কলহার মুখোপাধ্যায়: ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ/যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা...’ যে আঁধার জীবনানন্দ দেখে গিয়েছিলেন, তা মোটেও কাটেনি। উলটে আরও কালো হয়েছে। সম্প্রতি বিরুদ্ধে করা একটি অবমাননাকর মন্তব্য সেই কালোরই টাটকা ফসল।
কলহার মুখোপাধ্যায়: ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ/যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা...’ যে আঁধার জীবনানন্দ দেখে গিয়েছিলেন, তা মোটেও কাটেনি। উলটে আরও কালো হয়েছে। সম্প্রতি বিরুদ্ধে করা একটি অবমাননাকর মন্তব্য সেই কালোরই টাটকা ফসল।
যে মন্তব্য অবলীলায় বলে দেয়, ‘ইউটিউবওয়ালে স্টার টিচার্স, জিন কো কুছ জ্ঞান না কওড়ি’ (যাঁদের সামান্যতম জ্ঞান নেই, এক পয়সার যোগ্যতাও না)। এত কদর্য কথা বলতে এখন কারও দ্বিধা হয় না, সংকোচ হয় না, বলার পর অনুশোচনা হয় না। এই উক্তি দেশজুড়ে কি
মারাত্মক অভিঘাত তৈরি করতে পারে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। উক্তিটির তাৎপর্য যে কতদূর বিস্তৃত, তা বোঝার মতো দায়িত্ববোধ আছে কি না তা নিয়েও ঘোরতর সন্দেহ তৈরি হয়। কারণ উক্তিটি সেই কালোর ফসল বলেতা অন্ধ। গত পনেরো বছর ধরে যে সিস্টেম তৈরি হয়েছে তা এমনই কালো। এরকমই অন্ধ।তা দিয়েই সিস্টেমের উলটো দিকে থাকা বিস্তীর্ণ সমাজকে বিশ্লেষণ করা চলছে। আঁধার আরও অদ্ভুত, আরও অদ্ভুত হয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে সব ক্ষেত্রে। বিষয়টি শুধু মাত্রএকটি বক্তব্য ভাবলে ভুল হবে, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা সমাজকে চিরে ভাগ করে দিচ্ছে, ‘আমরা এবং ওরায়’।
সমালোচনার মূল শক্তিভাষার তীক্ষ্ণতা নয়, তথ্যের নির্ভুলতা। সমালোচনাকারীদের কাছে সমাজ প্রত্যাশা করে,তাঁরা কঠোর প্রশ্ন করবেন, কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা পেশাকে অপমান করবেন না। তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবেন, কিন্তু সমাজের অবমাননা করবেন না। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে থাকা সেই সিস্টেম যখন তথ্যের পরিবর্তে অবমাননা কর বিশেষণকে প্রধান অস্ত্রবানায়, তখনতা সমালোচনার মর্যাদা বাড়ায় না। বরং আলোচনার মান কেনী চেনামিয়ে আনে। কঠোর সমালোচনাগণ তন্ত্রকে শক্তিশালী করে কিন্তু শিক্ষকসহ অন্যান্য পেশাকে অপমান করা গণতান্ত্রিক পরিসরকে দুর্বল করে দেয়। ‘না জ্ঞান না কওড়ি’ যুক্তির ভাষানয়, অপমানের ভাষা। যুক্তি হারিয়ে যখন অবমাননাকে অস্ত্র করা হয় তখন তা পেশাগত দুর্বলতার পরিচয়। পাশাপাশি এই ভাষা-সংস্কৃতি সমাজে আঁধার নামিয়ে আনে। একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে তথ্য, প্রমাণও বিশ্লেষণে রবদলে অপমান, বিদ্বেষ জায়গা করে নেয়। মানুষ অপর পেশাকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। কোনো সিস্টেম যখন তথ্যভিত্তিক আলোচনার পরিবর্তে সন্দেহ উসকে দেওয়ার পথে হাঁটে তখন তা বিপজ্জনক। একাজ অন্যায় শুধু নয়, অশুভ বুদ্ধি সম্পন্ন এবং অসততা। কোনো সমালোচনা যখন সব ভুলে শিক্ষক সমাজের একাংশকে অপমান করে তখন তা সিস্টেমের নীতি, যুক্তিবোধ এবং গণতান্ত্রিক আলোচনার মানদণ্ডকে ফেলে দেয় প্রশ্নের মুখে।
