মধ্যে ভক্তরূপে লীলা করছেন।’ অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘এর মধ্যে দুটি আছে (নিজেকে দেখিয়ে) এক, ভগবান, এবং অন্যটি ভক্ত।’
দুই, দৈবীভাব ও মানুষভাবের সুমিষ্ট মেলবন্ধনে হয় অবতার।
মানুষের মধ্যে অবতরণ করে তাঁকে মানুষের মতো আচার-আচরণ করতে হয়। তিনি অবতরণ করেন মানুষের উত্তরণের জন্য। তিনি নেমে আসেন, অন্যেরা উঠবে বলে। তিনি নেমে আসেন মানে কোথায় নেমে আসেন? এ নেমে আসা গোলোক, বৈকুণ্ঠ বা স্বর্গ থেকে নেমে আসা নয়। তিনি ষড়ৈশ্বর্যশালী হয়েও সমস্ত ঐশ্বর্য ঝেড়ে ফেলে অতি সাধারণ মানুষের মতো এসে থাকেন। সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নেমে ব্যবহার করার স্বাচ্ছন্দ্যকে বলা হয় নেমে আসা। যাতে সাধারণ মানুষ তাঁকে সাধারণ ভাবেই গ্রহণ করতে পারে, মেলামেশা করতে পারে, আপন করে নিতে পারে। জ্ঞান, শক্তি ইত্যাদি ঐশ্বর্য প্রকাশে মানুষ দূরে সরে যায়। আপনার হতে গেলে সঙ্গিসাথীদের মতো অতি সাধারণ হতে হয়। এভাবেই তিনি তাঁর মানুষভাবের দ্বারা সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করেন এবং পরে তাঁর দৈবশক্তি দিয়ে তাদের উত্তরণ ঘটান।
শুধুমাত্র দৈবশক্তির ঐশ্বর্য ধারণ ও প্রকাশে মানুষের কোনও উপকার হয় না। তিনি যদি শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী হয়ে গোলোকে কিংবা বৈকুণ্ঠে বাস করেন তাতে জগতের সুখদুঃখভাগী মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-দুর্দশা নিবারণে তাঁর কোনও ভূমিকা থাকে না। মানুষ ভগবানকে আপন করে নিতে চায়, ভালোবাসতে চায়। সেটি সম্ভব হয় ভগবানের দৈবীভাবের সঙ্গে মানুষভাব গ্রহণ এবং ঠিক ঠিক মানুষের মতো ব্যবহার কুশলতায়। নিখাদ চব্বিশ ক্যারেট সোনার বাট দিয়ে অলঙ্কার বা গহনা তৈরি করা যায় না। সোনাকে ব্যবহার্য হতে তাতে খাদ মেশাতে হয়। তখন তা ব্যবহার করা যায়, অলঙ্কার করা যায়, সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কাজে লাগে। ঠিক তেমনই শুধুমাত্র দৈবভাবে ভরপুর ঈশ্বরকে সাধারণ মানুষের কোনও প্রয়োজনে লাগত না যদি না তিনি মানবভাবের দ্বারা দৈবভাবকে আড়াল করে মানুষের মধ্যে অবতার হয়ে আসতেন।
তিন, উপরি-উক্ত বিষয়টি বোঝাতে স্বামী সারদানন্দ সাধকভাব শীর্ষক একটি পৃথক অধ্যায় রচনা করেছেন। সেখানে অবতারের জীবনেও সাধনার প্রয়োজনীয়তা বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, যদিও স্বয়ং ভগবান অবতার হয়ে জন্ম পরিগ্রহ করেন, তবু তাঁর স্বরূপ মানবভাবের প্রভাবে সর্বদা স্মরণে থাকে না, যদিও মাঝে মাঝে দৈবীভাব মানবসত্তাকে ছাড়িয়ে উঁকি দেয় এবং প্রকাশিত হয়। অবতার মানুষভাবের প্রেরণায় তীব্র ব্যাকুলতা সহায়ে সাধনে নিযুক্ত থেকে তাঁর দৈবীসত্তাকে যেন পুনরাবিষ্কার করেন। তিনি যখন মানুষভাবের প্রভাবে প্রবল আকুলতায় ঈশ্বর লাভের জন্য জগৎ এবং দেহবোধ পর্যন্ত ভুলে যান, এবং নিদারুণ যন্ত্রণা অনুভব করেন সে অবস্থা কোনওরকম ভান বা মিথ্যাচারণ নয়। তাহলে তাঁর সাধন ও সিদ্ধি মিথ্যা হতো এবং সেগুলি কখনওই মানবজাতিকে উৎসাহ দিয়ে সাধনে প্রবৃত্ত করত না এবং পরিশেষে জগৎকল্যাণ সাধন করত না। এভাবেই অবতারের মানুষভাব তাঁর দৈবীভাবকে আবিষ্কার করে এবং আয়ত্ত করে থাকে। তাঁর দৈবীভাব জগৎকে শিক্ষা দেয় কীভাবে মানবভাবকে অতিক্রম করে নিজ দৈবীসত্তায় প্রতিষ্ঠিত হতে হয়।
চার, পূর্বগ প্রাচীন অবতারদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধর্মের গ্লানি রোধ এবং ধর্মপ্রতিষ্ঠার উপায় হিসাবে হিংসা-দ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রভৃতির আশ্রয় নিতে হয়েছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে যুগ-আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তনে ধর্মস্থাপন উদ্দেশ্য একই থাকা সত্ত্বেও ধর্মস্থাপনের উপায়, প্রক্রিয়া বা প্রণালীর ক্ষেত্রে আধুনিক থেকে আধুনিকোত্তর, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর এবং চৈতন্যের বিকাশের তারতম্যে যুগে যুগে অবতার আত্মশক্তির অধিকতর স্ফুরণ ঘটিয়ে সমস্যাটির মোকাবিলা করেছেন। তারই সর্ব্বোচ্চ পরিস্ফুটন ঘটেছে শ্রীরামকৃষ্ণ-জীবনে।
পাঁচ, নতুন যুগের নতুন অবতার হলেও যুগপ্রয়োজনে সমাজের সমসময় এবং ভবিষ্য ভাবনার অগ্রদূত হিসাবে তিনি আধুনিক চিন্তাভাবনা দিয়ে গেলেও চিরন্তন ও শাশ্বত ধর্মবোধ, আধ্যাত্মিক অনুভব এবং মূল্যবোধের মধ্যে তাঁর শিকড় প্রোথিত থাকে। সনাতন সর্বকালিক ও সর্বদেশিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রে কখনওই তাঁরা শাস্ত্রমর্যাদা লঙ্ঘন করেন না। এভাবেই শ্রীরামকৃষ্ণজীবনকে শাস্ত্রানুমোদিত পথে অগ্রসর হতে লক্ষ করেছেন স্বামী সারদানন্দ। তারই সঙ্গে অনুষঙ্গ হিসাবে নতুন সভ্যতা ও সমাজ গঠনের বীজ যে আগাম উপ্ত করে যান সেটিও যথাযথ স্থানে নির্দেশ করতে ভোলেননি।
ছয়, অবতারের জন্ম, সাধন, তপস্যা, কৃচ্ছ্রসাধন প্রভৃতির ফলে সমগ্র জগতে আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে এক অপরিসীম বিবর্তন দেখা যায়। তার ফলে শুধুমাত্র ধর্ম ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে নয়, সমাজের সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক ও গভীর উন্নতি দেখা যায়। স্বামীজি বলেছেন যে, এবারে শ্রীরামকৃষ্ণ জগতের ব্রহ্মকুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করে গেছেন, যার ফলে সামান্য প্রচেষ্টাতেই এ যুগের মানুষ আধ্যাত্মিক উন্নতির শিখরে উঠতে সমর্থ হবে। ধর্মজীবনকে তাঁরা সহজ ও সুগম করে যান।
শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে ভাবের পরিবর্তন
