বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: ১৮-১৯ বছরের তরুণ। রাস্তার একপাশ দিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটছিলেন। বেপরোয়া এক ‘ছোট হাতি’ নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে মারল সোজা তাঁর কোমরে। ভয়াবহ দুর্ঘটনা। চিকিৎসকরা দেখলেন, কোমর ও হাঁটুর সংযোগকারী প্রধান হাড় ‘ফিমার বোন’ ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গিয়েছে। প্লেট, নেইল দিয়ে অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, ইঞ্চিখানেক ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। কিছুতেই মেলানো যাচ্ছে না। তাহলে উপায়? এমন সময় সাক্ষাৎ রক্ষাকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হল ‘বোন ব্যাংক’। ব্লাড ব্যাংকে যেমন রক্ত সংরক্ষিত রাখা থাকে, বোন ব্যাংকে থাকে হাড়। চিকিৎসকরা সেখান থেকে প্রয়োজনমতো হাড় বা হাড়ের অংশবিশেষ নিয়ে সমস্যার সমাধান করে দিলেন। অস্ত্রোপচার সফল হল। লাখখানেক খরচের প্রন্থেসিসও লাগল না।
চোট-আঘাত, ক্যান্সারে হাড় বাদ দেওয়ার ঘটনা, সংক্রমণ সহ আধুনিক অসংখ্য বড় সার্জারিতে এখন ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে বোন ব্যাংক। আগামী সপ্তাহে (সম্ভবত ১৬ সেপ্টেম্বর) পূর্ব ভারতের সরকারিক্ষেত্রে প্রথম বোন ব্যাংক চালু হতে চলেছে রাজ্যের এক নম্বর সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল পিজিতে। বলা ভালো, পিজি’র অ্যানেক্স হাসপাতাল শম্ভুনাথ পণ্ডিতে। এখানকার দোতলায় প্রায় ৬৫০ বর্গফুট জায়গায় শুরু হচ্ছে এই ‘ব্যাংক’। অর্থোপেডিক, সার্জারি, প্লাস্টিক সার্জারি, অঙ্কোসার্জারি, ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি সহ বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকরা এখান থেকে হাড় নিয়ে রোগীদের প্রয়োজনে কাজ লাগাতে পারবেন। এর ফলে বড়সড় অস্ত্রোপচার ও পুনর্গঠন সার্জারির ক্ষেত্রে লক্ষাধিক টাকা মূল্যের প্রন্থেসিস বা মেগাপ্রন্থেসিস খাতে সরকারের খরচও কমবে।
পিজি’র প্রস্তাবিত বোন ব্যাঙ্কের অন্যতম প্রধান, অধ্যাপক ডাঃ মুকুল ভট্টাচার্য বলেন, ‘ক্যান্সার সার্জারি থেকে ট্রমা কেয়ার—সর্বত্র এখন বোন ব্যাংকের গুরুত্ব অপরিসীম। আশা করছি, আগামী সপ্তাহে চালু করা যাবে। সেক্ষেত্রে সরকারিক্ষেত্রে পূর্ব ভারতে প্রথম ‘বোন ব্যাংক’-এর পরিষেবা পাবে মানুষ। চিকিৎসক মহল সূত্রে খবর, বর্তমানে মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতাল, চেন্নাইয়ের একটি সরকারি হাসপাতাল সহ দেশের হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে স্বীকৃত বোন ব্যাংক রয়েছে। পূর্ব ভারতে এখনও এমন স্বীকৃত বোন ব্যাংক গড়ে ওঠেনি। তবে বাইপাস লাগোয়া একটি প্রাইভেট হাসপাতাল নিজস্ব বোন ব্যাংক করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
পিজি সূত্রের খবর, দু’ভাবে এখানে হাড় সংরক্ষণ করা সম্ভব। প্রথমত, রোগী বা তাঁর বাড়ির লোকের অনুমতি নিয়ে বড় অস্ত্রোপচারে (যেমন হিপ, নি, জয়েন্ট রিপ্লেসমেনন্টে) বাদ যাওয়া হাড়ের টুকরো বা গোটা হাড় রাখা হবে। ঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে হাড়গুলি ৬ বছর পর্যন্ত অবিকৃত রাখা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, বাড়ির লোকের অনুমতিক্রমে ক্যাডাভার বা মস্তিষ্কের মৃত্যু হওয়া ব্যক্তির শরীর থেকে হাড় সংগ্রহ করা। তবে এক্ষেত্রে বাড়ির লোকজন সাধারণত অনুমতি দিতে চাইবেন না বলে আশঙ্কা রয়েছে। প্রসঙ্গত, একবার বোন ব্যাংক চালু করতে পারলে হাসপাতালের লক্ষ্য থাকে, নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে সরকারি অন্যান্য চিকিৎসাক্ষেত্রের প্রয়োজনীয়তা পূরণ। তারপর যে কোনও প্রাইভেট হাসপাতালের রোগীর প্রয়োজনেও ‘বোন গ্রাফট’ দেওয়া হয়।