দুগ্গা এল ঘরে
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আজও মহাসপ্তমী। শুরু হয়ে গিয়েছে বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসব। দুর্গাপুজোয় কে, কী করবে ই-মেল করে ‘হযবরল’ বিভাগে নিজেদের ভাবনা ও অনুভূতি জানিয়েছিল ছোট্ট বন্ধুরা। তারই মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হল।

Advertisement

সুন্দর পৃথিবী গড়ার প্রেরণা
 দুর্গাপুজো প্রতিটি বাঙালির কাছে এক আবেগ, ঐতিহ্য ও মিলনের উৎসব। দুর্গাপুজো শুধুমাত্র দেবীর আরাধনা নয়, সুপ্ত নারীশক্তি ও আত্মিক ক্ষমতাকে সম্মান জানানোরও উৎসব। সমাজ থেকে অন্যায়, বৈষম্য, কুসংস্কার দূর করে সুন্দর পৃথিবী গড়ার প্রেরণা জোগান মা দুর্গা। 
বছরের এই চারটি দিন সমস্ত ব্যস্ততা ও দূরত্বের দেওয়াল ভেঙে যায়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ এই উৎসবে শামিল হন। অভূতপূর্ব প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা ও প্রতিমাশৈলী আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে। সমাজের অবহেলিত মানুষরাও যেন এই উৎসবের আলো থেকে বঞ্চিত না হন, এই সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ আমার কাছে দুর্গাপুজোর প্রকৃত অর্থ।
—শৌর্যেশ রায়, সপ্তম শ্রেণি, সাউথ পয়েন্ট স্কুল

বাজল তোমার আলোর বেণু
 ‘বাজল তোমার আলোর বেণু’ রেডিয়োতে গানটি শুনলেই মনে হয় মা দুর্গা এসে গিয়েছেন। শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা এবং শিউলির মিষ্টি গন্ধ— প্রকৃতি যেন জানিয়ে দেয় মায়ের আগমন বার্তা। ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ এবং আলোর রোশনাইয়ে যখন চারদিক সেজে ওঠে, তখন বাঙালির মনে এক অন্যরকম আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ে। দুর্গা পুজো শুধু কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতির প্রতীক। পুজোর সকালগুলো অন্য সব সকালের থেকে আলাদা। ভোরের নরম আলোয় যখন ঘুম ভেঙে যায়, তখন জানলার বাইরে থেকে আসা ঢাকের শব্দ মনটাকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। ভোরের শিউলি ফুলের গন্ধ, মায়ের ব্যস্ততা, নতুন জামা-কাপড়ের উত্তেজনা, মন্ত্রোচ্চারণ, ঢাকের আওয়াজ—সব মিলিয়ে চারপাশে তৈরি হয় এক অপূর্ব পরিবেশ। স্নান সেরে নতুন পোশাক পরে পূজামণ্ডপে গিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, এত মানুষের আনন্দ, আশা ও প্রার্থনা যেন এক জায়গায় এসে মিলেছে। দুর্গাপুজো মানেই পড়াশোনা থেকে ছুটি, খাওয়াদাওয়া, ঠাকুর দেখা। শুধু আনন্দ আর আনন্দ।
— মৌমিতা ঘোষ, দশম শ্রেণি, 
মন্মথনাথ গার্লস হাই স্কুল

আশ্বিনের শারদ প্রাতে
 এখন এআইয়ের যুগ। তবুও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কখনো পুরানো হন না। তাঁর কোনো বিকল্পও নেই। যখনই বিভিন্ন মানুষের মোবাইল ফোন থেকে ভেসে আসে ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জীর’ বোঝা যায় দুর্গাপুজো একেবারে দোরগোড়ায়। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ ও দুর্গাপুজো আমাদের কাছে সমার্থক। দুর্গাপুজো মানে প্রাত্যহিকতার রুটিন ভাঙা। ঠাকুর দেখতে খুব ভালোবাসি। জেন জি-র ভাষায় ‘প্যান্ডেল হপিং’। এবছরও তার অন্যথা হবে না। এবার আবার দু’দিন সপ্তমী। মানে পুজোর আনন্দ দ্বিগুণ। যদিও সামনেই মাধ্যমিক গিলোটিন নিয়ে দাঁড়িয়ে, তবুও বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া, হই-হুল্লোড়ে কোনো ফাঁক থাকবে না। পুজো তো বছরে একবারই। পরিযায়ী শ্রমিকরাও যেন এই পুজোর আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন, দুর্গা মায়ের কাছে শুধু এই প্রার্থনাই জানাব।
—মাহি বিশ্বাস, দশম শ্রেণি, বেতাই হাই স্কুল
পুজো মানেই ছুটি
 মা দুর্গা এসেছে গিয়েছেন। পুজোর ক’টা দিন পড়াশোনা নেই। স্কুল যেমন ছুটি, তেমনই বাড়িতে পড়তে বসা নেই। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঠাকুর দেখব। আইসক্রিম আর ফুচকা খাব। আমাদের এখানে অনেক বড়ো বড়ো পুজো হয়। দুর্গা ঠাকুরের সঙ্গে আমরা গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিক ঠাকুর দেখি। মহিষাসুরকে সিংহমশাই জোরে কামড়ে দেয়। পুজোয় আমরা নতুন জামা পরি। অষ্টমীর দিন মা পুজো মণ্ডপে অঞ্জলি দিতে যায়। আমিও মায়ের সঙ্গে যাই।
 — দেলিশা সরকার, চতুর্থ শ্রেণি, 
বনগাঁ ঘোষ ইনস্টিটিউশন