একটা কথা নিয়ে কারও দ্বিমত থাকতে পারে না, শিক্ষকরা না থাকলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইএএস, আইপি এসহ ওয়াযায়না। বস্তুত কিছুই হওয়া যায় না। সভ্যতার যে মানদণ্ড সমাজে নির্দিষ্ট আছে, তার উচ্চতম শৃঙ্গে অবস্থান শিক্ষকেরই। সামাজিক ভিত্তি তিনিই স্থাপন করেন। আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই দেখানো পথেই হাঁটে। সমাজের এটাই দস্তুর। সভ্যতার অগ্রগতি এই নিয়মেই চলে। বুঝে অথবা না বুঝে বা কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনে সেই মানদণ্ডটিকেই অপমান করে চলছে ক্ষমতাশালী সিস্টেম। এই টার্গেটের অভিমুখ অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা নয়। ছুড়ে দেওয়া তীরের লক্ষ্য, এক শ্রেণির ইউটিউবার, যাঁরা ইউটিউবের মাধ্যমে শিক্ষাদান করেন।
এর বিপরীতে থাকা একটি ছোট্ট গল্প।
একটি অল্পবয়সি মেয়ে। জামাকাপড় মলিন। দেখে বোঝা যায় তাঁর পরিবার দরিদ্র। মেয়েটি এক ইউটিউবার শিক্ষকের লেকচার শুনতেন দূর মাধ্যমে। সে পরামর্শ মেনে পড়ে মোটা বেতনের সরকারি চাকরির পরীক্ষায় উতরে গিয়েছেন। এবার চাকরিতে জয়েন করবেন। একটি ইউটিউব চ্যানেল মেয়েটির ইন্টারভিউ নিয়েছিল। তিনি বলছিলেন, ‘মেরা সামনে দুনিয়া কা অর কুছ নেহি থা। স্রিফ স্যারকা ক্লাস। অর ধ্যান লাগাকে পড়না। আজ মেরা ফ্যামিলি পেট ভরকে খায়গা।’ (আমার সামনে দুনিয়ার কিছু ছিল না। স্যারের ক্লাস আর মন দিয়ে পড়াশোনা। আজ আমার পরিবার পেট ভরে খেতে পাবে)। তাঁর সেই স্যারকেও না জ্ঞান না কওড়ি! মেয়েটি শিক্ষকের এই অপমানে ফুঁসছেন। তিনি কি এই সিস্টেমকে ছেড়ে দেবেন? না। যাঁরা অধরা স্বপ্ন ধরতে ছুটে চলেছেন ইউটিউবার স্যার-ম্যাডামের ক্লাসের সঙ্গে, তাঁরা ছেড়ে দেবেন এই সিস্টেমকে? তাঁরা কেন? কেউই ছাড়েননি। অপমানের জবাব দিচ্ছেন সজোরে। গোটা দেশ বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলির সঙ্গে গলা মিলিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। রাজনীতিকরা সাধারণত যে ধরনের কটাক্ষের, যে জনরোষের শিকার হন, বর্তমানে চলা দেশের তথাকথিত গণতন্ত্র সঞ্জাত একটি উক্তি ঠিক সে ধরনের ক্ষোভ তৈরি করেছে। ভারতবর্ষ এমন দৃশ্য খুব বেশি দেখেনি।
তবে ‘কুছ না জ্ঞান না কওড়ি’ বক্তব্যটি কি শুধুমাত্র আকস্মিকভাবে বলা? বা শুধুই কি উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপমান? এর নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিকও বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপট শুধুমাত্র কি এটুকুই?
