Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

ইডেন গার্ডেন্স! জমি জবরদখলে ব্রিটিশ বনাম ব্রিটিশ

ইডেন গার্ডেন্স! জমি জবরদখলে ব্রিটিশ বনাম ব্রিটিশ
  • ১৭ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: ‘মাঠ দখল করে নিয়েছে। বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। শুধু কি তাই, একটা বাথরুম পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছে স্যার!’ কলকাতায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জমি জবরদখলের অভিযোগ। আর সেই অভিযোগও করছে  কি না খোদ ব্রিটিশরাই! 

Advertisement

ঘটনাটি ১৮৪ বছর আগের। ১৮৪১ সাল। এখন কলকাতায় ফুটপাত দখল নিয়ে বিতর্ক-অশান্তি ইত্যাদি হয়। তখন অবশ্য ফুটপাত নয়। ‘মারি তো গণ্ডার’ প্রবাদে সিলমোহর দিয়ে খাস ইডেন গার্ডেন্স জবরদখল! ব্রিটিশ রাজত্বে ঘটনাটি তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। কারণ অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত দু’পক্ষই ক্ষমতাবান। ইংরেজ সিভিল সার্জেন্টরা জমি দখল করছেন, এই মর্মে অভিযোগ আনল ইংরেজ সেনাবাহিনী। কী ঘটেছিল আসলে? ‘ডিরেক্টরেট অব স্টেট আর্কাইভস’য়ে এখনও রয়েছে এ সংক্রান্ত সরকারি দলিলটি। দপ্তরের আধিকারিক আর্কাইভিস্ট সুমিত ঘোষ একটি লেখাও লিখেছিলেন তাঁর ‘ইডেন গার্ডেন ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ বইতে। শিরোনাম, ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ’। ইতিহাস বলছে, ১৮২৫ সালে ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব’ গভর্নমেন্ট হাউস ও ফোর্ট উইলিয়ামের মাঝের একটি জমিতে ক্রিকেট খেলত। ক্লাবটি ছিল ইংরেজ সিভিল সার্জেন্ট অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলাদের তৈরি। ১৮৪১ সালে তারা বহিরাগতদের প্রবেশ আটকাতে মাঠ প্রাঙ্গণ দিল বেড়া দিয়ে ঘিরে। এদিকে জায়গাটির মূল মালিক ইংরেজ সেনাবাহিনী। তারা এই কাজ মোটেই ভালো চোখে দেখল না। মনে করল, গায়ের জোরে মাঠ জবরদখল করে নিচ্ছেন সিভিল সার্জেন্টরা। ১৮৫৩ সালে কলকাতার চিফ ম্যাজিস্ট্রেট ডব্লু এইচ এলিয়ট জবরদখলের কথা জানিয়ে অভিযোগপত্র জমা দিলেন বেঙ্গল গভর্নমেন্টের সচিব সেসিল বিডনকে। লিখলেন, ‘মাঠে তাঁবু খাটাচ্ছে। বাঁশ দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে চারপাশ স্থায়ী বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। এমনকী একটি দরমার শৌচাগার পর্যন্ত তৈরি করে ফেলেছে।’ এর পাশাপাশি ফোর্ট উইলিয়ামের গ্যারিসন ইঞ্জিনিয়ার মেজর ডব্লিউ অ্যাবারক্রম্বিও প্রবল আশঙ্কা প্রকাশ করলেন। এই কাজ পুরোপুরি বেআইনি ঘোষণা করে তাঁর মন্তব্য, ‘ময়দান এলাকার যে কোনও বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সামরিক প্রশাসকদের সরব হওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে।’ মেজরকে সমর্থন দিলেন চিফ ম্যাজিস্ট্রেট এলিয়ট। তাঁর সংযোজন, ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের কোনও স্থায়ী তাঁবু বা ক্লাবঘর রাখা চলবে না।’ তারপর ১৫ই অক্টোবর থেকে ১৫ই এপ্রিল বছরের এই ছ’মাস অস্থায়ী তাঁবু রেখে ক্রিকেট খেলার অনুমোদন দিলেন তিনি।
ব্রিটিশ রাজপুরুষরা নিজেদের মধ্যে লড়ছে। আর তা দেখে মুখ টিপে হাসছে ‘নেটিভরা’। সে এক অদ্ভুত বিড়ম্বনা বটে শাসকের জন্য। শিক্ষিত এদেশীয়রা গোপনে হলেও বলতে ছাড়লেন না, ‘ইংরেজরা নিজেদের ভারি আইননিষ্ঠ বলে দাবি করে না! তা আইন মানার এই তো ছিরি। সরকারি জমি পর্যন্ত জবরদখল করে নিচ্ছে। এরা আবার আমাদের নিয়ম মেনে চলার জ্ঞান দেয়।’
সিভিল সার্জেন্ট অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলাদের সঙ্গে সেনার এই লড়াই সহজে কিন্তু শেষ হয়নি। কারণ দু’পক্ষই ক্ষমতাবান। শেষ পর্যন্ত ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসিকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। অতঃপর ভারত সরকার ময়দানের সমস্ত বিষয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এবং নিজেদের সিদ্ধান্তে জানায়, ‘ময়দানে কোনও বেড়া, তাঁবু বা অন্যান্য কাঠামো উচ্ছেদের অধিকার ভারত সরকারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে।’ এখনও কিন্তু ময়দানে যে সব ক্লাবের টেন্ট আছে, তা সবই অস্থায়ী। পরে ময়দান ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে আসে। কিন্তু বহাল থেকে যায় ব্রিটিশ আমলের নিয়মটিই।
আইপিএল মরশুম এখন মধ্যগগনে। ইডেনমুখী হাজারো মানুষ। আগামী সোমবারও প্রবল ভিড় হবে। গুজরাতের সঙ্গে কলকাতার খেলা বলে কথা! সেদিন একবার ফাঁক পেলে জায়গাটা আপনিও দেখে নিতে পারেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