নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: দুর্গাপুরে নাবালকদের টাকার বিনিময়ে রক্তদানের ঘটনায় উঠে আসছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। পেটের ব্যথা হোক বা পিঠের রোগ বিভিন্ন সময়েই বেসরকারি হাসপাতাল অপ্রয়োজনেও রোগীর আত্মীয়দের রক্ত দেওয়ার জন্য চাপ দিত। নাবালকদের রক্ত দেওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে আসছে। দুর্গাপুরে রক্ত লুটের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপের হুশিয়ারি দিয়েছিলেন রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। এরপরই স্বাস্থ্য দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের টিম দুর্গাপুরে গিয়ে নানা তথ্য সংগ্রহ করেন।
ওই সরকারি দল হাসপাতালের একাধিক ত্রুটি ধরেছেন। তাঁদের নজরে এসেছে বহু ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনে রোগীর পরিবারের কাছ থেকে রক্ত নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছে ওই বেসরকারি হাসপাতাল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রথমেই দুই ইউনিট রক্ত দেওয়ার কথা বলে হাসপাতাল। অপরিচিত জায়গায় সেই রক্ত জোগাড় করতেই হিমশিম খান রোগীর পরিজনরা। তখনই রক্ত বিক্রি করা দালালদের খপ্পরে পড়েন তাঁরা। রোগীর নিকট আত্মীয় ভাবেন রক্ত না দিলে এখনই অঘটন ঘটতে পারে। তাই যত বেশি মূল্যই হোক তাঁরা রক্ত সংগ্রহ করেন। এভাবেই কার্যত বেসরকারি হাসপাতালের মাত্রাতিরিক্ত রক্তের চাহিদাই দুর্গাপুরের এই ব্লাড র্যাকেটকে বাড়তে সাহায্য করেছে।
ঘটনার পর এনিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে রাজ্য সরকার। তাঁরা ব্লাড ব্যাংক নিয়ে কাজ করা স্বাস্থ্য দপ্তরের শীর্ষ কর্তাদের কাজে রিপোর্ট তলব করেন। বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে যাবতীয় তথ্য ঘেঁটে দেখেছেন তাঁরা। সেখানেই নজরে পড়েছে কী ভাবে রোগীর আত্মীয়, পরিজনকে কাছ থেকে অতিরিক্ত রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। জানা গিয়েছে, দুর্গাপুরের একাধিক বড়ো হাসপাতালে নিজস্ব ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। তাঁরা সরকারি ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত সংগ্রহ করে না। উল্টে রোগীর আত্মীয়, পরিজনদের থেকেও রক্তের জোগান নিয়ে এই ব্লাড ব্যাংকগুলিকে সজীব রাখা হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে ব্লাড ব্যাংকে মজুত করে রাখার জন্য বাড়তি রক্ত চাওয়া হয়। অতিরিক্ত এই রক্ত ব্লাড ব্যাংকে নষ্ট হয় না কি তার অন্যত্র পাচার হচ্ছে সেটাও খতিয়ে দেখছে স্বাস্থ্য দপ্তর।
স্বাস্থ্য দপ্তরের এক শীর্ষ কর্তার দাবি, ব্লাড ব্যাংক করলেও তাঁরা ধারাবাহিক রক্তদান শিবির করে না। তাই বহু ক্ষেত্রেই রক্তের জন্য বিপুল চাপে পড়ছেন রোগীর আত্মীয়, পরিজনরা। কারণ সরকারি ব্লাড ব্যাংকের রক্ত তাঁরা নেন না। তাই রক্তের জোগাড় করতে হয় রোগীর আত্মীয়কেই।
দুর্গাপুরে ভিন জেলা, ভিন রাজ্য এমনকী নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ থেকেও মানুষ চিকিৎসা করাতে আসেন। শহরে তাঁদের কোনো পরিচিত নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রক্ত চাইলে টাকা দিয়ে কিনে নিতে চেষ্টা করেন তাঁরা। তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে এই ব্লাড র্যাকেট।
অন্যদিকে এই ঘটনার প্রতিবাদে স্বেচ্ছায় রক্তদান আন্দোলনের পরিচিত মুখরাও কর্মসূচি নিয়েছেন। তাঁরা দোষীদের শক্তির দাবির পাশাপাশি পড়ুয়াদের মধ্যে সেমিনার করে নিয়ম ভেঙে রক্তদান করলে কী বিপদ তা বোঝাবেন। ওয়েস্ট বেঙ্গল ভলান্টিয়ারি ব্লাড ডোনার্স সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক কবি ঘোষ বলেন, আমরা এনিয়ে ধারাবাহিক সচেতনতা গড়ে তুলব। পাশাপাশি দোষীদের শস্তির দাবিতেও অনড় রয়েছি।
প্রসঙ্গত, একটি বেসরকারি স্কুলে একাধিক নাবালক অর্থের বিনিময়ে রক্ত দেওয়ার ঘটনার প্রকাশ্যে আসতেই দুর্গাপুর শহরে তোলপাড় পড়ে যায়। অভিভাবকদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ওই ব্লাড র্যাকেটের তিনজনকে এখনও পর্যন্ত গ্রেপ্তার করেছে।