নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: বনেদি বা প্রাচীন পুজো মানেই জনশ্রুতির ঝুরির ঘেরাটোপ। কতকটা আলোআধাঁরি, কতকটা বিস্ময়। কিন্তু সময়ের গতিকে হারিয়ে ইতিহাসকে বুকে ধরে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না। সাবেক বর্ধমান প্রদেশের হুগলির জনপদেও বেনজির বহুপুজো আছে। অতীতকে আঁকড়ে থাকা, ঐতিহ্যের অনুশাসনের সেসব পুজো ঘিরে আছে নানা লোককথা। আছে নানা বেনজির আচার-অনুষ্ঠান। তেমনই একটি পুজো চুঁচুড়ার ষণ্ডেশ্বরতলার দত্তবাড়ির পুজো। জনশ্রুতি, বর্ধমানের রাজা হস্তগত করেছিলেন পরিবারের আরাধ্য শালগ্রাম শিলা। আর তারপরেই ডাকাতদল লুণ্ঠন করতে এসে দিয়ে গিয়েছিল সিংহবাহিনী মূর্তি। কালের ঘরে কোনও খতিয়ান নেই কিন্তু পুজো আছে। আজও দত্তবাড়ির উত্তরসাধকদের ঠাকুরদালানে সেই অষ্টধাতুর মূর্তির পুজো হয়।
আবার পুজোর ভোগ থেকে আচারেও চলতি বিধির অনেক ব্যতিক্রম দেখা যায়। তার অন্যতম পুজোর সময়। দত্তবাড়ির চাতালে দেবীর পুজো শুরু হয় মহালয়ার সাতদিন আগে। পুজো চলে দুর্গাদশমী পর্যন্ত। অর্থাৎ পুজো শুরু হয় কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে। দত্তবাড়ির উত্তরপ্রজন্মের সদস্য দোলন পাল। তিনি বলেন, পুজোর শুরুর ঠিকুজিকুলুজি নিয়ে আজ আর ভাবি না। আমাদের পুজোর দিনসংখ্যা সাধারণের থেকে বেশি। সেই আচারেই আমরা আমরা বাড়তি আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে থাকি। তবে সাবেক কাল থেকে আজ পর্যন্ত, ঐতিহ্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে কোনও আপোস করা হয়নি।
দত্তবাড়ির চলিত ইতিহাস বলে, একদা বর্ধমানের কুরমুন শোনপলাশীতে বসত ছিল দত্তদের। তখন পরিবারে পুজো হতো শালগ্রাম শিলার। স্থানীয় রাজা সেই শালগ্রাম শিলা হস্তগত করেছিল। আরাধ্যকে হারিয়ে ভেঙে পড়ে পরিবারটি। সেই সময়েই একদল ডাকাত হানা দিয়েছিল। অলৌকিকভাবে পরিবারের দুঃখের কাহিনী জানতে পেরে তারাই লালশালুতে মুড়ে দেবী সিংহবাহিনীকে দিয়ে গিয়েছিল। সেই ইস্তক সিংহবাহিনীই পুজো পান দত্তবাড়িতে। সময়ের রকমফেরে বর্গীহানা থেকে বাঁচতে দত্তকর্তা রামচন্দ্র পরিবার নিয়ে চলে আসেন চুঁচুড়ার ষণ্ডেশ্বরতলায়। তারপরে ফের ১৭৪২ সাল নাগাদ ষণ্ডেশ্বরতলাতেই পুজো শুরু হয় সিংহবাহিনী দেবীর। পুজো শুরু হয় মহালয়ার অনেক আগে। কিন্তু শুরুর কিছুদিন দেবী পুজো পান তাঁর বছরভরের বসত দোতলার ঘরে। দুর্গাষষ্ঠীর সকালে দেবীর জন্য একতলার দুর্গাদালানে আসন পাতা হয়। দশমী পর্যন্ত সেখানেই বিশেষ ভোগ দিয়ে পুজো হয়। ভোগে থাকা একাধিক রকমের নাড়ু। শাক্তদেবীর পুজোতে আজও বহমান বৈষ্ণবরীতি। সময় বদলে গিয়েছে অনেক, ঠাঁই বদল হয়েছে সিংহবাহিনীর। কিন্তু বদলায়নি রীতিরেওয়াজ আর জনশ্রুতির ঠাসবুনোট চর্চার পরিসর।