নিজ অবতারত্ব প্রকাশের ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের ভিতর দু-ধরনের বিপরীত মনোভাবের প্রকাশ দেখা গেছে। গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং রামচন্দ্র দত্ত সর্বপ্রথম শ্রীরামকৃষ্ণকে অবতার বলে প্রকাশ করতে থাকেন। তাতে তিনি কখনও অসন্তোষ, বিরক্তি কিংবা অনীহা প্রকাশ করেছেন। বলতেন, ‘একজন ডাক্তার, আরেকজন থেটার (থিয়েটার) করে, তারা বলে অবতার! অবতারের তারা বোঝেটা কি?’ আবার যখন প্রকাশের সময় হয়েছে তিনি বিভিন্ন জনকে নিজ স্বরূপের ইঙ্গিত দিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করতেন—‘তোমার আমাকে কি বোধ হয়? আমার কত আনা জ্ঞান হয়েছে’ ইত্যাদি। এ প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে তিনি উক্ত ব্যক্তিদের মানসিক গঠন, আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং তাঁকে তারা কতটা বুঝতে সক্ষম হচ্ছে, তা বোঝবার চেষ্টা করতেন। কেশব সেন শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রচার করতে চাইলে, তিনি বলেছিলেন, ‘কেশব, তুমি কি প্রচার করবে, এর মধ্যে (নিজেকে দেখিয়ে) যিনি আছেন, তিনি প্রকাশিত হতে চাইলে হিমালয় পাহাড়টাও তাকে আড়াল করতে পারবে না।’
আবার দেখা যায়, তাঁর অন্ত্যলীলা কালে তিনি যেন নিজে থেকেই আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বলছেন, ‘সকলে টের পাচ্ছে?’ ‘এদের কিছু উন্নতি হচ্ছে’, ‘যখন এই-এই লক্ষণ দেখা যাবে, জানবে শরীর পাতের সময় হয়েছে’, ‘যাবার আগে হাটে হাড়ি ভেঙে দিয়ে যাব’ ইত্যাদি ইঙ্গিতপূর্ণ কথা। এসময়ে নরেন্দ্রনাথের মধ্যে শক্তিসঞ্চার, কালীপদ ঘোষ, বিনোদিনীকে ‘চৈতন্য হও’ বলে আশীর্বাদ করা ইত্যাদি ঘটনা সংগঠিত হতে দেখা যায়। কাশীপুরে অন্তরঙ্গদের একদিন বলছেন, ‘এখন এর মধ্যে (নিজের মধ্যে) এমন শক্তি অনুভব করছি যে নিজেকে আর কাউকে স্পর্শ করতে হবে না, তোদের কাউকে যদি বলি অমুককে স্পর্শ করে দে, তাতেই হয়ে যাবে।’ এমনই সময় উপস্থিত হলো ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারিতে সংগঠিত কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণের আত্মপ্রকাশে অভয়দানের অবিস্মরণীয় ঘটনা। প্রায় ত্রিশজন পুরুষ গৃহীভক্ত সেদিন শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপালাভে ধন্য ও কৃতার্থ হয়েছিলেন। নিজ নিজ অভীপ্সার পরাকাষ্ঠা সেদিন তাদের মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়েছিল। অবতার সামান্য মাত্র স্পর্শ, ভ্রুভঙ্গি এমনকী ইচ্ছামাত্রে অপরের জন্মজন্মান্তরের সমস্ত অশুভ সংস্কারকে বিদূরিত করে নবজীবন দান করতে পারেন। এ ক্ষমতা অন্য কোনও গুরু বা মহাত্মা তাঁরা যতই উন্নত পর্যায়ের হোন না কেন, তাঁদের থাকে না। তাই অবতারকে স্বামীজি ‘কপাল মোচন’ এবং শ্রীরামকৃষ্ণ ‘কর্মনাশা’ বলে অভিহিত করেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও কথায় ‘অবতার-প্রসঙ্গ’ একটি বিশেষ মাত্রা ও গতি এনেছে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ঈশ্বরতত্ত্ব অতি সহজে বুঝতে ও জীবনে কার্যকরী করতে অবতার-জীবনের অনুধ্যান, মনন ও বিশ্লেষণের চেয়ে প্রকৃষ্ট পন্থা আর নেই।
আড্ডায় তর্ক
শ্রীরামকৃষ্ণের সত্যান্বেষা ছিল অসীম। সত্যের শেষ না দেখে তিনি মাঝপথে কিছু ছেড়ে দেননি। তেমনই উৎসাহিত করেছেন বিপরীত ভাবনার মানুষজনকে।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলে তিন দিকপাল নাস্তিক, সন্দিগ্ধ, যুক্তিনিষ্ঠ, বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিত্ব হলেন—নরেন্দ্রনাথ, গিরিশচন্দ্র এবং ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার। তাঁরা কেউই ভক্ত ও বিশ্বাসী হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যাননি। কোনও তুকতাক, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ, মন্ত্র-তন্ত্র, বা ওষুধ গিলিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁদের আপন করে নেননি।
উক্ত তিনজনের তর্ক-প্রতর্ক, যুক্তিনিষ্ঠা, বিচার প্রবণতা এবং বৌদ্ধিক ক্ষমতা শ্রীরামকৃষ্ণকে অত্যন্ত আনন্দ দিত। আবার শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে তাঁরা দেখেছিলেন শিশুর সারল্য, সত্যে চরম আঁট, সত্যান্বেষীর অদম্য উদ্যম, নিরভিমানিতা, গভীর রসবোধ, অন্যের প্রতি প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসা এবং সর্বোপরি তাঁকে অস্বীকার করার চূড়ান্ত স্বাধীনতা প্রদানকারী এক আনন্দময় পুরুষকে।
শ্রীরামকৃষ্ণ বই-টই পড়েন না, মাস্টারমশাই প্রথম দর্শনে বৃন্দে ঝিয়ের মুখে সে কথা শুনে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছিলেন।
ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার একদিন (১৮৮৫, ২২ অক্টোবর) ভক্তদের বলছেন: ‘বই পড়লে এ-ব্যক্তির (পরমহংসদেবের) এত জ্ঞান হতো না। Faraday Communed with nature. প্রকৃতিকে ফ্যারাডে নিজে দর্শন করত, তাই অত Scientific Truth discover করতে পেরেছিল। বই পড়ে বিদ্যা হলে অত হত না। Mathematical formulae only throw the brain into confusion-original inquiry-র পথে বড় বিঘ্ন এনে দেয়। ডাক্তার যাকে ‘Original inquiry’ বলছেন, সেটি হল মৌলিকতা, সৃজনশীলতা। শ্রীরামকৃষ্ণ-জীবনের পদে পদে ছিল এই মৌলিকতা।
দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ। ১৮৮৫, ৭ মার্চ।
হঠাৎ শ্রীরামকৃষ্ণ গম্ভীর হলেন, যেন কী গুহ্যকথা বলবেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি)—এখানে অপর লোক কেউ নাই। সেদিন-হরিশ কাছে ছিল—দেখলাম—খোলটি—(দেহটি) ছেড়ে সচ্চিদানন্দ বাহিরে এল, এসে বললে, আমি যুগে যুগে অবতার! তখন ভাবলাম, বুঝি মনের খেয়ালে ওই সব কথা বলছি। তারপর চুপ করে থেকে দেখলাম—তখন দেখি আপনি বলছে, শক্তির আরাধনা চৈতন্যও করেছিল।
ভক্তেরা সকলে আবাক হয়ে শুনছেন। কেউ কেউ ভাবছেন—সচ্চিদানন্দ ভগবান কি শ্রীরামকৃষ্ণের রূপ ধারণ করে আমাদের কাছে বসে আছেন? ভগবান কি আবার অবতীর্ণ হয়েছেন?
শ্রীরামকৃষ্ণ কথা কইছেন। মাস্টারকে সম্বোধন করে আবার বলছেন—‘দেখলাম, পূর্ণ আবির্ভাব। তবে সত্ত্বগুণের ঐশ্বর্য।’
শ্রীরামকৃষ্ণ তর্কবিচারে উৎসাহ দেন সত্য কিন্তু যেখানে বিচার শুষ্ক নীরস এবং কথার কচকচানি, সেটা তাঁর মনপূত নয়। এরকম একটি চিত্র। মাস্টারমশাই লিখেছেন, ‘ডাক্তার বলছেন, ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আর আমাদের সকলের আত্মা (Soul) অনন্ত উন্নতি করবে। একজন আর একজনের চেয়ে বড়, একথা তিনি মানতে চাইছেন না। তাই অবতার মানছেন না।’
ডাক্তার—Infinite Progress তা যদি না হল তাহলে পাঁচ বছর সাত বছর আর বেঁচেই বা কি হবে! গলায় দড়ি দেব!