না।
বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ দুর্নীতি, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, ছাত্র-ছাত্রীদের আত্মহত্যা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে দেশ তোলপাড়। অদ্ভুত আঁধার চারিদিকে। ইতিহাস বলে, যুগে যুগে, দেশে দেশে এই ধরনের কালো সময় কিছু শ্রেণি সংখ্যায় বাড়ে। তাঁরা কারা? তাঁরা সুবিধাভোগী। ‘যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা...।’
যদি বলা হয়, না জ্ঞান না কওড়ি আসলে নজর ঘোরানোর খেলা। সিস্টেমের মধ্যে থাকা একটি বড়ো অংশ এখন ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য ইস্যু থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে এ ধরনের বিভিন্ন রকম মন্তব্য করছেন। উক্তিটির রাজনৈতিক যোগাযোগ বা পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন বিশ্লেষণ করলে এই প্রশ্নটিই সবার আগে উঠে আসে। যখন প্রশ্ন ফাঁস, নিয়োগে দুর্নীতি, কৃষক আত্মহত্যা, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থার দফারফা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ ইত্যাদিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের
তুলনায় ক্রমশ পিছনের সারিতে গিয়ে বসছে ভারতবর্ষ, তখন জনস্বার্থের এই বড়ো বিষয়গুলি আলোচনার কেন্দ্রে আনা হয় না। জনপরিসরে প্রায়শই দেখা যায় বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলে। মূল সমস্যার পরিবর্তে আলোচনার বিষয় বস্তু হয়ে ওঠে কোনো শ্রেণি, কোনো ব্যক্তি, কোনো মন্তব্য বা
কোনো সাংস্কৃতিক বিতর্ক।এ সংক্রান্ত রাজনৈতিক তত্ত্বটিকেই বলে এজেন্ডা সেটিং। এর ফলে গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি বিচ্যুতি সংক্রান্ত অভিযোগ, প্রশ্ন ফাঁস, শিক্ষা দুর্নীতি বা শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটের মতো বড়ো ইস্যু নিয়ে
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার পরিসর তৈরি করা হয় না। পরিবর্তে সামনে তুলে আনা হয় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু। হঠাৎ করে ইউটিউব শিক্ষকদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। এটিই হল নজর ঘোরানোর রাজনীতি। যা মূল সমস্যাকে চাপা দিয়ে অপেক্ষাকৃত লঘু বিষয়কে নিয়ে আসে আলোচনার কেন্দ্রে। সরকারের মদতে চলা ওই সিস্টেমের অন্তর্গত গোষ্ঠীগুলি সুচারুভাবে মানুষকে অন্ধকারে রাখছে। তাই ভোটপ্রচারে ঝালমুড়ির ভালোমন্দ তুলে নিয়ে আসা হয় জনপরিসরে। জনস্বার্থের বিচ্যুতিগুলি সামনে আনা হয় না সবাইকে অন্ধকারে রাখতে। সেই আঁধারেরই ফসল এই সিস্টেম।
ভারতের মতো সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশে সিস্টেমের
মধ্যে থাকা গোষ্ঠীর প্রতি জনগণের আস্থা কমছে প্রতিনিয়ত। তারপরও এমন মন্তব্য যদি বারবার উঠে আসে,
তাহলে মানুষ হয় তো ভাবতে শুরু করবে যে, সবাই পক্ষপাত দুষ্ট এবং কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা, কারণ গণতন্ত্রের জন্য ন্যূনতম সামাজিক আস্থার প্রয়োজন। এক-একটি শ্রেণিকে টার্গেট করে এভাবে যদি আক্রমণ ক্রমাগত নেমে
আসতে থাকে তাহলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মজ্জায় ঘুণ ধরিয়ে দেবে। অবিশ্বাসের বাতাবরণ আগুন ধরিয়ে দেবে দেশে। ক্ষমতাবানরা টার্গেট করতেই থাকবে। সে
টার্গেট বদলাতেই থাকবে। ধীরে শেষ হয়ে যাবে গণতন্ত্র, শ্রেণি কাঠামো।
মার্টিন নিমেলার বহু আগে লিখেছিলেন, ‘প্রথমে ওরা এসেছিল কমিউনিস্টদের জন্য, আমি কোনো প্রতিবাদ করিনি—কারণ আমি কমিউনিস্ট ছিলাম না/তারপর ওরা এসেছিল ট্রেড ইউনিয়নের শ্রমিকদের জন্য, আমি কোনো প্রতিবাদ করিনি—কারণ আমি ট্রেড ইউনিয়ন করতাম না/তারপর ওরা এসেছিল ইহুদিদের জন্য, আমি কোনো প্রতিবাদ করিনি—কারণ আমি ইহুদি ছিলাম না/ তারপর ওরা এসেছিল আমার জন্য, আর তখন আমার পক্ষে কথা বলার জন্য কেউই বেঁচে ছিল না।’
শিক্ষকরাই এরকম সব মূল্যবান সব লেখা ছাত্রদের সামনে তুলে আনেন। তাদের চেতনা তৈরি করেন। শিক্ষকরা না থাকলে তা পড়া হয় না। চেতনা তৈরি হয় না। উপযুক্ত সমাজ গঠন হয় না। তাই শিক্ষকদের অন্তত রেহাই দিক ক্ষমতার সঙ্গে থাকা এই কালো সিস্টেম।