শারদ-আলাপন
 দুর্গাপুজো শুধু কাশফুল, ঢাকের বাদ্যি কিংবা নতুন জামার উৎসব নয়। এ যেন ব্যস্ত জীবনের মাঝে কয়েকটা দিন নিজের কাছে ফিরে আসার অজুহাত। পুজোর গন্ধে মিশে থাকে শিউলি-ভেজা সকাল, ধূপের ধোঁয়া, মণ্ডপের আলো আর প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা। ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে কখন যে রাত গভীর হয়, খেয়ালই থাকে না। পুজোর ভিড়ে বন্ধুদের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, জীবনে আনন্দ আসলে এমনই— খুব সাধারণ, অথচ ভীষণ দামি। আবার বিসর্জনের ঢাক শুনলে মনটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। তবুও জানি, ‘আসছে বছর আবার হবে—এই আশাটুকুই তো পুজোর সবচেয়ে সুন্দর দিক। দুর্গাপুজো তাই আমার কাছে শুধু পাঁচ দিনের আনন্দ নয়, সারা বছর অপেক্ষা করার একটা মিষ্টি কারণ।
—দেবদত্তা রায়, একাদশ শ্রেণি, 
বাদকুল্লা ইউনাইটেড অ্যাকাডেমি 
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব
 বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো।  যার জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি। বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়ায়, যা আমার ভীষণ প্রিয়! এই চারটে দিন আমি স্বাধীন। পড়া নিয়ে বকাবকি নেই। নতুন জামা পরে মা-বাবার সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাব। বিরিয়ানি খেতে খুব ভালোবাসি। বাবা বলেছেন, দু’দিন বিরিয়ানি খাওয়াবেন। অষ্টমীর দিন আমাদের বাড়িতে লুচি খাওয়া হয়। লুচি খেতেও খুব ভালো লাগে। অষ্টমীর দিন সকালে স্নান সেরে মায়ের সঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি দিই। পুজোয় খুব মজা করব। সবার পুজো ভালো কাটুক।
— অগ্নিদীপ্ত সন্নিগ্রাহী, চতুর্থ শ্রেণি, 
দুর্গাপুর পাবলিক স্কুল
চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন
 পুজো মানে চিন্ময়ী মায়ের মৃন্ময়ী হয়ে ওঠা। পুজোর দিনগুলিতে চেনা চৌহদ্দি নতুনভাবে সেজে ওঠে। আমার শহর বসিরহাটও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রত্যেক বছরের মতো এবছরও পুজোয় এখানেই থাকব। বোধন থেকে বিসর্জন— যখন খুশি বাবা-মায়ের সঙ্গে শহরের অলিগলির প্যান্ডেলে উঁকি দেব। অবসরের সঙ্গী হিসেবে ব্যোমকেশ আর ফেলুদা তো আছেই। আর সময় পেলেই খাতার পাতা ভরিয়ে তুলব কবিতার ছন্দে। ভাইয়ের সঙ্গে খুনসুটি, মায়ের হাতের ফুলকো লুচি আর রঙিন পুজোসংখ্যায় চোখ রেখে কটা দিন কখন কেটে যাবে! আর বিসর্জনের দিন ইছামতীর ঘাটে গিয়ে হাজির হব।
— সৌমিলী মণ্ডল, অষ্টম শ্রেণি, বসিরহাট হরিমোহন দালাল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়
ছুটিতে ইছামতীর তীরে
 পুজো এলেই আমার বাড়ির ঠিকানাটা যেন একটু বদলে যায়। পুজোর কয়েকটা দিন বাড়িতে মন টেকে না। পুজো মানেই পাড়ার পুজো মণ্ডপে দেদার আড্ডা। আর বাবা-মায়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়া। শুধু ২০২৫-এর পুজোটা ছিল ব্যতিক্রম। মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির কারণে সেইবার পুজোর আনন্দও ছিল বই-খাতার চারপাশে। যাইহোক, এবার আমাদের গন্তব্য— টাকি। ইছামতী নদীর তীর। শরতের আকাশের নীচে ইছামতীর জল, নদীর বুকে ভেসে চলা নৌকা, কাশবন, বাতাসে পুজোর গন্ধ— সব মিলিয়ে এবারের পুজোটা যেন শহরের চেনা ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে গিয়ে অন্যভাবে কাটবে। টাকির সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ প্রতিমা নিরঞ্জন। ইছামতীর তীরে দুই বাংলার মানুষ মা দুর্গার বিসর্জনের সাক্ষী থাকেন। আমরাও এবছর বিজয়া দশমীর দিনটি টাকিতেই কাটাব। আসলে ইছামতী কেবল একটি নদী নয়, দুই বাংলার স্মৃতি, আবেগ আর উৎসবের এক নীরব সেতু।
—শ্রীয়া মুখোপাধ্যায়, দ্বাদশ শ্রেণি, বেহালা সারদা বিদ্যাপীঠ ফর গার্লস

শাড়ি আর ছবি
 বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। এই উৎসবকে সফল করার জন্য থাকে নিখুঁত পরিকল্পনা। পুজো কমিটিগুলির মাসের পর মাসের পরিশ্রম। শুধু আয়োজকদেরই নয়, পরিকল্পনা থাকে আম-আদমিরও। কোন দিন কোন জামা পরব। সপ্তমীতে কোথায় ঠাকুর দেখব, নবমীতে কোন রেস্তরাঁয় খাব। আমরা বন্ধুরা মিলে ইতিমধ্যে প্ল্যান করে নিয়েছ, যেদিন একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাব, সেদিন সবাই শাড়ি পরব। শাড়ি পরা নিয়েই এখন নিজেদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা। আর ছবি তোলার ব্যাপারটা তো রয়েইছে। সকলের পুজো ভালো কাটুক এই কামনা করি।
—শ্রীজিতা মণ্ডল, দ্বাদশ শ্রেণি, পাঠ ভবন, বিশ্বভারতী