‘অবতার আবার কি! যে মানুষ হাগে মোতে তার পদানত হব। হাঁ, তবে Reflection of God’s Light (ঈশ্বরের জ্যোতি) মানুষে প্রকাশ হয়ে থাকে তা মানি।
শ্রীরামকৃষ্ণ—এ-সব যা কথা হচ্ছে, এ কিছুই নয়।
‘এ-সব বিকারের রোগীর খেয়াল। বিকারের রোগী বলেছিল—এক জালা জল খাব, এক হাঁড়ি ভাত খাব। বদ্যি বললে, আচ্ছা আচ্ছা খাবি। পথ্য পেয়ে যা বলবি তখন করা যাবে। ‘যতক্ষণ কাঁচা ঘি, ততক্ষণ কলকলানি শোনা যায়। পাকা হলে আর শব্দ থাকে না। যার যেমন মন, ঈশ্বরকে সেইরূপ দেখে। এক মজলিসি আড্ডার বিবরণ। মাস্টারমশাইয়ের নথি অর্থাৎ কথামৃত থেকে। দিনটি ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর। শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ।
শ্রীরামকৃষ্ণ (ঈশানের প্রতি)—তুমি কিছু বল না; এ (ডাক্তার) অবতার মানছে না।
ঈশান—আজ্ঞা, কী আর বিচার করব। বিচার আর ভালো লাগে না।
শ্রীরামকৃষ্ণ (বিরক্ত হইয়া)—কেন? সঙ্গত কথা বলবে না?
শ্রীরামকৃষ্ণ—(ডাক্তারের প্রতি)—ওইটুকু বুঝা শক্ত, তিনিই স্বরাট তিনিই বিরাট। যাঁরই নিত্য তাঁরই লীলা। তিনি মানুষ হতে পারেন না, এ-কথা জোর করে আমরা ক্ষুদ্র বুদ্
এ ধরনের অতীন্দ্রিয় প্রশ্নের উত্তরের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণের ভ্রাতুষ্পুত্র শিবরাম চট্টোপাধ্যায়ের সহজতম পন্থা সর্বজনবিদিত। তাঁর খুড়িমা শ্রীমা সারদা দেবীকে বিভিন্নজনে দেবী-ভগবতী ইত্যাদি বলে থাকেন। তিনি সেসব কথায় সিদ্ধান্ত না করে এক মোক্ষম ক্ষণে শ্রীশ্রীমাকে সেই প্রশ্নটি করে বসলেন। শিবুদাকে সঙ্গী করে মেঠো পথে চলেছেন শ্রীমা কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটি। অতর্কিতে মাঝপথে শিবুদা মাকে প্রশ্ন করেন—‘আজ আমাকে বলতে হবে, তুমি কে?’
শ্রীমা বলেন, ‘আমি আর কে? আমি তোর খুড়ি।’ উত্তরটি শিবুদার মোটেই মনঃপূত হয় না। রাগ-অভিমানে মাঠে পুঁটলি-প্যাঁটরা নিয়ে বসে পড়েন। বলেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে যাব না, তুমি একলাই যাও। ওই তো হোথা দেখা যাচ্ছে জয়রামবাটি।’
শ্রীমা বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এবং শেষে শিবুদার একগুয়ে নাছোড় প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘লোকে বলে কালী।’ এতেও শিবুদা তৃপ্ত নন। ‘লোকে কি বলে শুনতে চাই না, তুমি কী বল, আমায় বলতেই হবে।’ অবশেষে শ্রীমা স্বীকার করে বলেন, হ্যাঁ, তাই।’ এরপরেও মাকে দিয়ে শিবুদা তিনসত্য করিয়ে নিয়েছিলেন যে, শ্রীমা কালী। পরে জগৎ জেনেছে শ্রীমা কেবল কালী নন, তিনি সর্বদেবদেবী স্বরূপিণী। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণাবতারের লীলাসঙ্গিনী দেবী ভগবতী। হ্যাটস অব টু শিবুদা!
শিবুদার মতো অনেকেরই মনে হয় স্বয়ং তিনি বললেই তো হয়! এরকম ধারণা ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারও একদিন ব্যক্ত করেছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং নরেন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে। গীতাতেও বলা আছে ‘স্বয়ঞ্চৈব ব্রবীষী মে’—আপনি নিজ মুখে আমায় বলেছেন। ডাক্তার সরকারের সরল আকাঙ্ক্ষার উত্তরে ধুরন্ধর বুদ্ধিমান গিরিশবাবু বলে ওঠেন, ‘তিনি বললেই আপনি মেনে নেবেন? বলবেন, ‘শয়তান (devil) এসেছে, বলছে ভগবান।’ শেষ পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে অবতার চেনা বিষয়টি সহজ নয়। ঈশ্বরানুগ্রহে বহু সাধনার সিদ্ধিরূপ হল অবতারে বিশ্বাস। সে কথার অবতারণাই বর্তমান নিবন্ধের প্রতিপাদ্য।
ঈশ্বরের অস্তিত্বই যেখানে যুগে যুগে প্রশ্নাতীত নয়, সেখানে ‘অবতার’ অর্থাৎ ঈশ্বরের মানুষ হয়ে অবতাররূপে আসা যে এক চরম হেঁয়ালি মাত্র তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বেদে যাঁরা ঋষি বলে উল্লেখিত, দার্শনিক যুগে তাঁদের আধিকারিক পুরুষ বলে গণ্য করা হয়েছে, এবং তাঁরাই পৌরাণিক যুগে ঈশ্বরাবতার বলে গৃহীত হয়েছেন। সে ভাবনা জগতে যথারীতি আদৃত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে চলেছে। শুধু এদেশে নয়, সেমেটীয় ধর্মের মধ্যে যেমন, খ্রিস্টধর্মে যিশুখ্রিস্টকে ঈশ্বরপুত্র এবং ইসলামে হজরত মহম্মদকে প্রফেট বলে চিহ্নিত করা সনাতন ধর্মের অবতারবাদেরই নামান্তর মাত্র। সেমেটীয় ধর্মে যেখানে যিশুখ্রিস্ট কিংবা মহম্মদকে মাত্র একবার অবতরণের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সনাতন হিন্দুধর্মে অসংখ্যবার অবতারের আগমন সিদ্ধতা অর্জন করে আছে।
অবতার কে?
