Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

খোলা আকাশের নীচে পূজিত হতে চেয়েছিলেন দুর্গাবুড়ি

ঝাড়গ্রাম শহর থেকে জামবনী যাওয়ার পথে সান ও যুগীবাঁধ গ্রাম। দু’টি গ্রামের সীমানায় দেখা যায় একটি গাছের তলায় দেবীর থান। থানে পোড়ামাটির হাতি, ঘোড়া ‌ইত্যাদি রাখা রয়েছে।

খোলা আকাশের নীচে পূজিত হতে চেয়েছিলেন দুর্গাবুড়ি
  • ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্রাম: ঝাড়গ্রাম শহর থেকে জামবনী যাওয়ার পথে সান ও যুগীবাঁধ গ্রাম। দু’টি গ্রামের সীমানায় দেখা যায় একটি গাছের তলায় দেবীর থান। থানে পোড়ামাটির হাতি, ঘোড়া ‌ইত্যাদি রাখা রয়েছে। এটিকে বলা হয় দুর্গাবুড়ির থান। মা দুর্গা এখানে লোকায়ত দেবী ও আদিবাসীদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছেন। দুর্গাপুজোর সময়ে এই থানে পুজো হয়। তবে অকালবোধনের নিয়ম মেনে চারদিন ধরে নয়। স্থানীয় গ্ৰামের বাসিন্দারা ধূপ জ্বালিয়ে দিয়ে যান থানে। শবর সম্প্রদায়ের মানুষ পুজোর চারদিন বনের ফুল, ফল, পাতা থানে দিয়ে যান। এই পুজোয় শহরের বৈভব, উৎসবের দেখা মেলে না। জঙ্গল, পাহাড়ের শবর ও বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষরা নিজেদের মতো করেই দুর্গাবুড়ির পুজো করেন। শতাব্দী প্রাচীন এই পুজো মূলত প্রান্তিক মানুষের লৌকিক বিশ্বাস ও ভক্তির উপর ভর করেই হয়ে আসছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, দুর্গাবুড়ির থানে মন্দির বানানো ও চারদিন ধরে পুজোর প্রচেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু পুজো করা যায়নি। তাঁদের বিশ্বাস, দেবী উন্মুক্ত আকাশের নীচে পূজিত হতে চেয়েছেন, তাই মন্দির বানানো সম্ভব হয়নি। আদিবাসীদের আরও বিশ্বাস, ভক্তরা শুদ্ধমনে না এলে দুর্গাবুড়ির থান থেকে ফুল, ফল গড়িয়ে পড়ে যায়। মাঘ মাসে আইখ্যান পরবের সময়ে দূরদূরান্তের মানুষ এই থানে পুজো দিতে আসেন। 

Advertisement

জঙ্গলমহলের এই পুজোর সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লৌকিক বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। পুজোর সঙ্গে জৈন, বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের আচার বিশ্বাস মিলেমিশে গিয়েছে। এক মিশ্র সংস্কৃতির ছবি দেখা যায়। পর্যটকদের কাছে দুর্গাবুড়ির পুজো ক্রমশ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। যুগীবাঁধ  গ্ৰামের বাসিন্দা মতি শবর বলেন, দুর্গাবুড়িকে এই এলাকার মানুষ জাগ্ৰত দেবী বলেই মানেন। স্থানীয় দেহরী পুরোহিতদের মুখে শুনেছি, দেবীর নির্দেশেই চারদিন প্রথা মেনে পুজো হয় না। 
তবে থানে ফলমূল দেওয়া হয়। প্রদীপ, ধূপকাঠি জ্বালানো হয়। বনের ফুল পাতা এনে থানে আমরা দিই। অপর বাসিন্দা কমলমণি শবর বলেন, শুদ্ধ মনে দেবীর কাছে না গেলে থান থেকে ফলমূল গড়িয়ে পড়ে যায়। দেবী রুষ্ট হন, এমন কোনও কাজ আমরা  করি না। স্থানীয় বড়শোল গ্ৰামের যুবক তুষার দাস বলেন, বড়শোল থেকে মাইল খানেক দূরে দুর্গাবুড়ির থান। বাইরের জগতের মানুষের কাছে এই জায়গা আজও প্রায় অজানা। সুদূর অতীতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লৌকিক দেবীর সঙ্গে দেবী দুর্গার ভাবনা  মিলেমিশে গিয়েছিল। প্রতিকী পুজোর চেষ্টা হলেও তা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তবে তাতে ভক্তি ও বিশ্বাসের বদল হয়নি। পুজোর সময়ে এখন পর্যটকরা এখানে আসছেন। দুর্গাবুড়ির কথা বাইরের জগতের মানুষের কাছে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ঝাড়গ্রামের সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চর্চা করছেন বিধান দেবনাথ। তিনি বলেন, প্রাচীনকাল থেকে পশ্চিম ভারতের সমুদ্র উপকূল ও মধ্য ভারতের নদী পথ ধরে আদিম জনগোষ্ঠী পূর্ব ভারতে এসেছিল। নব্য প্রস্তর যুগের বহু নিদর্শন জঙ্গলমহলে পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃতির উপাসক সেই জনগোষ্ঠীর উত্তরপুরুষরা লৌকিক বিশ্বাস আচার তাদের পুজো পার্বণে ধরে রেখেছেন।-নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