নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: ভাঙাচোরা বাইকের গ্যারাজ। দিন-রাত বাইক সারাইয়ে মগ্ন থাকেন বৃদ্ধ। কিন্তু দুর্গাপুজো এলে শিল্পীমন শুধু ভাঙা লোহা, আর বাইকের যন্ত্রাংশে আটকে থাকে না। তখন নতুন সৃষ্টির নেশা চেপে ধরে তাঁকে। ঘুম উবে যায় চোখ থেকে। সৃষ্টি সুখের উল্লাস থেকেই এবার বাইকের অব্যবহৃত সামগ্রী দিয়ে দুর্গা প্রতিমা বানাচ্ছেন নন্দননগরের বৃদ্ধ অমল পাল। স্কুটারের হেড লাইট দিয়ে তৈরি হয়েছে মায়ের মুখ, চেন দিয়ে বানানো হয়েছে চুল। এমন অভিনব দুর্গাপ্রতিমা বানিয়ে এলাকাবাসীকে চমক দেওয়ার প্রহর গুনছেন অমলবাবু।
নন্দননগরের আমতলা এলাকার বাইক মেকানিক অমল পাল। তাঁর ভাঙাচোরা গ্যারাজ রয়েছে। সেই গ্যারাজেই তাঁর বসবাস। বৃদ্ধ অমলবাবু একাই বাইক সারাই করেন। তবে দুর্গাপুজো এলেই মায়ের প্রতিমা তৈরির নেশা তাঁকে পাগল করে তোলে। বিশ্বকর্মা পুজোর আগে থেকেই তিনি ভাবতে শুরু করেন এবার কোন সামগ্রী দিয়ে প্রতিমা বানাবেন। অন্যান্য বছর স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের পাত দিয়ে দুর্গা প্রতিমা বানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, গাছের বাকল, কাঠের গুঁড়ো, বটের ঝুড়ি দিয়েও প্রতিমা গড়েছেন আগে। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই মাথায় আসে বাইকের ফেলে দেওয়া সামগ্রীর কথা। তা দিয়েই দুর্গা প্রতিমা গড়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। নিজের কাছে যেটুকু সরঞ্জাম রয়েছে, তা দিয়ে প্রতিমা তৈরি হবে না। তাই পাশের গ্যারাজ থেকেও বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করে আনেন অমলবাবু। এরপর রাত জেগে শুরু করেন প্রতিমা তৈরির কাজ। ইতিমধ্যেই দুর্গা ও মহিষাসুর বানানোর কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এখন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ তৈরির কাজ চলছে। বাইকের তেলের ট্যাঙ্কারই এখানে মায়ের দেহ। বাইকের মিরর-এর খাপ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে হাতের পাতা। পাইপ দিয়ে হাত। ড্রিল মেশিন, ঝালাই সামগ্রী ও রংয়ের স্প্রে দিয়ে একমনে তিনি তৈরি করে চলেছেন প্রতিমা।
অমলবাবুর কথায়, ২০১২ সাল থেকে দুর্গা প্রতিমা বানাচ্ছি। এবার ভেবেছিলাম, বানাব না। বয়সের ভার, টাকার সমস্যা, সময়ের অভাবে পেড়ে উঠছিলাম না। কিন্তু স্থানীয়দের কৌতূহল, এবার কী দিয়ে দুর্গা বানাব? আমি মায়ের প্রতিমা তৈরি করে গ্যারাজের সামনে সাজাই। অন্যান্য বছরের প্রতিমাও প্রদর্শন করা হয়। ষষ্ঠী থেকে ভাইফোঁটা পর্যন্ত তা বাইরেই সাজানো থাকে। তবে তাঁর আক্ষেপ, নতুন ভাবনাকে রূপ দিতে রাতের পর রাত জেগে কাজ করি। আমি কারওর থেকে সাহায্য চাই না। শুধু কাজের স্বীকৃতি চাই। অমলবাবুর এই আকুতি যে কতবড়ো সত্যি, তার বড়ো প্রমাণ দু’টি ট্রফি। বেশ কয়েক বছর আগে নৈহাটির একটি ক্লাব স্মারক হিসাবে তাঁকে এই ট্রফিটি দিয়েছিল। রং উঠে বিবর্ণ হলেও আজও তা বুকে আগলে রাখেন তিনি।