স্বয়ং ঈশ্বর যখন মানুষের জন্য মানুষের মধ্যে মানুষরূপে ধরায় অবতীর্ণ হন, তাঁকে ঈশ্বরাবতার বলা হয়। তাঁরই সংক্ষিপ্ত নাম ‘অবতার’। দর্শন রাজ্যে ভারতের ‘বেদ’ এক অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে চলেছে। ‘বেদ’-কে জ্ঞানভাণ্ডার এবং অপৌরুষেয় বলা হয়েছে। তা কোনও ব্যক্তির সৃষ্টি নয়। ব্যক্তি বা মানুষজীবন কখনওই ত্রুটিহীন, নিখাদ হয় না। অপৌরুষেয় তত্ত্বে সেটিকে সন্ধান করতে হবে। তাই বেদকে সর্বজ্ঞ বা সর্বজ্ঞের মতো বলা হয়েছে। মানবীয় দুর্বলতা পরিহারের অত্যদ্ভূত ধারণা থেকে বেদের প্রামাণ্য অবিসংবাদীরূপে স্বতঃসিদ্ধ বলে ভারতীয় দর্শনে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদে স্বীকৃত এবং গ্রাহ্য।
পৌরাণিক যুগ ও অবতার ধারণা
বেদ পরবর্তী যুগে দেখা গেল দার্শনিক যুগ এবং তারপর পৌরাণিক যুগের সূচনা। বেদের জ্ঞান ও কর্মকাণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের মনের ভালোবাসার প্রস্রবণকে সত্যাবিষ্কারে নিযুক্ত করে মুনি-ঋষি ও সাধকেরা খুঁজে পেলেন ভক্তিরসের অতল অতি মিষ্টরসের অফুরন্ত ভাণ্ডার। তাতে অবগাহন করে ভারত পেল ব্যাসদেব রচিত ভক্তিশাস্ত্রের চূড়ামণি শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থ। শাণ্ডিল্য ও নারদের ভক্তিসূত্র, ভক্তিরসায়ন, ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ইত্যাদি একের পর এক শ্রীভগবানের রূপ-গুণ ও তত্ত্বের বর্ণনায় মহিমান্বিত সব কালজয়ী গ্রন্থ।
এরই মধ্যে পূর্ববর্তী ঈশ্বরাবতারদের জীবন ও কর্ম নিয়ে যেমন ‘রামায়ণ’ রচিত হয়েছে এবং তাকে মূল করেই শতাধিক রামায়ণ জগতের বিভিন্ন দেশে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং সেগুলি বর্তমানে উপলব্ধও হচ্ছে। এছাড়া, ১৮টি পুরাণ গ্রন্থ এবং ১৮টি উপপুরাণ লিখিত হয়েছে। সবই ভক্তিরসাশ্রিত ভাবতত্ত্বের কাহিনি, গল্প এবং গভীর তত্ত্বে সমৃদ্ধ।
মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যকে উপজীব্য করে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’, ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত’, ইত্যাদি গ্রন্থ পূর্বোক্ত ভক্তিপথকে অবলম্বন করে সমাজজীবনকে জীবন্ত রেখেছে।
শুধু ভারতে নয়, জেরুজালেমের প্যালেস্তাইনে জন্মে ভগবান যিশু তাঁর সহিষ্ণুতা ও করুণা প্রদর্শনে জগৎকে বিস্মিত করে শুধু ঈশ্বরপুত্র হিসাবে নয়, স্বয়ং ঈশ্বররূপে সর্বত্র পূজিত হচ্ছেন। তাঁর অলৌকিক জীবন ও উপদেশ জীবনযুদ্ধে শ্রান্ত-ক্লান্ত-বিষণ্ণ পথহারা সুবিপুল মানুষকে শান্তির পথে আহ্বান করছে। পরিত্রাতা হিসাবে জগতের বিরাট সংখ্যক আর্দ্রহৃদয় মানুষ ভগবান যিশুর মধ্যে তাদের ঈশ্বরপুত্রকে খুঁজে পরিত্রাণের পথ পাচ্ছে। সে-ও এক ভক্তি আন্দোলনের লীলা কথন।
অবতারের আগমনের কারণ
বেদের নির্গুণ-নিরাকার ব্রহ্মের ধারণা ভক্তিবাদে সগুণ-সাকার ধারণায় পর্যবসিত হয় ভক্তের তীব্র আকুলতা এবং ঈশ্বরের অসীম অনুকম্পায় সেটি সংসাধিত হয়। নির্গুণ-নিরাকার ব্রহ্ম মায়াপোহিত হয়ে সগুণ-সাকার হন। জ্ঞানে নির্গুণ-নিরাকার, ভক্তিহিমে জমে বরফের সাকার রূপ ধারণ।
সর্বশক্তিমান ভগবানের জীবজগতের কল্যাণের জন্য নরদেহধারণ করে আবির্ভূত হওয়া জগতের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক বিরল ঘটনা। কালপ্রভাবে যখন জগৎ পাপভারে আক্রান্ত হয়, তখন তিনি দয়াপরবশ হয়ে যেন নিজ কর্তব্যবোধে জগতে অবতীর্ণ হন ধর্মের গ্লানি দূর করবার জন্য। এই সরল সত্যটি শ্রীরামকৃষ্ণ সহজবোধ্য লৌকিক দৃষ্টান্তের সাহায্যে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জমিদারীর কোনও তালুকে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে জমিদার (ঈশ্বর) তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ লাঠিয়াল গোলোক চৌধুরীকে সেখানে শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপনের জন্য পাঠিয়ে দেন। ধর্মপ্রসারের যে সব বাধার সৃষ্টি হয় সে সব অবতার নানাভাবে অপসারিত করে ধর্মের স্রোতকে আবিলতামুক্ত করে দেন। এই হয়ে আসছে যুগে যুগে। অবতারতত্ত্বে যুগপ্রয়োজন একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য নির্ধারক। প্রত্যেক যুগের অবতারকে সেজন্য যুগাবতার বলে আখ্যা দেওয়া হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ সুস্পষ্ট করে বলেছেন, ‘নবাবী আমলের মুদ্রা বাদশাহী আমলে চলে না।’
শুধু ধর্মগ্রন্থে হয় না, আদর্শ জীবনের প্রয়োজন। তাই ভগবান আসেন, নিজে আচরণ করে শাস্ত্রের মর্যাদা দেন, যুগধর্মের আদর্শ দেখান, ধর্মভাব জগতে প্রচার করেন। তাঁর জীবনাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে লোক ধর্মমার্গ অনুসরণ করে। এভাবে শ্রীভগবান জগতে ধর্মসংস্থাপন করেন। যুগে যুগে এই হয়ে আসছে।
অবতার এক পরম রহস্য
ভগবান অজ, জন্মরহিত; তার জন্ম হতে পারে না। তবু তিনি নিজ মায়াশক্তি অবলম্বন করে দেহধারী হন, অবতরণ করেন। কেন যে তিনি জীবের দুঃখে দুঃখিত হয়ে জীবগণকে দুঃখ পারাবার থেকে ত্রাণ করবার জন্য অবতীর্ণ হন এটিই পরম রহস্য।
অবতার না হলে মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় না
নির্বিশেষ ঈশ্বর তত্ত্ব সকলে ধারণা করতে পারে না। নির্গুণ-নিরাকার ব্রহ্ম জ্ঞানীদের পক্ষে। ভক্তের অবতার চাই। অবতার মায়ার রাজ্যে, চিৎশক্তির এলাকায় যাওয়া। সাধারণ মানুষের ভূমিতে বিচরণ। সহজ-সরল বাতাবরণে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, লীলা ধরে ধরে নিত্যে যেতে হয়, যেমন সিঁড়ি ধরে ধরে ছাদে ওঠা। নিত্য-দর্শনের পর নিত্য থেকে লীলায় এসে থাকতে হয়। ভক্তি-ভক্ত নিয়ে থাকা—এইটি পাকা মত।
‘তাঁর নানারূপ, নানালীলা—ঈশ্বরলীলা, দেবলীলা, নরলীলা, জগৎলীলা। তিনি মানুষ হয়ে অবতার হয়ে যুগে যুগে আসেন, প্রেমভক্তি শিখাবার জন্য। দেখ না চৈতন্যদেব। তাঁর অবতারত্বে প্রেম-ভক্তি আস্বাদন করা যায়। তাঁর অনন্ত লীলা—কিন্তু আমার দরকার প্রেম, ভক্তি। আমার ক্ষীরটুকু দরকার। গাভীর বাঁট দিয়েই ক্ষীর আসে। অবতার গাভীর বাঁট।’
‘অবতার—যিনি তারণ করেন। তা দশ অবতার আছে, চব্বিশ অবতার আছে আবার অসংখ্য অবতার আছে।’
‘এই ভুবনমোহিনী মায়ায় সকলে মুগ্ধ। ঈশ্বর দেহধারণ করেছেন—তিনিও মুগ্ধ হন। রাম সীতার জন্য কেঁদে কেঁদে বেড়িয়েছিল। পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে।’
‘তবে একটি কথা আছে, —ঈশ্বর মনে করলেই মুক্ত হন।’
‘তবে অবতার ইচ্ছা করে নিজের চোখে কাপড় বাঁধে। যেমন ছেলেরা কানামাছি খেলে। কিন্তু মা ডাকলেই খেলা থামায়।’
কয়েকটি ঘটনাচিত্র
১ মার্চ ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ। দোলযাত্রার দিন। নরেন্দ্রাদি ভক্তগণ এসেছেন। ওইদিনে ঠাকুর নরেন্দ্রকে বলছেন, ‘গিরিশ ঘোষ যা বলে, তোর সঙ্গে কি মিলল?’
নরেন্দ্র—‘আমি কিছু বলি নাই, তিনিই বলেন তাঁর অবতার বলে বিশ্বাস। আমি আর কিছু বললুম না।’
শ্রীরামকৃষ্ণ—কিন্তু খুব বিশ্বাস! দেখেছিস?
কিছুদিন পরে নরেন্দ্রের সঙ্গে ঠাকুরের অবতার বিষয়ের কথা হল। ঠাকুর বলছেন, ‘আচ্ছা, কেউ কেউ যে আমাকে ঈশ্বরের অবতার বলে, তোর কি বোধ হয়?’
নরেন্দ্র বলেন, ‘অন্যের মত শুনে আমি কিছু করব না, আমি নিজে যখন বুঝব, নিজের যখন বিশ্বাস হবে, তখনই বলব।’
কাশীপুরে ঠাকুর যখন ক্যান্সারের যন্ত্রণায় অস্থির, ভাতের তরল মণ্ড পর্যন্ত গলাধঃকরণ হচ্ছে না, তখন একদিন নরেন্দ্র ঠাকুরের কাছে বসে ভাবছেন, এই যন্ত্রণার মধ্যে যদি বলেন যে, আমি সেই ঈশ্বরের অবতার তাহলে বিশ্বাস হয়। চকিতের মধ্যে ঠাকুর বলছেন, ‘যে রাম যে কৃষ্ণ, ইদানীং সে-ই রামকৃষ্ণরূপে ভক্তের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।’ নরেন্দ্র এই কথা শুনে অবাক হয়ে রইলেন। পরবর্তী সময়ে নরেন্দ্র কীরকম বুঝেছিলেন, তার সামান্য নিদর্শন ৩ মার্চ, ১৮৯০ গাজীপুর থেকে প্রমদাবাবুকে হৃদয় উন্মুক্ত করে লিখলেন:
‘আর কোন মিঞার কাছে যাইব না—
এখন সিদ্ধান্ত এই যে—রামকৃষ্ণের জুড়ি আর নাই, সে অপূর্ব সিদ্ধি, আর অপূর্ব অহেতুকী দয়া, সে intense sympathy (প্রগাঢ় সহানুভূতি) বদ্ধ জীবনের জন্য—এ জগতে আর নাই।’
‘তাঁহার জীবদ্দশায় তিনি কখনো আমার প্রার্থনা গরমঞ্জুর করেন নাই—আমার লক্ষ অপরাধ ক্ষমা করিয়াছেন—এত ভালবাসা আমার পিতামাতায় কখনো বাসেন নাই। ইহা কবিত্ব নহে, অতিরঞ্জিত নহে, ইহা কঠোর সত্য এবং তাঁহার শিষ্যমাত্রেই জানে। বিপদে, প্রলোভনে ‘ভগবান রক্ষা কর’ বলিয়া কাঁদিয়া সারা হইয়াছি—কেহই উত্তর দেয় নাই—কিন্তু এই অদ্ভুত মহাপুরুষ বা অবতার বা যাই হউন, নিজ অন্তর্যামিত্বগুণে আমার সকল বেদনা জানিয়া নিজে ডাকিয়া জোর করিয়া সকল অপহৃত করিয়াছেন।
‘ভায়া, রামকৃষ্ণ পরমহংস যে ভগবানের বাবা, তাতে আমার সন্দেহমাত্র নাই; তবে তিনি কী বলতেন, লোককে দেখতে দাও; তুমি জোর করে কি দেখাতে পারো? এইমাত্র আমার objection (আপত্তি)।’
‘লোকে বলুক, আমরা কি বলব? দাদা, বেদ-বেদান্ত পুরাণ-ভাগবতে যে কি আছে, তা রামকৃষ্ণ পরমহংসকে না পড়লে কিছুতেই বুঝা যাবে না।’
শ্রীরামকৃষ্ণ (১৮৮৪, ৯-মার্চ) ভক্তদের বলছেন—‘দেখ, এই হাতে লাগার দরুণ আমার স্বভাব উল্টে যাচ্ছে। এখন মানুষের ভিতর ঈশ্বরের বেশি প্রকাশ দেখিয়ে দিচ্ছে। যেন বলছে আমি মানুষের ভিতর রইচি, তুমি মানুষ নিয়ে আনন্দ কর।’
‘তিনি শুদ্ধভক্তের ভিতর বেশি প্রকাশ—তাই নরেন্দ্র, রাখাল এদের জন্য এত ব্যাকুল হই।’
‘এমন আছে যে শালগ্রাম হতেও বড় মানুষ। ‘নরনারায়ণ’।
‘প্রতিমাতে তাঁর আবির্ভাব হয়, আর মানুষে হবে না?’
‘তিনি নরলীলা করবার জন্য মানুষের ভিতর অবতীর্ণ হন, যেমন-রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্যদেব। অবতারকে চিন্তা করলেই তাঁর চিন্তা করা হয়।’
[১৮৮৩, ২০ ডিসেম্বর] শ্রীরামকৃষ্ণ—‘ঈশ্বর নরলীলা করেন।’ বলরামের পিতা প্রভৃতি ভক্তদের বলছেন।
‘মানুষে তিনি অবতীর্ণ হন, যেমন শ্রীকৃষ্ণ, রামচন্দ্র, চৈতন্যদেব।
‘আমি কেশব সেনকে বলেছিলাম যে, মানুষের ভিতর তিনি বেশি প্রকাশ। মঠের আলের ভিতর ছোট ছোট গর্ত থাকে; তাদের বলে ‘ঘুটী’। ঘুটীর ভিতর মাছ, কাঁকড়া জমে থাকে। মাছ কাঁকড়া খুঁজতে গেলে ওই ঘুটীর ভিতর খুঁজতে হয়; ঈশ্বরকে খুঁজতে হলে অবতারের ভিতর খুঁজতে হয়।’
‘ওই চৌদ্দপোয়া মানুষের ভিতরে জগন্মাতা প্রকাশ হন। গানে আছে—
শ্যামা মা কি কল করেছে!
চৌদ্দপোয়া কলের ভিতরি কত রঙ্গ দেখাতেছে!—ইত্যাদি।
অবতারকে চেনার উপায়
‘কিন্তু ঈশ্বরকে জানতে হলে, অবতারকে চিনতে গেলে, সাধনের প্রয়োজন। দীঘিতে বড় বড় মাছ আছে, চার ফেলতে হয়। দুধেতে মাখন আছে, মন্থন করতে হয়। সরিষার ভিতর তেল আছে, সরিষাকে পিষতে হয়। মেথিতে হাত রাঙা হয়, মেথি বাটতে হয়।’
[১৮৮৪, ৯ নভেম্বর]
লক্ষণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন—ভগবানকে কোথা-কোথা দর্শন হতে পারে। রাম অনেক কথা বলে তারপর বললেন—‘ভাই, যে মানুষে উর্জিতা ভক্তি দেখতে পাবে—হাসে, কাঁদে, নাচে, গায়, —প্রেমে মাতোয়ারা সেইখানে জানবে যে আমি (ভগবান) আছি।’
শ্রীরামকৃষ্ণ—আহা! আহা!
অবতার বিষয়ে বিচারে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রবল আগ্রহ। একদিন গিরিশকে বলছেন, ‘তুমি নরেন্দ্রের সঙ্গে বিচার করে দেখো, সে কি বলে।’
গিরিশ (সহাস্য)—‘নরেন্দ্র বলে, ঈশ্বর অনন্ত। যা কিছু আমরা দেখি, শুনি,—জিনিসটি, কি ব্যক্তিটি—সব তাঁর অংশ, এ পর্যন্ত আমাদের বলবার জো নাই। Infinity (অনন্ত আকাশ) —তার আবার অংশ কি? অংশ হয় না।’
শ্রীরামকৃষ্ণ—‘ঈশ্বর অনন্ত হউন আর যত বড় হউন, —তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর ভিতরের সার বস্তু মানুষের ভিতর দিয়ে আসতে পারে ও আসে। তিনি অবতার হয়ে থাকেন, এটি উপমা দিয়ে বুঝান যায় না। অনুভব হওয়া চাই। প্রত্যক্ষ হওয়া চাই।
‘সেইরূপ প্রেমভক্তি শিখাইবার জন্য ঈশ্বর মানুষদেহ ধারণ করে সময়ে সময়ে অবতীর্ণ হন।’
‘তাঁর অবতারকে দেখলেই তাঁকে দেখা হল। যদি কেউ গঙ্গার কাছে গিয়ে গঙ্গাজল স্পর্শ করে, সে বলে—গঙ্গা দর্শন-স্পর্শন করে এলুম। সব গঙ্গাটা হরিদ্বার থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত, হাত দিয়ে ছুঁতে হয় না। (হাস্য)। ...ঈশ্বরতত্ত্ব যদি খোঁজ, মানুষে খুঁজবে। মানুষে তিনি বেশি প্রকাশ হন।’
ঈশ্বর এবং অবতার এক ও অভিন্ন
বিচিত্র এবং নিগূঢ় উপায়ে অবতার সমসময়ের কিছু সৌভাগ্যবান মানুষের কাছে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁদের বলা হয় অবতারের পরিকর, অন্তরঙ্গ বা পার্ষদ। সেকালের বেশ কিছু পণ্ডিত ও সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের দিব্য প্রভায় প্রভান্বিত হয়েছিলেন। যেমন—ভৈরব ব্রাহ্মণী, বৈষ্ণবচরণ, পদ্মলোচন এবং গৌরী পণ্ডিত শ্রীরামকৃষ্ণকে ঈশ্বরের অবতার বলে ঘোষণা করেছেন। গদাধরের ছেলেবেলায় কামারপুকুরের চিনু শাঁখারী (শ্রীনিবাস) সর্বপ্রথম ঈশ্বরাবতার বলে চিনে তাঁকে পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে পুজো করে নিজের অভিমত জানিয়ে ছিলেন। রানি রাসমণি ঠাকুরের মধ্যে অন্তর্যামীকে অনুভব করেছিলেন। মথুরামোহন বিশ্বাস তাঁর মধ্যে শিব এবং কালীকে দর্শন করেছিলেন। তাঁর গুরু ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাছে তিনি ছিলেন গৌরাঙ্গ। গোপালের মার কাছে গোপাল। স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের ভিতর নিজ আদর্শের পরাকাষ্ঠা দেখেছিলেন। তিনি একবার ঠাকুরের মধ্যে গোপীরাধাকে দর্শন করেন এবং সেই দর্শন তাঁকে বিশেষভাবে আলোড়িত করে। স্বামী তুরীয়ানন্দ পুরীতে জগন্নাথ বিগ্রহের স্থলে শ্রীরামকৃষ্ণকে উপবিষ্ট দেখেন। স্বামী শিবানন্দ বেনারসে বিশ্বনাথ মন্দিরে শিবমূর্তিতে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন। এক অত্যাশ্চর্য দর্শনে স্বামী অভেদানন্দ দেখেন, সব দেবদেবী ও অবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেহে লীন হয়ে যাচ্ছে। প্রথম দর্শনে মাস্টারমশাই ‘শ্রীম’-এর শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃত পরিবেশনকে মনে হয়েছিল যেন শুকদেব ভাগবত কথা অথবা শ্রীচৈতন্য হরিকথা কইছেন। কেশবচন্দ্র সেনের কাছে তিনি নাইনটিন্থ সেঞ্চুরীর চৈতন্য। ঈশান মুখোপাধ্যায় স্বীকার করেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণের কথা যেন জগন্মাতার মুখের বাণী। একদিন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী শ্রীরামকৃষ্ণকে বলেন, ‘আমি জানি আপনি কে।’ ঠাকুর ভাবস্থ অবস্থায় বলেন, ‘তা যদি হয়, তা-ই।’ উইলিয়াম নামে এক ভারতীয় খ্রিস্টান শ্রীরামকৃষ্ণকে একদিন বলেন, ‘আপনি স্বয়ং সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ ঈশ্বরপুত্র যিশুখ্রিস্ট।’
গুরু তোতাপুরী এবং জটাধারী জানতেন শ্রীরামকৃষ্ণকে। ঠাকুর বলেছেন, ‘আমার বাবা জানতেন আমার মধ্যে কে আছেন।’ গয়াধামে স্বপ্নে রঘুরীর তাঁকে দর্শন দিয়ে বলেন, ‘আমি তোমার পুত্র হব।’
স্বামী সারদানন্দের উপস্থাপনায় শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্ব
শ্রীরামকৃষ্ণ-জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনাকার স্বামী সারদানন্দ ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ’-গ্রন্থে শ্রীরামকৃষ্ণকে সর্বাধুনিক এবং সর্বোত্তম বিকশিত অবতার বলে প্রকাশ করেছেন। ‘লীলাপ্রসঙ্গ’ শব্দচয়নের মধ্যেই রয়েছে লীলাবিস্তার কাহিনির ইঙ্গিত। কার লীলা?—অবশ্যই ঈশ্বরাবতারের। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মহারাজজি শ্রীরামকৃষ্ণ জীবনে অবতারলীলার তত্ত্ব, লক্ষ্য, সৌষ্ঠব ও মাধুর্যকে আধুনিক যুগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশন করেছেন। তারই মধ্যে বিশেষ কিছু দিকদর্শনের কথা আমরা সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।
এক, উপরি-উক্ত গ্রন্থের পঞ্চম খণ্ডের ‘নিবেদন’ অংশে সারদানন্দজি পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন যে, ‘শ্রীরামকৃষ্ণরূপ জগন্মাতার জীবন-লীলা যখন প্রথম লিপিবদ্ধ করিতে আরম্ভ করি তখন আমরা এতদূর অগ্রসর হইতে পারিব, একথা কল্পনায় আনিতে পারি নাই।’ এ থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, সারদানন্দজির পূর্ণ প্রত্যয় ছিল, শ্রীরামকৃষ্ণ জগন্মাতারই অন্য এক রূপ ধারণ করে লীলা করেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ এই কথাকে স্বীকার করে বলেছেন, ‘আমার মনে হয় জগন্মাতা স্বয়ং এই শরীরে জন্ম নিয়ে এর মধ্যে ভক্তরূপে লীলা করছেন।’ অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘এর মধ্যে দুটি আছে (নিজেকে দেখিয়ে) এক, ভগবান, এবং অন্যটি ভক্ত।’
দুই, দৈবীভাব ও মানুষভাবের সুমিষ্ট মেলবন্ধনে হয় অবতার।
মানুষের মধ্যে অবতরণ করে তাঁকে মানুষের মতো আচার-আচরণ করতে হয়। তিনি অবতরণ করেন মানুষের উত্তরণের জন্য। তিনি নেমে আসেন, অন্যেরা উঠবে বলে। তিনি নেমে আসেন মানে কোথায় নেমে আসেন? এ নেমে আসা গোলোক, বৈকুণ্ঠ বা স্বর্গ থেকে নেমে আসা নয়। তিনি ষড়ৈশ্বর্যশালী হয়েও সমস্ত ঐশ্বর্য ঝেড়ে ফেলে অতি সাধারণ মানুষের মতো এসে থাকেন। সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নেমে ব্যবহার করার স্বাচ্ছন্দ্যকে বলা হয় নেমে আসা। যাতে সাধারণ মানুষ তাঁকে সাধারণ ভাবেই গ্রহণ করতে পারে, মেলামেশা করতে পারে, আপন করে নিতে পারে। জ্ঞান, শক্তি ইত্যাদি ঐশ্বর্য প্রকাশে মানুষ দূরে সরে যায়। আপনার হতে গেলে সঙ্গিসাথীদের মতো অতি সাধারণ হতে হয়। এভাবেই তিনি তাঁর মানুষভাবের দ্বারা সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করেন এবং পরে তাঁর দৈবশক্তি দিয়ে তাদের উত্তরণ ঘটান।
শুধুমাত্র দৈবশক্তির ঐশ্বর্য ধারণ ও প্রকাশে মানুষের কোনও উপকার হয় না। তিনি যদি শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী হয়ে গোলোকে কিংবা বৈকুণ্ঠে বাস করেন তাতে জগতের সুখদুঃখভাগী মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-দুর্দশা নিবারণে তাঁর কোনও ভূমিকা থাকে না। মানুষ ভগবানকে আপন করে নিতে চায়, ভালোবাসতে চায়। সেটি সম্ভব হয় ভগবানের দৈবীভাবের সঙ্গে মানুষভাব গ্রহণ এবং ঠিক ঠিক মানুষের মতো ব্যবহার কুশলতায়। নিখাদ চব্বিশ ক্যারেট সোনার বাট দিয়ে অলঙ্কার বা গহনা তৈরি করা যায় না। সোনাকে ব্যবহার্য হতে তাতে খাদ মেশাতে হয়। তখন তা ব্যবহার করা যায়, অলঙ্কার করা যায়, সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কাজে লাগে। ঠিক তেমনই শুধুমাত্র দৈবভাবে ভরপুর ঈশ্বরকে সাধারণ মানুষের কোনও প্রয়োজনে লাগত না যদি না তিনি মানবভাবের দ্বারা দৈবভাবকে আড়াল করে মানুষের মধ্যে অবতার হয়ে আসতেন।
তিন, উপরি-উক্ত বিষয়টি বোঝাতে স্বামী সারদানন্দ সাধকভাব শীর্ষক একটি পৃথক অধ্যায় রচনা করেছেন। সেখানে অবতারের জীবনেও সাধনার প্রয়োজনীয়তা বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, যদিও স্বয়ং ভগবান অবতার হয়ে জন্ম পরিগ্রহ করেন, তবু তাঁর স্বরূপ মানবভাবের প্রভাবে সর্বদা স্মরণে থাকে না, যদিও মাঝে মাঝে দৈবীভাব মানবসত্তাকে ছাড়িয়ে উঁকি দেয় এবং প্রকাশিত হয়। অবতার মানুষভাবের প্রেরণায় তীব্র ব্যাকুলতা সহায়ে সাধনে নিযুক্ত থেকে তাঁর দৈবীসত্তাকে যেন পুনরাবিষ্কার করেন। তিনি যখন মানুষভাবের প্রভাবে প্রবল আকুলতায় ঈশ্বর লাভের জন্য জগৎ এবং দেহবোধ পর্যন্ত ভুলে যান, এবং নিদারুণ যন্ত্রণা অনুভব করেন সে অবস্থা কোনওরকম ভান বা মিথ্যাচারণ নয়। তাহলে তাঁর সাধন ও সিদ্ধি মিথ্যা হতো এবং সেগুলি কখনওই মানবজাতিকে উৎসাহ দিয়ে সাধনে প্রবৃত্ত করত না এবং পরিশেষে জগৎকল্যাণ সাধন করত না। এভাবেই অবতারের মানুষভাব তাঁর দৈবীভাবকে আবিষ্কার করে এবং আয়ত্ত করে থাকে। তাঁর দৈবীভাব জগৎকে শিক্ষা দেয় কীভাবে মানবভাবকে অতিক্রম করে নিজ দৈবীসত্তায় প্রতিষ্ঠিত হতে হয়।
চার, পূর্বগ প্রাচীন অবতারদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধর্মের গ্লানি রোধ এবং ধর্মপ্রতিষ্ঠার উপায় হিসাবে হিংসা-দ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রভৃতির আশ্রয় নিতে হয়েছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে যুগ-আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তনে ধর্মস্থাপন উদ্দেশ্য একই থাকা সত্ত্বেও ধর্মস্থাপনের উপায়, প্রক্রিয়া বা প্রণালীর ক্ষেত্রে আধুনিক থেকে আধুনিকোত্তর, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর এবং চৈতন্যের বিকাশের তারতম্যে যুগে যুগে অবতার আত্মশক্তির অধিকতর স্ফুরণ ঘটিয়ে সমস্যাটির মোকাবিলা করেছেন। তারই সর্ব্বোচ্চ পরিস্ফুটন ঘটেছে শ্রীরামকৃষ্ণ-জীবনে।
পাঁচ, নতুন যুগের নতুন অবতার হলেও যুগপ্রয়োজনে সমাজের সমসময় এবং ভবিষ্য ভাবনার অগ্রদূত হিসাবে তিনি আধুনিক চিন্তাভাবনা দিয়ে গেলেও চিরন্তন ও শাশ্বত ধর্মবোধ, আধ্যাত্মিক অনুভব এবং মূল্যবোধের মধ্যে তাঁর শিকড় প্রোথিত থাকে। সনাতন সর্বকালিক ও সর্বদেশিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রে কখনওই তাঁরা শাস্ত্রমর্যাদা লঙ্ঘন করেন না। এভাবেই শ্রীরামকৃষ্ণজীবনকে শাস্ত্রানুমোদিত পথে অগ্রসর হতে লক্ষ করেছেন স্বামী সারদানন্দ। তারই সঙ্গে অনুষঙ্গ হিসাবে নতুন সভ্যতা ও সমাজ গঠনের বীজ যে আগাম উপ্ত করে যান সেটিও যথাযথ স্থানে নির্দেশ করতে ভোলেননি।
ছয়, অবতারের জন্ম, সাধন, তপস্যা, কৃচ্ছ্রসাধন প্রভৃতির ফলে সমগ্র জগতে আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে এক অপরিসীম বিবর্তন দেখা যায়। তার ফলে শুধুমাত্র ধর্ম ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে নয়, সমাজের সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক ও গভীর উন্নতি দেখা যায়। স্বামীজি বলেছেন যে, এবারে শ্রীরামকৃষ্ণ জগতের ব্রহ্মকুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করে গেছেন, যার ফলে সামান্য প্রচেষ্টাতেই এ যুগের মানুষ আধ্যাত্মিক উন্নতির শিখরে উঠতে সমর্থ হবে। ধর্মজীবনকে তাঁরা সহজ ও সুগম করে যান।
শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে ভাবের পরিবর্তন
নিজ অবতারত্ব প্রকাশের ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের ভিতর দু-ধরনের বিপরীত মনোভাবের প্রকাশ দেখা গেছে। গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং রামচন্দ্র দত্ত সর্বপ্রথম শ্রীরামকৃষ্ণকে অবতার বলে প্রকাশ করতে থাকেন। তাতে তিনি কখনও অসন্তোষ, বিরক্তি কিংবা অনীহা প্রকাশ করেছেন। বলতেন, ‘একজন ডাক্তার, আরেকজন থেটার (থিয়েটার) করে, তারা বলে অবতার! অবতারের তারা বোঝেটা কি?’ আবার যখন প্রকাশের সময় হয়েছে তিনি বিভিন্ন জনকে নিজ স্বরূপের ইঙ্গিত দিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করতেন—‘তোমার আমাকে কি বোধ হয়? আমার কত আনা জ্ঞান হয়েছে’ ইত্যাদি। এ প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে তিনি উক্ত ব্যক্তিদের মানসিক গঠন, আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং তাঁকে তারা কতটা বুঝতে সক্ষম হচ্ছে, তা বোঝবার চেষ্টা করতেন। কেশব সেন শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রচার করতে চাইলে, তিনি বলেছিলেন, ‘কেশব, তুমি কি প্রচার করবে, এর মধ্যে (নিজেকে দেখিয়ে) যিনি আছেন, তিনি প্রকাশিত হতে চাইলে হিমালয় পাহাড়টাও তাকে আড়াল করতে পারবে না।’
আবার দেখা যায়, তাঁর অন্ত্যলীলা কালে তিনি যেন নিজে থেকেই আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বলছেন, ‘সকলে টের পাচ্ছে?’ ‘এদের কিছু উন্নতি হচ্ছে’, ‘যখন এই-এই লক্ষণ দেখা যাবে, জানবে শরীর পাতের সময় হয়েছে’, ‘যাবার আগে হাটে হাড়ি ভেঙে দিয়ে যাব’ ইত্যাদি ইঙ্গিতপূর্ণ কথা। এসময়ে নরেন্দ্রনাথের মধ্যে শক্তিসঞ্চার, কালীপদ ঘোষ, বিনোদিনীকে ‘চৈতন্য হও’ বলে আশীর্বাদ করা ইত্যাদি ঘটনা সংগঠিত হতে দেখা যায়। কাশীপুরে অন্তরঙ্গদের একদিন বলছেন, ‘এখন এর মধ্যে (নিজের মধ্যে) এমন শক্তি অনুভব করছি যে নিজেকে আর কাউকে স্পর্শ করতে হবে না, তোদের কাউকে যদি বলি অমুককে স্পর্শ করে দে, তাতেই হয়ে যাবে।’ এমনই সময় উপস্থিত হলো ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারিতে সংগঠিত কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণের আত্মপ্রকাশে অভয়দানের অবিস্মরণীয় ঘটনা। প্রায় ত্রিশজন পুরুষ গৃহীভক্ত সেদিন শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপালাভে ধন্য ও কৃতার্থ হয়েছিলেন। নিজ নিজ অভীপ্সার পরাকাষ্ঠা সেদিন তাদের মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়েছিল। অবতার সামান্য মাত্র স্পর্শ, ভ্রুভঙ্গি এমনকী ইচ্ছামাত্রে অপরের জন্মজন্মান্তরের সমস্ত অশুভ সংস্কারকে বিদূরিত করে নবজীবন দান করতে পারেন। এ ক্ষমতা অন্য কোনও গুরু বা মহাত্মা তাঁরা যতই উন্নত পর্যায়ের হোন না কেন, তাঁদের থাকে না। তাই অবতারকে স্বামীজি ‘কপাল মোচন’ এবং শ্রীরামকৃষ্ণ ‘কর্মনাশা’ বলে অভিহিত করেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও কথায় ‘অবতার-প্রসঙ্গ’ একটি বিশেষ মাত্রা ও গতি এনেছে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ঈশ্বরতত্ত্ব অতি সহজে বুঝতে ও জীবনে কার্যকরী করতে অবতার-জীবনের অনুধ্যান, মনন ও বিশ্লেষণের চেয়ে প্রকৃষ্ট পন্থা আর নেই।
আড্ডায় তর্ক
শ্রীরামকৃষ্ণের সত্যান্বেষা ছিল অসীম। সত্যের শেষ না দেখে তিনি মাঝপথে কিছু ছেড়ে দেননি। তেমনই উৎসাহিত করেছেন বিপরীত ভাবনার মানুষজনকে।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলে তিন দিকপাল নাস্তিক, সন্দিগ্ধ, যুক্তিনিষ্ঠ, বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিত্ব হলেন—নরেন্দ্রনাথ, গিরিশচন্দ্র এবং ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার। তাঁরা কেউই ভক্ত ও বিশ্বাসী হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যাননি। কোনও তুকতাক, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ, মন্ত্র-তন্ত্র, বা ওষুধ গিলিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁদের আপন করে নেননি।
উক্ত তিনজনের তর্ক-প্রতর্ক, যুক্তিনিষ্ঠা, বিচার প্রবণতা এবং বৌদ্ধিক ক্ষমতা শ্রীরামকৃষ্ণকে অত্যন্ত আনন্দ দিত। আবার শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে তাঁরা দেখেছিলেন শিশুর সারল্য, সত্যে চরম আঁট, সত্যান্বেষীর অদম্য উদ্যম, নিরভিমানিতা, গভীর রসবোধ, অন্যের প্রতি প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসা এবং সর্বোপরি তাঁকে অস্বীকার করার চূড়ান্ত স্বাধীনতা প্রদানকারী এক আনন্দময় পুরুষকে।
শ্রীরামকৃষ্ণ বই-টই পড়েন না, মাস্টারমশাই প্রথম দর্শনে বৃন্দে ঝিয়ের মুখে সে কথা শুনে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছিলেন।
ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার একদিন (১৮৮৫, ২২ অক্টোবর) ভক্তদের বলছেন: ‘বই পড়লে এ-ব্যক্তির (পরমহংসদেবের) এত জ্ঞান হতো না। Faraday Communed with nature. প্রকৃতিকে ফ্যারাডে নিজে দর্শন করত, তাই অত Scientific Truth discover করতে পেরেছিল। বই পড়ে বিদ্যা হলে অত হত না। Mathematical formulae only throw the brain into confusion-original inquiry-র পথে বড় বিঘ্ন এনে দেয়। ডাক্তার যাকে ‘Original inquiry’ বলছেন, সেটি হল মৌলিকতা, সৃজনশীলতা। শ্রীরামকৃষ্ণ-জীবনের পদে পদে ছিল এই মৌলিকতা।
দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ। ১৮৮৫, ৭ মার্চ।
হঠাৎ শ্রীরামকৃষ্ণ গম্ভীর হলেন, যেন কী গুহ্যকথা বলবেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি)—এখানে অপর লোক কেউ নাই। সেদিন-হরিশ কাছে ছিল—দেখলাম—খোলটি—(দেহটি) ছেড়ে সচ্চিদানন্দ বাহিরে এল, এসে বললে, আমি যুগে যুগে অবতার! তখন ভাবলাম, বুঝি মনের খেয়ালে ওই সব কথা বলছি। তারপর চুপ করে থেকে দেখলাম—তখন দেখি আপনি বলছে, শক্তির আরাধনা চৈতন্যও করেছিল।
ভক্তেরা সকলে আবাক হয়ে শুনছেন। কেউ কেউ ভাবছেন—সচ্চিদানন্দ ভগবান কি শ্রীরামকৃষ্ণের রূপ ধারণ করে আমাদের কাছে বসে আছেন? ভগবান কি আবার অবতীর্ণ হয়েছেন?
শ্রীরামকৃষ্ণ কথা কইছেন। মাস্টারকে সম্বোধন করে আবার বলছেন—‘দেখলাম, পূর্ণ আবির্ভাব। তবে সত্ত্বগুণের ঐশ্বর্য।’
শ্রীরামকৃষ্ণ তর্কবিচারে উৎসাহ দেন সত্য কিন্তু যেখানে বিচার শুষ্ক নীরস এবং কথার কচকচানি, সেটা তাঁর মনপূত নয়। এরকম একটি চিত্র। মাস্টারমশাই লিখেছেন, ‘ডাক্তার বলছেন, ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আর আমাদের সকলের আত্মা (Soul) অনন্ত উন্নতি করবে। একজন আর একজনের চেয়ে বড়, একথা তিনি মানতে চাইছেন না। তাই অবতার মানছেন না।’
ডাক্তার—Infinite Progress তা যদি না হল তাহলে পাঁচ বছর সাত বছর আর বেঁচেই বা কি হবে! গলায় দড়ি দেব!
‘অবতার আবার কি! যে মানুষ হাগে মোতে তার পদানত হব। হাঁ, তবে Reflection of God’s Light (ঈশ্বরের জ্যোতি) মানুষে প্রকাশ হয়ে থাকে তা মানি।
শ্রীরামকৃষ্ণ—এ-সব যা কথা হচ্ছে, এ কিছুই নয়।
‘এ-সব বিকারের রোগীর খেয়াল। বিকারের রোগী বলেছিল—এক জালা জল খাব, এক হাঁড়ি ভাত খাব। বদ্যি বললে, আচ্ছা আচ্ছা খাবি। পথ্য পেয়ে যা বলবি তখন করা যাবে। ‘যতক্ষণ কাঁচা ঘি, ততক্ষণ কলকলানি শোনা যায়। পাকা হলে আর শব্দ থাকে না। যার যেমন মন, ঈশ্বরকে সেইরূপ দেখে। এক মজলিসি আড্ডার বিবরণ। মাস্টারমশাইয়ের নথি অর্থাৎ কথামৃত থেকে। দিনটি ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর। শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ।
শ্রীরামকৃষ্ণ (ঈশানের প্রতি)—তুমি কিছু বল না; এ (ডাক্তার) অবতার মানছে না।
ঈশান—আজ্ঞা, কী আর বিচার করব। বিচার আর ভালো লাগে না।
শ্রীরামকৃষ্ণ (বিরক্ত হইয়া)—কেন? সঙ্গত কথা বলবে না?
শ্রীরামকৃষ্ণ—(ডাক্তারের প্রতি)—ওইটুকু বুঝা শক্ত, তিনিই স্বরাট তিনিই বিরাট। যাঁরই নিত্য তাঁরই লীলা। তিনি মানুষ হতে পারেন না, এ-কথা জোর করে আমরা ক্ষুদ্র বুদ্



